ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

১৮ ফেব্রুয়ারি’ ১৩ তারিখে “ভয়ঙ্কর ইসলাম বিদ্বেষী ব্লগার চক্র” শিরোনামে একটি রিপোর্টকে লিড নিউজ করেছে “আমার দেশ” পত্রিকা। যখন ব্লগ এবং ব্লগার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক ধারনা তৈরি হতে শুরু করেছে ঠিক তখনই ব্লগারদের বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষ প্রসূত এই রিপোর্টটি ছাপা হয়েছে। যেখানে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, বাংলা ব্লগের ব্লগাররা ব্লগে মূলত ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ ছড়াতেই ব্যস্ত। এবং বিশেষ একটি গোষ্ঠী এর প্রতিবাদ ও ইসলাম ধর্মের নানা দিক নিয়ে পোষ্ট দিতে দিতে হয়রান। বাংলা ব্লগের চিত্রটিই কি সত্যিই এমন?

তাদের ছাপানো রিপোর্টটি মূলত প্রয়াত ব্লগার রাজীব হায়দারকে কেন্দ্র করে। যাতে রিপোর্ট এর শেষ অংশে রাজীব হায়দারের কিছু পোষ্টও সংযুক্ত করা হয়েছে। এর পরে উল্লেখ করা হয়েছে শাহবাগের আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা আরও কিছু ব্লগারের নাম – “রাজীবের পাশাপাশি আরও যেসব ব্লগার শাহবাগের আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছে, তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় ইসলাম বিদ্বেষী লেখালেখি চালিয়ে আসছে। এদের মধ্যে অন্যতম হল ডা. ইমরান এইচ সরকার, অমি রহমান পিয়াল, আরিফ জেবতিক, নিজেকে নাস্তিক দাবিকারী আসিফ মহিউদ্দিন, কট্টর আওয়ামীপন্থী ব্লগার ইব্রাহিম খলিল (সবাক) প্রমুখ। এছাড়া ইংল্যান্ড প্রবাসী আওয়ামীপন্থী এক ব্লগার আরিফুর রহমানকে দেখা যায় নানা আপত্তিকর মন্তব্য করতে। তাদের মধ্যে আসিফ মহিউদ্দিন সামনের সারিতে থেকে শাহবাগের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে”।

প্রশ্ন হল বাংলাদেশে কি শুধুমাত্র এই ক’জনই ব্লগার রয়েছে? আর শাহবাগে কি শুধুমাত্র এই ক’জনই আন্দোলন করছেন? যদি তারা ইসলাম বিদ্বেষী হয়েও থাকেন তা তো অনেক আগে থেকেই। এখন কেন তাদের লেখা নিয়ে কথা উঠছে? রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে “উসকানিমূলক ও চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ এসব মন্তব্যের প্রতিবাদ ও ইসলাম ধর্মের নানা দিক নিয়ে যথাসাধ্য পোস্ট দিচ্ছেন ইসলামপন্থী ব্লগাররা। তারা নাস্তিকদের দেয়া নানা যুক্তিও খণ্ডনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলোতে ফেসবুক ব্যবহারকারী ও ব্লগারদের এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্যের জন্য তাদের বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানান। এ ব্যাপারে ইসলাম প্রিয় মুসলিমদের সতর্ক থাকার আহ্বানও জানানো হয়”। বিষয়টা তো ওখানেই মিটে যায়। ভার্চুয়াল জগতে পরস্পরবিরোধী মতবাদে বিশ্বাসীরা পাল্টাপাল্টি তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করছে। যিনি যত বেশি যুক্তিনির্ভর, নিজের পক্ষে যত বেশি তথ্য উপাত্ত উপস্থাপনে সক্ষম হবেন তিনি তাঁর বিশ্বাসকে তত বেশি অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারবেন। আর তাদের সে আদর্শের যুদ্ধ ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। যদি তা নিয়ে প্রিন্ট মিডিয়ায় লিখতেই হয় আরও আগে কেন লেখা হল না? রাজীব হায়দারের হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করতে?

বর্তমানে শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব বাংলা ব্লগই মডারেট ব্লগ। যেখানে অনেক জ্ঞানগর্ভ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। দেশের সেরা ব্লগাররাও সাধারণত এই সব ব্লগেই লিখেন। যাদের একটি বৃহৎ অংশই শাহবাগ আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। আর তাই কুরুচিপূর্ণ ইসলাম বিদ্বেষী লেখাকে শাহবাগ আন্দোলনের সাথে জরিয়ে লেখা এই রিপোর্টও যে হীন উদ্দেশ্যমুলক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শাহবাগ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আজ কেন তাদের লেখার পোস্টমর্টেম করতে হবে?

প্রতিটি মানুষের চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাসের স্বাধীনতা রয়েছে। প্রত্যেকেই যার যার কর্মফল লাভ করবে সন্দেহ নেই। ব্যক্তির এই স্বাধীনতা ইসলামও নিশ্চিত করে। মহানবী (সঃ) এর জীবদ্দশায় তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হয়েছে। তাকে রক্তাক্ত করা হয়েছে। এমনকি দেশ ছাড়াও করা হয়েছে। তিনি কি তাদের জোর করে ধর্মান্তরিত করেছিলেন? না তাদের হত্যা করেছিলেন?

রাজীব হায়দারের নামে সংযুক্ত লেখাগুলো পড়লে সহজেই অনুমেয় এগুলো অনেকটা রম্য ধাঁচের নিজস্ব মতামত বৈ আর কিছু নয়। যা অন্য কাউকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও রাখে না। তথাপি এর ভাষা এবং মূলভাব নিঃসন্দেহে গর্হিত। কিন্তু তা নিশ্চয়ই তাকে হত্যা করার বৈধতা দেয় না। একই রিপোর্টে একদিকে বলা হচ্ছে , ‘ব্লগার রাজীব হত্যার সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের কোনও সম্পর্ক নেই”। অন্যদিকে তার চরিত্র এবং ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে টানা হেঁচড়া করে তাঁর হত্যাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমন বৈপরীত্য কেন?

আজ যারা কথায় কথায় ইসলাম অন্ত প্রাণ বলে নিজেদের যাহির করার চেষ্টা করেন তাদের কাছে আমার সবিনয়ে প্রশ্ন। প্রকৃত মুসলিম হওয়ার শর্ত কি কি? জন্ম সূত্রে মুসলমান কি সত্যিই মুসলমান? মানুষ বিবেক-বোধ সম্পন্ন একটি স্বাধীন জিব। প্রত্যেক মানুষ তাঁর নিজস্ব বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা পরিচালিত হয়। যদি কেউ ভুল পথে পরিচালিত হয়ে থাকে প্রতিটি বিবেকসম্পন্ন মানুষের দায়িত্ব তাঁর ভুল ধরিয়ে দেয়া। কুৎসা রটানো নয়। বিশেষ করে কোন মৃত ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দিতে তার অতীত ইতিহাস ঘাটাঘাটি করা বোধ করি আরও বেশি কুরুচিপূর্ণ। যদি কোন মুসলিম পরিবারের সন্তান ইসলাম বিদ্বেষী হয়েও থাকে তাঁর জন্যে কি চরমপন্থি মুসলমানরা অনেকাংশেই দায়ী নয়?

শাহবাগের গণআন্দোলনের তো প্রয়োজনই হত না। যুদ্ধাপরাধী, মানবতা বিরোধী অপরাধী এ সব শব্দও এ দেশে কারো মুখে উচ্চারিত হত না। যদি না এই সব অপরাধে কেউ অভিযুক্ত হত। কারা অভিযুক্ত? তারা কি ইসলামের নামে মুসলমানিত্বের আবরণের আড়ালে এই সব দুষ্কর্ম করেনি? ইসলামের আসল শত্রু কারা? যারা ইসলামের নাম ভাঙ্গিয়ে অনৈসলামিক কাজ করে বেড়ায়; না যারা নিজেদের ইসলামবিরোধী বলে প্রচার করে স্বীয় মত তুলে ধরে?

এ দেশের অনেক বরেণ্য ব্যক্তিদের নামের সাথেও ইসলামবিদ্বেশি শব্দটা জুরে দেয়া হয় তাদের বিরুদ্ধে নানা রকম ফতোয়া দেয়া হয়। তারা কি সত্যিই ইসলাম বিরোধী?
অথচ রসুল সা. বলেছেন, قال المستبان ماقالا فعلى البادى مالم يعتد المظلوم- رواه مسلم

“যে ব্যক্তি কাউকে কাফের বলে ডাকে অথবা আল্লাহর শত্রু বলে, অথচ ( যাকে কাফের ও আল্লাহ তা’আলার শত্রু বলা হচ্ছে) সে তা নয়, তখন তার কথা নিজের দিকে ফিরবে”।
তথ্য সূত্র:[হযরত আবু যার(রা) থেকে বর্ণিত] বুখারী ও মুসলিম , মিশকাতঃ৪৬০৬ অধ্যায়ঃজিহ্বার সংযম,গীবতগাল-মন্দ প্রসঙ্গে।

একটি জাতীয় দৈনিকের একটি লিড নিউজ অবশ্যই গুরুত্বের দাবী রাখে। “ভয়ঙ্কর ইসলাম বিদ্বেষী ব্লগার চক্র” বলে যদি নির্দিষ্ট কোন মতাদর্শের লোকদের বাদ দিয়ে অন্য সকল ব্লগারকে উদ্দেশ্য করা হয়ে থাকে। যদি শাহবাগের আন্দোলনকে খাটো করার উদ্দেশ্যেই এই রিপোর্টের অবতারণা হয়ে থাকে তবে তাকে সর্বান্তকরণেই নিন্দা জানাই। বাংলা ব্লগের বেশিরভাগ ব্লগারই সুরুচি সম্পন্ন। তারা কোন দল বা মতের এজেন্ডা বাস্তবায়নের নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে না। তারা এ দেশকে ভালবাসে। দেশ বিরোধী সকল অপশক্তিকে ঘৃণা করে। তেমনি তারা স্ব স্ব ধর্মের প্রতিও সমান অনুরক্ত। এই ব্লগাররা কুরুচিপূর্ণ লেখাকে যেমন ঘৃণা করে তেমনি তল্পিবাহকদেরও।

kmgmehadi@yahoo.com

তথ্যসূত্রঃ http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/02/18/188548#.USHQLUew6IU