ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

kalima
বাংলাদেশ ধর্মভিত্তিক দেশের ধারনা থেকে বেড়িয়ে এসে একাত্তরে একটি সেক্যুলার অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠন করেছিল। আর তা করতে গিয়ে তাকে যে মূল্য দিতে হয়েছে খুব কম দেশকেই স্বাধীন ভূখণ্ড পেতে তেমনটি দিতে হয়েছে। তথাপিও আমরা কেবলই পিছন দিকে হাঁটছি। যদি এককথায় উত্তর দিতে চাই এর মূলে রয়েছে একটিই কারণ আর তা হল আমাদের সবকিছুকেই মেনে নেয়ার মানসিকতা। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ঠিক করতে গিয়েও এই একই নীতি গ্রহণ। যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন তাকেই আবার একীভূত করবেন তা তো হয় না।
বাঙ্গালীকে যেদিন থেকে শুধুই বাংলাদেশী করার চেষ্টায় লিপ্ত হলেন দ্বন্দ্বের শুরুটা সেদিন থেকেই। তবে তাও এতটা প্রকট হয়ে উঠত না। যদি না তার সাথে ধর্মকেও জুড়ে দেয়া হত।
একজন মানুষ তার নিজস্ব বিশ্বাস নিয়ে থাকতেই পারেন। তিনি তার সেই বিশ্বাসকে প্রচার করবেন এটাই স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে তাঁর যুক্তি, বিচার বিশ্লেষণ তাকে কারো কাছে গ্রহণযোগ্য করবে কারো কাছে অগ্রহণীয়। কিন্তু তাঁর মানে তো এটা হতে পারে না যে আপনি তাঁর বিচার করবেন, তাকে হত্যা করবেন?

যদি কেউ আপনার বিশ্বাসের উপর আঘাত করে আপনি একইভাবে তার প্রতি উত্তর দিতে পারেন। আপনার যুক্তি দিয়ে তাঁর যুক্তিকে খণ্ডানোর চেষ্টা করুন। না পারলে প্রচলিত আইনে আপনি তার প্রতিকারও চাইতে পারেন। কিন্তু তাই বলে তাঁর বিচার করার অধিকার তো আপনাকে কেউ দেয়নি। এমনকি যে স্রষ্টার দোহাই দিয়ে আপনি এটা করছেন তিনিও আপনাকে সঙ্গত কারনেই সে অধিকার দেননি।
আর আপনি যদি মনে করেন আপনার ইসলাম কোন রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে বিশ্বাস করে না। আপনার ইসলাম প্রত্যেককে ম্যেজেষ্ট্রিসি ক্ষমতা দিয়েছে। ফলে যে কেউ যে কারো বিচার তার নিজের আদালতে করার ক্ষমতা রাখে। তাহলে সেই জংলী আইন নিয়ে আপনার সভ্য সমাজে থাকার কোন প্রয়োজন নেই। তার থেকে ভাল আপনি জংগলে গিয়েই বাস করুন। যদিও আমরা জানি এবং বিশ্বাস করি ইসলাম কোন জংলী আইনের প্রবক্তা নয়।
ইসলাম বলে- ইসলাম শান্তির ধর্ম।
পবিত্র কুরআনে সুরা ইব্রাহীম-এ মহান আল্লাহ বলেন, “আমাদের কি হলও যে, আমরা আল্লাহর উপর ভরসা করবোনা অথচ তিনি আমাদেরকে যাবতীয় পথের দিশা দিয়েছেন? আর আমরা তোমাদের শত আঘাতের বিপরীতে ধৈর্য ধারণ করবো, ভরসা কারীগণ যেন শুধু আল্লাহর উপরই ভরসা করেন”। সূরা ইব্রাহীম: ১২
এর ঠিক বিপরীতে আপনি অবস্থান নিয়ে নিজেই বিচার করে দণ্ড নির্ধারণ করছেন! আবার নিজেই তা বাস্তবায়ন করছেন। স্রষ্টার বিচারে নিজেকে সঠিক বলে নির্ধারণ করছেন কিভাবে?

ইসলাম তো এক অসভ্য সময়ে সভ্যতার বানী নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। আপনি তাঁর কিয়দংশ প্রচার করেন না কিয়দংশ করে সভ্যতার মুলেই আঘাত করছেন। এটা করে আর যাই হোক নিজেকে মুসলমান দাবী করতে পারেন না।
আজ একজন মুসলমান হয়েও আমার পাশ দিয়ে দাড়িওয়ালা একজনকে হেটে যেতে দেখলে প্রথমেই বুঝতে চেষ্টা করি সে নিরাপদ কিনা। অথচ কটা দিন আগেও এমন একজনকে দেখলে আনন্দিত হতাম সালাম বিনিময় করতাম!
কি দুর্ভাগ্য আমাদের! আজ একজন মুসলমান একজন বিধর্মীর কাছ থেকে যতটা না তাঁর থেকে অনেক বেশি অনিরাপদ একজন স্বজাতির মানুষের কাছে। কারণ সে পূর্বেই বলে রেখেছে ব্লগারের ফাঁসি চাই! ব্লগাররা নাস্তিক! অথচ অনলাইনে অগণিত ইসলামী পোর্টাল রয়েছে। যেখানে প্রচুর মানুষ লেখালেখি করছেন। তারাও কি নাস্তিক!

ফেসবুকে এবং বিভিন্ন অনলাইন ব্লগে অতি উৎসাহী এমন অনেককেই দেখা যায় যারা সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে ধর্মের বিরুদ্ধে বিষদ্গার করছে। ধর্মীয় বানির খন্ডিতাংশ নিয়ে নানা অশালীন মন্তব্য করছে। আপনি যদি তাঁর ব্যাখ্যা দাবী করেন সে উত্তর দিতে পারবে না। অনেকে চেষ্টা করলেও লেজে গোবরে করে ফেলবেন। এমনকি এমন অনেকের সাথে আমার কথা হয়েছে যারা এক সময় তার ভুলটি বুঝতে পেরেছেন। পরবর্তীতে সে আর এই কাজটি তো করেননি বরং অন্যকেও নিরুৎসাহিত করেছে। কথাটি এ জন্যই বললাম যে, আজ যারা ব্লগারদের ফাঁসি দাবী করেন বা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নিচ্ছেন তারা কি কখনো এদের সাথে যুক্তিতর্কে নেমেছেন? যারা যে কোন ধর্মের বিরুদ্ধে অশালীন মন্তব্য করে তারা কোন অবস্থাতেই নিজ ধর্মের প্রতি সুবিচার করছে না। আর এই মর্মে মহান আল্লাহ রাব্বুল আল আমীন সুরা আল-আনআম এর ১০৮ নম্বর আয়াতে বলেন-[6:108] তোমরা তাদেরকে মন্দ বল না, যাদের তারা আরাধনা করে আল্লাহকে ছেড়ে। তাহলে তারা ধৃষ্টতা করে অজ্ঞতাবশত: আল্লাহকে মন্দ বলবে। এমনভাবে আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে তাদের কাজ কর্ম সুশোভিত করে দিয়েছি। অতঃপর স্বীয় পালনকর্তার কাছে তাদেরকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তখন তিনি তাদেরকে বলে দেবেন যা কিছু তারা করত।
যেখানে আল্লাহ তাদেরকে মন্দ বলতে পর্যন্ত নিষেধ করেছেন তারা ধৃষ্টতা করে অজ্ঞতাবশত: আল্লাহকে মন্দ বলবে বলে সেখানে আপনি যদি তাদের একেবারে খুনই করে ফেলেন তাহলে সে ক্ষেত্রে তারা কি বলতে বা করতে পারে? আর এ ক্ষেত্রে আপনি তো আল্লাহ্‌র নির্দেশকেই বাড়াবাড়ি রকম অমান্য করছেন।

ঠিক একই ভাবে আল্লাহ রাব্বুল আল আমীন সুরা আল-আনআম এর ১০৭ নম্বর আয়াতে বলেন-[6:107] যদি আল্লাহ চাইতেন তবে তারা শেরক করত না। আমি আপনাকে তাদের সংরক্ষক করিনি এবং আপনি তাদের কার্যনির্বাহী নন।
এই আয়াতের পরে আপনি কি করে একজন শেরককারীকে হত্যা করা আপনার জন্য অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করছেন? পবিত্র কুরআনের উপরল্লেখিত দুটি আয়াত তো এটাই স্পষ্ট করে যে, ইসলামে জঙ্গিবাদের কোন স্থান নেই। এটা আপনাদের মনগড়া প্রচারনা। যার প্রমান মেলে যখন দেখতে পাই সরাসরি পবিত্র কুরানকে বাইপাস করে নিন্মোক্ত টাইপের উদ্ধৃতি দিয়ে নিজেদের কাজের বৈধতা দানের চেষ্টা করতে।
“ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে মুজাহিদ রহ. বর্ণনা করেন: “যে কোনও মুসলিম আল্লাহকে কিংবা কোনও নবীকে গালমন্দ করল, সে আল্লাহর রসূলকে মিথ্যা রোপ করল, এটা তার ধর্ম ত্যাগ। তার নিকট তওবা তলব করা হবে, যদি সে ফিরে আসে ভাল, অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে। আর যে চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তি[16] অবাধ্য হল ও আল্লাহকে গালমন্দ করল, কিংবা কোনও নবীকে গালমন্দ করল, অথবা গালমন্দ প্রকাশ করল, সে চুক্তি ভঙ্গ করল, অতএব তাকে হত্যা কর”। আস-সারেমুল মাসলুল: (পৃ.১০২).

প্রশ্ন হল আমি কোনটা অনুসরণ করব? যেখানে মহান আল্লাহ স্পষ্টই ফয়সালা করে দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, বিভিন্ন জনের কাছে শুনতে পাই তারা বলার চেষ্টা করেন সরাসরি কুরান এবং হাদিস গ্রন্থ না পরে প্রথমে এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ধর্মী লেখা পড়া উচিৎ কারণ হিসেবে তারা বলেন কুরআন এবং হাদিস গ্রন্থ অনেক কঠিন! যা সাধারণের সহজ বোধগম্য নয়। অথচ মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সুরা আল কামার-এ নিজেই বলছেন, [54:17] আমি কোরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি?

এমতাবস্থায় আপনাদের আচরণকে মোটেই ইসলামিক ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত বলে মনে হয় না বরং এই অসহিস্নুতা, এই উগ্র মানসিকতা দিনকে দিন শুধু যে ইসলামের জন্যই অশুভ বার্তা বয়ে আনছে তাই নয় বরং সভ্য সমাজের জন্যই আপনারা চরম হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছেন। সেটা কি অনুধাবন করতে পারছেন? যদি না পারেন তাহলে এটা অন্তত মনে রাখুন। আজকে যারা চরম সহিষ্ণুতার পরিচয় দিচ্ছে একদিন তারাই ঘুরে দাড়াতে বাধ্য হবে। আর উদ্যত হবে আপনাদের সমূলে বিনাশ সাধনে।

kmgmehadi@gmail.com