ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

images
যে সমঝোতা নির্বাচন কেন্দ্রিক সেই সমঝোতায় নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার হিসেব নিকেশই মুখ্য হবে সেটাই স্বাভাবিক। আর এই হিসেব নিকেশই এখন সমঝোতার পথে প্রধান অন্তরায়। আমাদের দেশের রাজনীতির মূল সমস্যাই হচ্ছে দেশ প্রধানত দুটি শিবিরে বিভক্ত। আর এই দুই শিবিরের বাইরে যাদের সমর্থন তারা সমর্থনযোগ্য কোন দল না পেয়ে তুলনামুলকভাবে কাছাকাছি আদর্শের পক্ষকে সমর্থন জুগিয়ে থাকেন। এরা যে রাজনীতি বিমুখ তা নয় বরং বলা যায় এরা মোহমুক্ত। এদের কাছে দল নয় দেশের স্বার্থটাই মুখ্য। এদের সংখ্যাটাও নেহায়েত কম নয় প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষক গন এই বিশাল ভোট ব্যাংককে সুইং ভোট বলে অভিহিত করে থাকেন।

এই ভোট ব্যাংকটির প্রতি বড় দুই জোটেরই আগ্রহ রয়েছে কারণ তারা খুব ভালভাবেই বোঝেন এই ভোট ছাড়া আদৌ কোন দল বা জোটের পক্ষে সরকার গঠন সম্ভব নয়। সমস্যাটা মূলত এখানেই। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের বিশাল বিজয়ের পেছনে ছিল তাদের কিছু রাজনৈতিক ওয়াদা। যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ওয়াদাটি ছিল তা হল মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচার। এর প্রতি যে কি পরিমাণ জনসমর্থন ছিল তা কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে লক্ষ লক্ষ লোকের গনজাগরনমঞ্চে সমবেত হওয়া থেকেই বোঝা গেছে। সোশ্যাল মিডিয়া সেই থেকে আজো একইভাবে এই বিচার নিয়ে সোচ্চার। এমনকি এর বাস্তবায়নের ধীর লয়েও তারা উদ্বিগ্ন। তাঁর কারণটিও সহজেই বোধগম্য। ভয় একটাই, যদি পরবর্তীতে আওয়ামীলীগ সরকার গঠনে ব্যর্থ হয় তাহলে এই বিচারের কি হবে? বলার অপেক্ষা রাখে না এই যে বিপুল সংখ্যক মানুষ; যারা কায়মনোবাক্যে চাইছে মানবতা বিরোধী অপরাধীরা উপযুক্ত সাজা পাক তারা কিন্তু সবাই আওয়ামীলীগের একনিষ্ঠ সমর্থক নন। বলা যায় এরাই আসল সুইং ভোটার। যারা আওয়ামীলীগ সরকারকে বাধ্য করেছিল নতুন আইন পাশ করিয়ে কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে। এই বিপুল জনগোষ্ঠী যে, আওয়ামীলীগের অন্য যে কোন হঠকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেও ঠিক একইভাবে রাস্তায় নেমে আসবে না সেই গ্যারান্টি কে দিবে। যেচে সেই বিপদই বা কেন তারা ঘারে নিবে?

বিএনপির চলমান আন্দোলনে সবথেকে বেশী ক্ষতির স্বীকার হয়েছে প্রান্তিক মানুষ। এই ক্ষতিগ্রস্ত লোকগুলো কি চাইবে আওয়ামীলীগ সন্ত্রাসের কাছে নতি স্বীকার করুক; মোটেই না। কারণ রাষ্ট্র যদি কখনো সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয় বা সন্ত্রাসকে লালন করে তার ফলাফল যে কতখানি ভয়াবহ হতে পারে তার উদাহরণ পাকিস্তান। আর সেই পাকিস্তানের আদর্শের ধারক বাহক জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি যে আর যাই হোক অন্তত মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচারকে এগিয়ে নিয়ে যাবে না সেটি তারা ভাল জানেন। সেইসাথে তারা এটাও জানেন যে, দেশ থেকে জঙ্গিবাদ দূর করা একমাত্র আওয়ামীলীগের পক্ষেই সম্ভব।

মুখে স্বীকার না করলেও বিএনপি জোট যে কোনমতেই মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচারের এই ধারা অব্যাহত রাখবে না এমনকি রায়সমূহকেও যে তারা বাস্তবায়ন করবে না তা বলাই বাহুল্য। সেই সাথে তাদের সময়ে দেশে জঙ্গিবাদ যেভাবে যেকে বসেছিল তার মূলোৎপাটন যে আওয়ামীলীগ ছাড়া সম্ভব নয়। সে ব্যাপারেও কারো দ্বিমত নেই। এই যখন সাধারণ মানুষের ধারনা, সেখানে জোটবদ্ধ থাকা অবস্থায় বিএনপির সাথে কি করে আওয়ামীলীগ সংলাপে বসবে? যদি বসে তাহলে তারা এই ভোটারদের কাছেই বা কি জবাব দেবে?

এ তো গেল একটি দিক। দ্বিতীয়ত এতদিন যাবত যে মানুষগুলি বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। দলটিকে নিঃস্বার্থভাবে ভালবেসেছে। আজ যখন তারা দেখছে শুধু মাত্র ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিএনপি-জামায়াত জোট কতটা নৃশংস হতে পারে। সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য এই দলগুলির কাছে কত সামান্য! তখন কি তাদের মধ্যে কিছু মানুষও বিবেকের তাড়নায় এদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে না? এই মানুষগুলির সমর্থন আওয়ামীলীগ নিতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। আবার রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে এটা চিন্তা করাও তাদের দায়িত্ব যে, সন্ত্রাসী কার্যকলাপের কাছে মাথা নত করা রাষ্ট্রের জন্য কতটা সঠিক? এই অবস্থায় যে যাই বলুক দুই পক্ষের সমঝোতা অসম্ভব। এটা একদিকে যেমন রাষ্ট্রের স্বার্থে অন্যদিকে দলীয় স্বার্থে।
বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলন শুধু যে ক্ষমতায় যাবার জন্য তা নয় আর সেটাও দিবালোকের মতই স্পষ্ট। তাদের মুল উদ্দেশ্য ক্ষমতার অপব্যবহার করে আইনের হাত থেকে বাঁচা। আর সে কারণেই এত তাড়াহুড়ো। কথা হচ্ছে তাদের এই অনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দেয়ার দায়িত্ব কেন আওয়ামীলীগ বা অন্যেরা নিবে?

পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন যেভাবেই হোক হয়েছে। বিএনপি জোট আওয়ামীলীগের সাংবিধানিক দোহাই দিয়ে অনতিবিলম্বে পুনরায় নির্বাচনের ব্যবস্থা করার শর্তে নির্বিঘ্নে নির্বাচন সম্পন্ন করতে দেয়ার প্রস্তাবে রাজি না হয়ে নির্বাচন বানচালের সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। তারা তখন প্রায় ছয়শ স্কুল পুড়িয়েছে। অজস্র বৃক্ষ নিধন করেছে। কয়েকটি জেলাকে দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন পর্যন্ত করে ফেলেছিল। প্রিজাইডিং অফিসার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ মেরেছে। এতসব বিভীষিকা চালিয়েও তারা নির্বাচন বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ এখন তারা বলছেন, সরকার তখন মধ্যবর্তী নির্বাচন দেয়ার ওয়াদা করেছিল। কি আশ্চর্য! ওয়াদা তো যে শর্তে করেছিল তা তারা পালনই করেননি তাহলে সেটা ওয়াদাই বা করা হল কি করে? আর তা রক্ষা করারই বা প্রশ্ন আসে কেন।

নির্বাচনের এক বছর পরে এসে দেখা গেল দেশ এগিয়ে যাচ্ছে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বহির্বিশ্বে এর এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতাও লাভ করেছে। দেশের সাধারণ মানুষ তো নির্বাচনপুর্ব তাণ্ডবের কথা চিন্তা করে নতুন কোন আন্দোলনের কথা চিন্তাও করতে পারছে না। অর্থনীতির চাকা সচল। পদ্মা সেতুর মত মেগা প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে বিদ্যুৎ গতিতে। এই অবস্থায় সরকারকে সমঝোতায় আসতে বাধ্য করতে বিএনপি জোট সাধারণ মানুষের সারা না পেয়ে নিরীহ মানুষ মারার খেলায় মেতে উঠল।

শিশু, বৃদ্ধ, অন্তঃসত্ত্বা মা সহ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ কেউ তাদের এই হত্যা লীলা থেকে বাদ গেল না। ভাবখানা এমন যে দেশটা আওয়ামীলীগের। এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাও শুধু আওয়ামীলীগের। কাজেই দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে তাদের সাথে বসতে হবে তাদের দাবি মেনে নিতে হবে। বিএনপি পন্থী বুদ্ধিজীবীরা টিভি টক শো’তে এসে বলতে শুরু করলেন সেই মায়ের গল্প। যে মা তার বাচ্চার স্বত্ব ছেরে দিয়েছিলেন বাচ্চাটাকে বাঁচানোর জন্য। কি অদ্ভুত তাদের মনোজগৎ! এ কথা বলে তারা তো প্রকারান্তরে বেগম জিয়াকেই মিথ্যে মায়ের আসনে বসিয়ে দিলেন। এখন কথা হচ্ছে অসতর্কভাবে তারা যে শেখ হাসিনাকে আসল মা বলে চিত্রিত করলেন। সেই আসল মা’ই বা এমন একটি অনৈতিক সিদ্ধান্ত নিলে তাঁর সন্তানদের কাছে কি জবাব দিবেন?

কাজেই শেখ হাসিনা চাইলেই পারেন না এভাবে সমঝোতায় যেতে। আর পারেন না বলেই তিনি বিএনপি নেত্রীকে বার বার সুযোগ করে দিতে চেয়েছেন। যা তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই পরিচয় বহন করে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল বিএনপি নেত্রী সেই সুযোগ গুলি কাজে লাগান নি। অথচ তারা সংলাপ চান, সমঝোতা চান(?) তাদের এই চাওয়ার মাঝেই একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়েছে। সেইসাথে এটা বাস্তবসম্মতও নয়। বরং সত্যিই যদি বিএনপি জোটের দাবি হয় একটি সুষ্ঠু নির্বাচন তাহলে তাদের প্রথমেই এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি থেকে সরে আসতে হবে। সেই সাথে তাদের দাবীটা হওয়া উচিৎ সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায় সমূহ দূর করা।

আমরা জানি বিএনপির পক্ষে জামায়াতকে ছাড়া সম্ভব নয়। তারা তা করতে পারবেও না। কাজেই তারা যদি গণতন্ত্রের জন্য বা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করে থাকে তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার দাবী জানাক। তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকার যাই বলুন না কেন। এ সবের যৌক্তিক বিকল্প হচ্ছে শক্তিশালী স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। তেমন একটি নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবিতে বিএনপি জোট আন্দোলন করুক। তবেই না এই আন্দোলনে সফলতা আসবে। তারা তো সেটা করছে না।

এখন এই আন্দোলনের কুৎসিত উদ্দেশ্যটি নগ্ন রূপে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে যা প্রথমদিকে এই আন্দোলনের যেটুকু আবেদন ছিল সেটুকুকেও তিরোহিত করে ফেলেছে। এই অবস্থায় বিএনপি যখন বলছে আন্দোলনের পাঁচ স্তরের মোটে এক স্তর পার হচ্ছে তখন সাধারণ মানুষ আরও ভীত হয়ে পড়েছে। যে ভয় শ্রদ্ধা মিশ্রিত নয় ঘৃণা মিশ্রিত। আজ যে সব বুদ্ধিজীবীরা উদাহরণ হিসেবে বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতা বাতি গ্রুপের সাথে সরকারের সংলাপের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বিএনপির সাথে সংলাপের উদ্যোগ নিতে বলে কি প্রকারান্তরে বিএনপিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী দলের কাতারে নিয়ে যাচ্ছেন না? এটা বিএনপির জন্য কতটা সম্মানজনক তা তারাই ভাল বলতে পারবেন। তবে এটা ঠিক, বিএনপি জোটের বর্তমান আন্দোলনের যে ধরন তাকে কোন ভাবেই গণতান্ত্রিক আন্দোলন বলার সুযোগ নেই। আর এই অগণতান্ত্রিক আচরণই সংলাপ সমঝোতার পথকে দুর্গম করে তুলেছে। তাই এ অবস্থায় সমাধান সংলাপ বা সমঝোতার মাধ্যমে নয় ছাড় দিয়েই করতে হবে। সেই ছারটি এবার অন্তত বিএনপিকেই দিতে হবে। অন্যথায় আন্দোলনেরও একটি জীবন চক্র থাকে যাকে যথাসময়ে থামিয়ে দিলে পরবর্তীতে প্রায় সেখান থেকেই শুরু করা যায় আর এটা নিয়ন্ত্রনহিন হয়ে পরলে একসময় স্বাভাবিক ভাবেই এর পরিসমাপ্তি ঘটে। তবে অন্যান্য জীবন চক্রের মত এটা একাই নিঃশেষ হয়ে যায় না সাথে এর কুশীলবদেরও নিঃশেষ করে ছারে। এখন সিদ্ধান্ত বিএনপিকেই নিতে হবে যে তারা কোনদিকে যাবে।

kmgmehadi@gmail.com