ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

untitled-1_133944
দু’দিন পূর্বে প্রথম আলো পত্রিকায় একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে দুজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র যারা কোন রাজনীতির সাথে জড়িত নয় তাঁরা বিএনপির পোলিং এজেন্ট হওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হলেও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের পরামর্শে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন এবং পোলিং এজেন্ট হতে অপারগতা প্রকাশ করেন। কথাটি নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরেও অনেকখানি গুরুত্বপূর্ণ বলেই উল্লেখ করছি। যেহেতু বিএনপি নির্বাচন শুরু হওয়ার মাত্র তিন ঘণ্টার মাথায় সকাল সাড়ে এগারটার মধ্যেই নির্বাচন থেকে নিজেদের সমর্থিত প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেয়।

ঢাকা চিটাগাং শহরের মত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মত দল পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করতে ব্যর্থ হবে এমন কথা তাদের চরম শত্রুও বলতে পারবে না অথচ পত্রিকার প্রতিবেদন বলছে সেটাই। আর এ কারণেই এই প্রতিবেদনটি গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি কি তাহলে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল যে তাঁরা নির্বাচনে অংশগ্রহণই করবেন এই নির্বাচন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে মাঝপথে বেড়িয়ে আসতে?

যারা সকাল থেকে টেলিভিশন সেটের সামনে বসেছিলেন তাদের নিশ্চয়ই চোখে পড়েছে। নির্বাচন থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত তাবিথ আউয়াল বা মনজুর আলমকে যতবার ক্যামেরার সামনে কথা বলতে দেখা গেছে একটিবারের জন্যেও মনে হয়নি অভিযোগ জানালেও কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিবেন। এমনকি মওদুদ আহমেদের ফাঁস হওয়া ফোনালাপে স্পষ্টই বোঝা গেছে তাবিথ ঐ সময় নির্বাচনী মাঠ থেকে উঠে আসতে চাননি। অর্থাৎ এটা স্পষ্টই বোঝা গেছে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা হয়নি বরং করানো হয়েছে। যার সব থেকে বড় প্রমাণ ক্ষুব্ধ মনজুর আলমের রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার ঘোষণা। তা ছারা সংবাদ সম্মেলনে আসার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তাবিথ আউয়ালের মুখে হাসিটি ছিল আত্মবিশ্বাসের। আর সে আত্মবিশ্বাসের পেছনে যে যৌক্তিকতা ছিল তার প্রমাণ আমরা দেখতে পাই তাবিথ আউয়াল, মির্জা আব্বাস এবং মনজুর আলমদের সাথে বীজিতের ভোটের ব্যবধানেই।যে ব্যবধান লক্ষ করা গেছে তা তাদের জয়ের সমূহ সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দেয়। কেননা আমাদের মনে রাখতে হবে দলটি চিটাগাং-এ সাড়ে এগারোটায় এবং ঢাকায় বারোটার মধ্যেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়। তারপরেও এই পরিমাণ ভোট পাওয়া তাদের হেরে যাওয়াকে নির্দেশ করে না । কাজেই এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় বিএনপিই তাদের সমর্থন দেয়া মেয়র প্রার্থীদের হারিয়ে দিয়েছে।
যারা সর্বদাই রাজনীতিবিদদের কর্মকাণ্ডের পেছনে যুক্তি খুঁজে বেড়ান তাঁরা এ ক্ষেত্রেও তাই করবেন সন্দেহ নেই। এ বেলায় তাদের প্রশ্নটা হবে, যদি জয়ী হবে যেনেই থাকেন তাহলে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলেন কেন? সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আরেকটি প্রশ্নের মধ্যে। আর তা হল ভোট গ্রহণের সময় সীমার এক তৃতীয়াংশ পার হওয়ার আগেই তাঁরা কি করে বুঝলেন যে তাঁরা হেরে যাবেন?

তাবিথ আউয়াল এবং মনজুর আলম যে স্বেচ্ছায় নির্বাচনী মাঠ ছেরে চলে যাননি তা তাদের কর্মকাণ্ডেই প্রমাণিত হয়েছে। আর তা ছাড়া গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পূর্বে থেকে আজ অবধি বিএনপি জোটের কোন পদক্ষেপটি আপনার কাছে যৌক্তিক বলে মনে হয়েছে? যারা বলেন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরে দুহাজার চৌদ্দ সালের পুরো একটি বছর বিএনপি আন্দোলন থেকে দূরে সরেছিল। তাদের সেই আন্দোলন থেকে দূরে সরে থাকাটা কোন ইতিবাচক সিদ্ধান্তের ফসল ছিল না। সেটা ছিল বাধ্যতামূলক; তাঁরা তখন ঐ সময়টাতে দল গোছানোর স্বার্থেই থেমে ছিল। অন্য কোন কারণে নয়।

২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত মেয়র নির্বাচনে শুধু যে ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট দেখা যায়নি তাই নয়। ভোট কেন্দ্রের আশেপাশে বিএনপির দলিয় নেতা কর্মীর সংখ্যাও ছিল হাতে গোনা। আর তাদের গা ছাড়া ভাবটিও সহজেই যে কোন নির্বাচন পর্যবেক্ষকের চোখে পড়বে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দল যেমন সমর্থন জুগিয়েছে ঠিক তেমনি তাদের নির্বাচন বয়কট করতেও বাধ্য করেছে। আর নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার কাজটি করতে হয়েছে প্রার্থীকে স্ব উদ্যোগে এবং প্রায় একা। এখানে দলের ভূমিকা ছিল একেবারেই নগণ্য।

নির্বাচনে প্রার্থীদের জন্য দলগুলো সবথেকে বড় যে কাজটি করে দেয় তা হল প্রতিটি কেন্দ্রে দলের বাছাইকৃত নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের মধ্যে থেকে বাছাই করে পোলিং এজেন্ট নিয়োগ দেয়া। যে কাজটি একজন ব্যক্তির পক্ষে করাটা অনেকটাই অসম্ভব। এই নির্বাচনে বিএনপি বা বিশ দলের পক্ষ থেকে সমর্থন দেয়া তিনজন মেয়র প্রার্থীর বেলায়ই একই অভিযোগ শোনা গেছে। বিএনপি তার কর্মীদের এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়নি বা দিতে ব্যর্থ হয়েছে । কাজেই বলা যায় বিএনপির একটি রাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এরা তিনজন রাজনৈতিক খেলার বলী হলেন।

প্রশ্ন হল জিতল কে?

বিএনপির এই হঠকারী সিদ্ধান্তটি একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের অভিযোগ সম্পর্কে সন্দেহের উদ্রেক করেছে ঠিক তেমনি তাদের নিজেদের সহ হারিয়ে দিয়েছে সবগুলো পক্ষকে।

যেসব অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন তা নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়ার মত ততটা মারাত্মক ছিল না। তাদের অভিযোগ সুনির্দিষ্ট ছিল না। তা ছাড়া উদ্ভূত সমস্যার সমাধানের জন্য তাঁরা লিগ্যাল একশনেও যাননি। নির্বাচনে অংশগ্রহণের ইচ্ছা থাকলে সেটাই হত স্বাভাবিক। এক কথায় বলা যায় কিছু গোলযোগ হলেও অত অল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর মত যৌক্তিক কোন ব্যাখ্যা উপস্থাপনে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন।

বিএনপির এভাবে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হল এদেশের গণতন্ত্র। এর ফলে তাঁরা ক্রমশই গণতান্ত্রিক পথ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। সরকারও এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থানের পক্ষে যে উদাহরণটি স্থাপনে সক্ষম হত তা থেকে তাঁরা বঞ্চিত হল।

আবার নির্বাচন কমিশনও এই নির্বাচনটিকে অবাধ ও সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্নের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের সক্ষমতা প্রমাণের যে সুযোগটি পেয়েছিল তার থেকে তাঁরাও বঞ্চিত হল।

হতে পারে বিএনপি এই নির্বাচনটিকে গ্রহণই করেছিল ব্যর্থ আন্দোলনের ঘেরাটোপ থেকে বেড়িয়ে আসার একটি সুযোগ হিসেবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। স্বীয় কর্মকাণ্ডের পরে হয়ত তারাও এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে এরপরে আর সাধারণ ভোটাররা তাদের ভোট দেবে না। তাদের সেই ধারনা ভুল প্রমাণ করতেই কিনা জানিনা সাধারণ মানুষ বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের এত পরিমাণে ভোট দিয়েছে যা দেখে দিনশেষে তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকল না।

kmgmehadi@gamil.com