ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

এই সন্ত্রাস নির্ভর আন্দোলনে বিএনপি সফল হবে কিনা জানি না। তবে এটা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যদি বিএনপি জয়লাভ করে তাহলে আওয়ামী লীগ নয় হেরে যাবে বাংলাদেশ, হারবে মানবতা, হারাবে এ দেশটির এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন।
একটু খেয়াল করে দেখুন আওয়ামী লীগ ২০২১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সাল নাগাদ একটি উন্নত দেশে পৌঁছুনর যে লক্ষ নির্ধারণ করে এগোচ্ছিল গোটা বিশ্ব তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছে। এ লক্ষ পূরণ যে সম্ভব সে বিষয়ে শর্তসাপেক্ষে একমতও পোষণ করেছে। সেইসাথে ডিজিটাল বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আওয়ামীলীগ দেখিয়েছিল। লীগ সরকার তার বাস্তবায়নও করে চলেছে। ঠিক সেই সময়ে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সম্পূর্ণরূপে অচল করে দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে। অথচ আওয়ামীলীগের গৃহীত উন্নয়নের ধারাকে সচল রাখা বা এর বিপরীতে বিএনপি এ পর্যন্ত কোন ভিশনই সেট করতে পারেনি। তাঁর মানে হল তারা নিজেরাও জানে না যে দেশটাকে কোথায় নিয়ে যাবে।

বিএনপির একটাই লক্ষ ক্ষমতা। অনেকটা সেই পাকিস্তানের মতই বাংলার জমি চাই মানুষ নয়। বিএনপি জামায়াতও কোন রাখ ঢাক না রেখে আজ সেটাই চাচ্ছে আর তাই তাদের হামলার একমাত্র লক্ষ বস্তু হচ্ছে কৃষক-শ্রমিক খেটে খাওয়া মানুষ। রাস্তায় অনেক ব্যক্তিগত গাড়ি চলছে তা হামলার লক্ষ বস্তু নয়। বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের সহ অজস্র শিল্প কারখানা চালু রয়েছে তা বন্ধ করা হচ্ছে না। শুধুমাত্র কৃষক তাঁর উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে পারছে না। শ্রমিক কাজ পাচ্ছে না। কাজে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। মারা পড়ছে পরিবহন শ্রমিক, মারা পড়ছে সাধারণ মানুষ। স্পষ্টতই তাদের আজকের আন্দোলন সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে দেশের সার্বিক অগ্রগতির বিরুদ্ধে। এই দ্বায়িত্বহিনতা; লক্ষ হীন ক্ষমতা লিপ্সা যে তাদের জয়লাভের সাথে সাথে দেশকেও উলটোরথে চলতে বাধ্য করবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এটা কেইবা না জানে? অথচ দেখুন কি দুর্ভাগ্য আমাদের! তথাপিও আমরা জোর গলায় বলতে পারছি না বিএনপি এবারও হেরে যাবে। তার একমাত্র কারণ বাঙ্গালীর আত্মহননের প্রবণতা।

আজ প্রধানমন্ত্রীর চোখে যে জল তা কেবলই আগুনে পোড়া মানুষগুলোর যন্ত্রণা দেখেই নয় এর সাথে যুক্ত রয়েছে তার আক্ষেপ। যাদের জন্য এতো কিছু করা সেই মানুষগুলো তার মূল্যায়নে কেন চরম ব্যর্থ হবে? এ আক্ষেপ তিনি করতেই পারেন। তিনি যেখান থেকে দেশের হাল ধরেছেন সেখান থেকে দেশ এগিয়েছে অনেকখানি। এই অভূতপূর্ব সাফল্য এমনি এমনিই হয়নি। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম আর নিষ্ঠার ফসল আজকে দেশের এই অবস্থান।

আমি অনেক বিএনপি কর্মী সমর্থকের কাছে প্রশ্ন করেছি, কেন আওয়ামী লিগকে পদত্যাগ করতে হবে। আর কেনইবা বিএনপিকে সমর্থন করতে হবে। উত্তরে তারা আওয়ামী লীগকে পছন্দ করিনা ছাড়া অন্য কোন কারণ দর্শাতে পারেনি। আর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হল আওয়ামী লীগকে পছন্দ না করার পেছনে গণতন্ত্রের ফাকা বুলি আওড়ান ছাড়া আর কোন যুক্তিই তাদের কাছে নেই।

আমার প্রশ্ন হল নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সরকার গঠনে ব্যর্থ হয়ে যদি সংসদেই না যান। তারা যদি শুধুমাত্র বেতন ভাতা, সুযোগ সুবিধা গ্রহণের জন্য নির্লজ্জের মত সংসদ সদস্য পদ রক্ষার নিমিত্তেই সংসদে উপস্থিত হন। সেই গণতান্ত্রিক নেতাদের দিয়ে অথবা সেই গণতন্ত্র দিয়ে আমরা কি করব?

মঙ্গা, বিদ্যুৎ হীনতা আজ ইতিহাস। সেটা এমনি এমনিই! দারিদ্রের হার ৪৬ ভাগ থেকে নেমে ২৬ এ এসে দাঁড়িয়েছে। সেটাও এমনি এমনি? ডিজিটাইলেজশনের যে সুফল আজ আমরা নিত্য ভোগ করছি তাও এমনি এমনি! এ বড় আহাম্মকী কথা। এমনি এমনি কিছু হয়না। করতে হয়। আর সে জন্যে চাই নিষ্ঠা। সে জন্য চাই সততা। ১৯৮২ সালে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকিকে লেখা আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি চিঠি তিনি এতদিন পরে প্রকাশ করেছেন। যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী লিখেছিলেন-
‘আমি ‘জাতির পিতার’ মেয়ে—সেই হিসাবে শুধু সেই হিসাবেই যে ভালবাসা যে সম্মান আমি এই বয়সে পেয়েছি—সারাজীবন আমার বাবা সাধনা করেছেন, ত্যাগ করেছেন তারই দানে আমি সমগ্র জাতির ভালবাসা, সম্মান পেয়েছি—আমার আর পাবার কি আছে? আমি এখন দিতে চাই।’ কথাটি এখনো আমরা মাঝে মাঝেই তাঁর মুখ থেকে শুনতে পাই। এটাই তাঁর আসল প্রকৃতি সত্যিকারের পরিচয়।
ঐ চিঠিতেই শেষের দিকে তিনি লিখেছিলেন, ‘যারা বঙ্গবন্ধুর গায়ে হাত দিতে সাহস করে তাদের দুর্বল ভাবলে চলবে না। মাটির অনেক গভীরে তাদের শিকড় গাড়া সেটা মনে রাখতে হবে’। সেদিনের তার সেই কথা আজো সমান ভাবে প্রযোজ্য।

আমরা গণতন্ত্র বিরোধী নই। এটা তো চরম সত্য পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন যদি অংশগ্রহণমূলক হত আর আওয়ামীলীগ যদি পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হত। দেশে অনেক বেশি শান্তি বিরাজ করত। আওয়ামী লীগ সরকারকে আজ যেমন উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতা দু দিক সামলাতে হচ্ছে তখন তারা শুধুমাত্র উন্নয়ন নিয়ে ভাবতে পারত। মানবতাবিরোধি অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াও হয়ত অনেক বেশি তরান্বিত হতে পারত। পদ্মা সেতুর মত এমন আরও মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া সম্ভব হত। যা এ দেশের খোল নলচেই পাল্টে দিত। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। আর সম্ভব যে কেন হয়নি তা তো সবারই জানা। বিএনপি নেত্রী হেফাজতের শাপলা চত্বর পর্যন্ত গণতান্ত্রিক রীতিতে আন্দোলন চালিয়েছেন। কিন্তু যখন দেখলেন তাঁর ডাকে ঢাকাবাসী তো দূরের কথা খোদ বিএনপির নেতা কর্মীরাই সারা দিচ্ছে না। তিনি তখন থেকেই পুরোপুরি জামাত নির্ভর হয়ে গেলেন। আর তাই তাঁর প্রতিটি জনসভায় আমরা দেখেছি মানবতাবিরোধি অপরাধে অভিযুক্তদের মুক্তি চেয়ে শ্লোগান, ব্যানার, ফেস্টুন। দেখেছি জনসভার সিংহ ভাগ স্থান জুরে জামাত শিবিরের অবস্থান। আমরা তাকে দেখেছি গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে বিশোদ্গার করতে। দেখেছি জামাতের নারকীয় তাণ্ডবের সাথে একাত্ম হতে। যার কোনটাই বিএনপির আদর্শের সাথে যায় না। অথচ তাই হয়েছে যার পেছনে একটাই কারণ থাকতে পারে আর তা হল যেহেতু সাধারণ মানুষ তাঁর ডাকে সারা দিয়ে রাস্তায় নামছে না যেহেতু তাঁর নেতা কর্মীরা নিবেদিত প্রাণ নয়। কাজেই ক্ষমতায় যেতে হলে আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হলে তাকে ঠিকাদার নিযুক্ত করতেই হবে। আর সে জন্যে তো জামায়াত এক পায়ে খারা। কারণ জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়নের একটাই মাত্র উপায় আর তা হল বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসা। যেটা সম্ভব হলে তারা এই ঠিকাদারির পাওনা সুদে আসলে উঠিয়ে নিতে সক্ষম হবে। দুই পক্ষের এই অনৈতিক বোঝাপড়ার ফল হল ৫ জানুয়ারির নির্বাচন পূর্ব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড। বাংলাদেশের সৌভাগ্য সে সময় অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়।

এরপরের একটি বছর সেই অশুভ শক্তির পুনরায় শক্তি সঞ্চয়ে পার হয়ে গেলে তারা পুনরায় বাহানা খুঁজতে শুরু করে। মাঝখানে বেগম জিয়া জামায়াতের করায়ত্ত থেকে বেড়িয়ে আসতে চেয়ে নিজেই নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে হাটতে শুরু করলেন। সফলও হচ্ছিলেন। কিন্তু পুনরায় বাদ সাধল সেই অশুভ শক্তি। তারা এবার খালেদা পুত্র তারেক জিয়াকে দিয়ে নানারকম অবান্তর কথা বলিয়ে রাজনৈতিক পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলল। বর্তমান সরকার যেমন জামায়াতের এক বছরের নিষ্ক্রিয়তার কারণ বুঝতে ভুল করেছে ঠিক একইভাবে তারেক জিয়ার অবান্তর সব উক্তিকে পাত্তা দিয়ে তাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছে। ফলাফল আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরি হয়ে গেল। আর এবারো আন্দোলনের ঝাণ্ডাটা রইল সেই অশুভ শক্তির কাছেই।

একটু লক্ষ করে দেখুন আজ পর্যন্ত যত লোক ক্রসফায়ারে মারা গেছে তাদের পক্ষে কোনরকম কোন বিবৃতি বিএনপি থেকে দেয়া হয়নি। নিন্দা জানালেও একটিবারের জন্যও নাশকতার বিরুদ্ধে নেতা কর্মীদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বলেননি। অর্থাৎ প্রকারান্তরে তারা এর দায় স্বীকার করেই নিয়েছেন।

আজ বিএনপি জামায়াতের এই নাশকতা মূলক কর্মকাণ্ড দিবালোকের মত স্পষ্ট হওয়া স্বত্বেও আমরা বলতে পারছি না আগামীতে বিএনপি জোটকে জনসাধারণ ক্ষমতায় যাওয়ার ম্যান্ডেট দিবে না। তাঁর কারণ আগেই বলেছি। এ কথা শোনার বা বুঝতে চেষ্টা করার লোক অন্ধ সমর্থকরা নন। তারা কোন কারণ ছাড়াই এমনি এমনি ভালবাসেন। ফেসবুকের কল্যাণে এদের দারুণ একটি নামকরণের সুযোগ পেয়েছি যেমন- “জ্যোতির্ময় ছাগল” বা “আলোকিত গর্দভ” ।

ইতিহাস বলে হিটলার, মুসোলিনির অন্ধ সমর্থকের সংখ্যাও কম ছিল না বরং বলা যায় তাদেরও ঈর্ষনীয় সমর্থন ছিল। এই সমর্থক গোষ্ঠী আবার তারাই যারা সর্বদা তাদের দ্বারাই নিষ্পেষিত হত। হয়ত মাঝে মাঝে মিলত কিছু উচ্ছিষ্টও। সে যাই হোক আসল কথা হচ্ছে, মানুষের এই দাসত্ব বরনের একটা অদ্ভুত ফেসিনেসন আছে। কেন তা স্রষ্টাই ভাল বলতে পারেন। আর তাই তারা সব জেনে শুনেও দানবের কণ্ঠে হাসিমুখে মাল্যদান করে। দানবের কথায় নির্দোষের বুকে চালায় ছুরি। অসহায় নারী – শিশুর মুখে ছুঁড়ে মারে এসিড, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারে পেট্রোল বোমায়।

অনেকে বলেন টাকার জন্য তারা এটা করে। আসলে তা নয় এখানে টাকাটা গৌণ মুখ্য হচ্ছে প্রভুর আদেশ পালনের প্রত্যয়। প্রভুর কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার উদগ্র বাসনা। এই যে দুটি গোষ্ঠী একদলকে আমরা কর্মী বলে জানি আরেকদল সমর্থক এদের এখন যদি আমরা “জ্যোতির্ময় ছাগল” বা “আলোকিত গর্দভ” বলে সম্বোধন করি সেটা খুব কি ভুল হবে? প্রশ্নটা পাঠকের কাছেই তোলা রইল।
kmgmehadi@gmail.com