ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

আমাদের দেশের সুবিধাভোগী মানুষদের সবথেকে বড় সমস্যা হল এরা নতুন ভাবে ভাবতে চান না। পুরাতন জীর্ণ পচাকে আঁকড়ে ধরে বাচতেই তারা বেশি আগ্রহী। আশ্চর্যজনক বিষয় হল বিদ্যা তাদের যতই পরিশীলিত করুক না কেন নতুনের প্রতি যে শুচিবাই তাঁর থেকে তাদের মুক্তি দিতে পারছে না। হতে পারে এটা শিক্ষার গলদ। হতে পারে জাতিগত জেনে-টিক সমস্যা! হতে পারে প্রাপ্ত সুবিদাধী হারানোর ভয়।

কথাটা এ জন্যই বললাম কারণ; আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের দেশের সুসন্তানেরা দেশে বিদেশে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সব পুরস্কারে ভূষিত হচ্ছেন। যা তাদের সাফল্যেরই পরিচয় বহন করেন। তাদের এ সব কৃতিত্ব একান্তই নিজস্ব হলেও এতে জাতি হিসেবে আমরাও কম গর্বিত নই। অথচ এই যে মানুষগুলি, এদের কখনোই দেখতে পাই না সমাজকে পাল্টে দেয়ার চেষ্টা করতে। সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টিকে তারা নিজেদের লাভা লাভ বিচারে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এরা নির্মোহ হতে পারেন না। ফলে গতানুগতিক ধারাকে ভেঙ্গে চুড়ে নতুন সমাজ ব্যবস্থা বিনির্মাণের যে সুযোগ তাদের ছিল বা আছে তার সদ্ব্যবহারে তারা কখনোই সফল হন না। দুর্ভাগ্য হল তারা এর থেকে বেড়িয়ে আসার চেষ্টাটাও করেন না। তারা থাকেন নিজেদের নিয়ে। দেশ হতে দেশান্তরে তারা কথা বলে বেড়ান। বরমাল্য গলায় পরেন সোকেস ভরিয়ে ফেলেন পুরস্কার আর স্তুতিবাক্যে ভরা মানপত্রে। বড়জোর তাদের দেখা যায় সেমিনারে বক্তৃতার মঞ্চে।

কি হয় এসব জমিয়ে? দুদিন পরে তাদের সন্তানেরা হয়ত এসব নিয়ে গর্ব করবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরবে। কিন্তু সেই প্রজন্মের কেউ যদি তখন এই বলে প্রশ্ন তোলে যে- তোমার অগ্রজ যা কিছু অর্জন করেছিলেন তা তো দেখালে। তিনি তাঁর জন্মভূমিকে কি দিয়েছেন তা তো দেখালে না। তখন এই গর্বিত সন্তানেরা হয়ত আজকের এই সব পুরস্কারই লুকিয়ে ফেলতে চাইবেন লজ্জায়। নয় কি?

আমাদের দেশের আজকের যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তা বলতে গেলে সাধারণ মানুষের ঐকান্তিক চেষ্টা আর রাজনীতিবিদদের সহযোগিতায়ই অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। আর যতখানি এগোনোর কথা ছিল। সে পর্যন্ত না পৌঁছনোর যে দায় তা কিন্তু প্রধানত এ দেশের রাজনীতিবিদদের ঘারেই চাপবে। আর তাঁর বাইরে যদি কেউ দায়ী হন তাহলে প্রথমেই সে দায় এসে পড়বে পূর্বে বর্ণিত সফল ব্যক্তিবর্গের ঘারে। তার কারণটা হল তারা শুধু নিজেদের নিয়েই ভেবেছেন নির্মোহ হয়ে দেশের কথা সাধারণের কথা ভাবেন নি।
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে যেমন রাজনীতিবিদগণ ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে ছিলেন। সেদিন যেমন তারা যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশ গড়ে তুলতে দ্বিধা বিভেদ ভুলে দেশের স্বার্থে ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হতে পারেন নি। আজো তাঁর ব্যতিক্রম নয়।

সেদিন বঙ্গবন্ধুর মত এত বড় মাপের একজন নেতাকে ব্যবহার করে একটি সোনার বাংলা গড়ে তোলার সুবর্ণ সুযোগ তারা হাতছাড়া তো করেছেনই এমন কি বিরুদ্ধ ভাবাপন্নদের সহযোগিতা ছাড়াই বঙ্গবন্ধু যেভাবে দেশ গড়ার কাজে মনোনিবেশ করেন তাও বন্ধ করে দিতে তারা বঙ্গবন্ধুকেই সপরিবারে হত্যা করে ফেলল। এখানেও আমি রাজনীতিবিদদেরকেই প্রধানত দায়ী করব। কারণ নেপথ্যে যারাই থাকুক ঘটনাটি তো রাজনীতিবিদদের ছত্রছায়ায়-ই ঘটেছিল! নেপথ্যের কারিগররা শুধু সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েছে মাত্র। সেদিনের সেই কারিগরদের আমরা পরবর্তীতে ঠিকই চিনতে পারি সাজানো সে নাটকে একের পর এক নতুন চরিত্র রূপায়িত হতে দেখে।

সেদিন যখন ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এ দেশের নির্ধারিত গন্তব্যকে পরিবর্তন করে নতুন গন্তব্য নির্ধারণ করা হল তখনও এ দেশের উঁচু তলার সুবিধাভোগী মানুষগুলোর একটি বড় অংশ মুখ বুঝে ছিল। অন্য একটি অংশ গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে নিজেদের সুযোগ সুবিধাকে নিশ্চিত করে নিয়েছিল।

আজ সেই লোকগুলিই আরও বেশি ক্ষমতাবান, আরও বেশি সুবিধাভোগী হওয়া স্বত্বেও স্বভাবের পরিবর্তন করতে পারেননি এতটুকুও। এখনো তারা কোন না কোন দলের হয়েই কাজ করেন। তাদের ক্ষুধা মেটেনা কিছুতেই। এই ক্ষুধা মেটাতে তারা পক্ষ নেন সন্ত্রাসের। এরাই এ দেশে দ্বি দলীয় ধারনা প্রতিষ্ঠিত করে ছেড়েছেন। পুরো দেশটাকেই দুটি শিবিরে বিভক্ত করে ফেলেছেন।

তারা এটাই প্রতিষ্ঠিত করতে চান যে, এ দেশে আওয়ামী লীগ বিএনপির বাইরে অন্য কোন দল বা গোষ্ঠীর জন্মই হতে পারে না। অতএব যতই জ্বালাক-পোড়াক আমাদের মাথায় এদের বিকল্প কোন চিন্তাই আনা যাবেনা।

আমরা আজ আর সেই বিকল্পের চিন্তা তো করতে পারছিই না উপরন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি এবং বিপক্ষ শক্তি বলে দুটি পরস্পর বিরোধী শক্তির ঘোষিত অবস্থানকে মেনে নিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তিকে বৈধতা দিয়ে যাচ্ছি! সমাজে যারা বিবেক বলে পরিচিত তারাই যখন পচে যান তখন সুস্থ চিন্তার বিকাশ ঘটার আর কোন উপায়ই থাকে না।

আজ আপনি কাদের কথা বলবেন শিক্ষক-সাংবাদিক-পেশাজীবী? যেদিকেই তাকাবেন দেখবেন নীতিহিন – আদর্শহীন কিছু অর্থলিপ্সু দলকানা। আমি ঢালাওভাবে বলছি না। তবে একটি সমাজের বেশিরভাগ লোকই কিন্তু ঐ সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। একজন দুজন দলছুট মানুষ কোন ভূমিকাই রাখতে পারে না। বিশেষ করে যখন তাদের প্রতিপক্ষ হয় বিপুল প্রতাপশালী। আমাদের দেশের অবস্থাটাও হয়েছে তাই, এখানে দলকানাদের ভিড়ে সত্যি কথাটা বলা লোকটার চিৎকার খুব সহজেই চাপা পড়ে যায়।

এই মুহূর্তে যদি পাঁচজন সুশীল ব্যক্তির নাম বলতে বলা হয় প্রথমেই আপনাকে তাঁর কথা চিন্তা করতে হবে অথচ এমন একজন লোকই যখন বলে আমি জানিনা কে সহিংসতা চালাচ্ছে ঠিক তখনই জাতিসংঘ থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ প্রায় প্রতিটি দেশের কূটনীতিকরা পর্যন্ত বিএনপি জোটকে সহিংসতা থামানোর আহ্বান জানাচ্ছে। স্বাভাবিক বোধ সম্পন্ন কে না বোঝে কে এই নাশকতার জন্য দায়ী অথচ তিনি বা তারা জানেন না বলছেন। এটা নিরপেক্ষতার পরিচায়ক না নিরপেক্ষতার ভান করে থেকে অপরাধীকে পার পাইয়ে দেয়া? আক্রমণকারী আর আক্রান্ত ব্যক্তি উভয়কেই কি এক পাল্লায় মাপা যায়? না মাপাটা ঠিক?

আলোচ্য ব্যক্তিবর্গ একদিকে বলছেন সরকার আলোচনায় বসলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আবার অন্যদিকে বলছেন সহিংসতা কারা চালাচ্ছে তা তারা জানেন না। তারা বলছেন আলোচনাই সহিংসতা বন্ধের একমাত্র উপায়। প্রশ্ন হল তারা যদি সহিংসতার জন্য কারা দায়ী তা নাই জানবেন তাহলে সংলাপই এর সমাধানের একমাত্র উপায় সে ব্যাপারে নিশ্চিত হলেন কি করে? আর তা ছাড়া তারা সরকারকে যাদের সাথে আলোচনায় বসার তাগিদ দিচ্ছেন তারা যদি সন্ত্রাস নাই চালান তাহলে তাদের সাথে আলোচনা করেই বা কি লাভ। সরকারকে তো তাহলে সন্ত্রাসীদেরকে আলোচনার আহ্বান জানানো উচিত।

আজ যারা পেট্রোল বোমায় সাধারণ নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মারছে তারা কি আদৌ আলোচনায় বসার যোগ্যতা রাখে? এদের সাথে যদি সমঝোতা করতে হয় তাহলে তো এরপরে সমাজবিরোধীরাও একাট্টা হোয়ে বলবে আমাদের সাথে সমঝোতায় আস নইলে পেট্রোল বোমায় সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে মারব। তখন এই সুশীল সমাজ কি বলবেন?

সাদাকে সাদা কালোকে কালো বলাই মহত্তম। এখানে নিরপেক্ষতার ভান করে থাকা চলে না। আর পক্ষ তো মানুষেই নেই। মানুষের বিবেক পক্ষ অবলম্বনের জন্যই কাজ করে। তবে সে পক্ষটা হচ্ছে কোন দলের নয় দেশের পক্ষে সাধারণ মানুষের পক্ষ। আপনি যদি তা না করে কার্যকলাপ বিবেচনায় না এনে দুটি দলকে বাঁচাতেই হবে। দুই দলকেই সমান সুযোগ দিতে চান সেটা সুবিবেচনা প্রসূত হবে না।

অতীত বিবেচনায় না এনে যদি বর্তমানকে বিবেচনায় আনেন তাও অনেক সহজ হয়ে যায় পক্ষ অবলম্বন করা এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রে সেটাই সঠিক বলে বিবেচিত হয়। প্রসঙ্গত আমরা আজ মান্না সাহেবের অতীত নিয়ে বসে থাকব না তাঁর বর্তমান ক্রিয়াকলাপ নিয়ে তাকে বিবেচনা করব?
মহান মক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকে এ দেশের মানুষের কাছে চিরদীনই বীর, দেশপ্রেমিক। তাই বলে কি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকারীদেরও আমরা সমান বিচার করব?

মুখে গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে চিৎকার করলেও বর্তমান আন্দোলন যে একটি গোষ্ঠীর ক্ষমতায় যাওয়ার আন্দোলন তা সকলের কাছেই স্পষ্ট। আর এর পেছনে ক্ষমতা ভোগই যে আসল উদ্দেশ্য তাও নয়। এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে অভিযুক্ত কিছু মানুষকে ক্ষমতার সাবানে পরিশুদ্ধ করা। কিছু মানুষকে আইনের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়া। সর্বোপরি দেশের বর্তমান গন্তব্যকে পুনরায় উল্টোদিকে পরিচালিত করা। এসব জেনে বুঝেও আজ যারা এই দলটিকে বাঁচাতে মরিয়া তাদের প্রতি সন্দেহের তীর বর্ষিত হতে বাধ্য। তারা যদি কোন একটি দলকে বাচাতেই চেষ্টা না করতেন তাহলে এই মুহুর্তে নির্বাচন নয় নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলতেন। নির্বাচন কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান সমূহের সক্ষমতা নিয়ে কথা বলতেন। এমনকি তারা যদি একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনেরও চেষ্টা করতেন সেটাও গ্রহনযোগ্যতা পেত। সে ক্ষেত্রে তারা পারতেন আম আদমির মত দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে রাজনীতির মাঠে আবির্ভূত হতে। তাদের মধ্যে থেকে আমরা কাউকে আন্না হাজারির ভূমিকায় অবতির্ন হতে দেখতাম। তা আমরা দেখিনা বরং তাদের সাথে গাঁটছড়া বাধতে দেখি দুই দলের পরিত্যক্তদের। যারা মূলত দুটি দলের পক্ষ থেকে লিয়াজো করেই চলেন।

আজকের বাংলাদেশ একটি প্রশ্নের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে আর তা হল জয়টা কার হবে রাজনীতির না সন্ত্রাসের? সারা বিশ্বে চলমান সন্ত্রাসের সাথে এ দেশের সন্ত্রাসের একটা বড় পার্থক্য হল অন্যান্য দেশে সন্ত্রাসবাদীদের সাথে সমাজের বঞ্চিত একটি অংশের সমর্থন ও অংশগ্রহণ দেখা যায় আর সমাজের বিবেক বলে পরিচিতরা থাকেন এর বিরুদ্ধে। আর আমাদের দেশে ঠিক তাঁর উল্টোটি ঘটেছে। ফলে এ দেশে সন্ত্রাস শেকড় গাড়তে পারছে না ভাসমান বা পরজীবী হয়ে থাকছে। ফলে এর বিনাশ হবেই। সময়টা যাই লাগুক না কেন। সেই সাথে আজ যারা ভালমানুষের মুখোশ পড়ে প্রতিনিয়ত প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের মুখোশটিও ক্রমাগত খসে পড়বে। তবে এটা যত দ্রুত খসে পড়বে তত দ্রুতই এই সন্ত্রাসেরও বিনাশ হবে। এখন এটা কত দ্রুততার সাথে হয় সেটাই দেখার বিষয়।
kmgmehadi@gmail.com