ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

চিনি শিল্পকে লাভজনক করতে সরকার বেশ কিছু সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং তার বাস্তবায়নও শুরু করেছে। যার একটি হল, “নর্থ বেঙ্গল চিনিকলে অমৌসুমে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ‘র’-সুগার থেকে বছরে ৪০ হাজার মেট্রিক টন ক্ষমতাসম্পন্ন সুগার রিফাইনারি স্থাপন প্রকল্প যার কাজ এগিয়ে চলছে। আরেকটি প্রকল্প হল- ঠাকুরগাঁও চিনিকলে পুরনো যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি সুগারবিট থেকে পরীক্ষামূলক ভাবে চিনি উৎপাদনের প্রকল্প বাস্তবায়ন। গত ২৯ মে বিএসএফআইসি’র উৎপাদিত প্যাকেট জাত আখের চিনি বাজারজাতের উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু রাজধানীর দিলকুশায় চিনি শিল্প ভবনে সেই বিক্রয় কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।

যদিও সরকার তখন বলেছে সবে বরাত ও রমজানে ন্যায্যমূল্যে মানসম্পন্ন চিনি সরবরাহ নিশ্চিত করতেই প্যাকেট জাত আখের চিনি বিক্রির এই উদ্যোগ। কিন্তু আমাদের কথা হল ভয়াবহ রুগ্ন হয়ে পরা এই শিল্পটিকে বাচাতেই তো বিএসএফআইসি’র উৎপাদিত প্যাকেট জাত আখের চিনি বাজারজাতের জন্য সুষ্ঠু বিপণনের ব্যবস্থা করা দরকার।

আমাদের দেশে সরকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের মুল সমস্যাই বিপণন ব্যবস্থায়। আমাদের মানসম্পন্ন পন্ন রয়েছে আমরা তার সঠিক প্রচারণা চালাতে পারি না। আমরা আমাদের পণ্যের সঠিক বিপণন করিনা বা করতে পারি না। ফলে একেকটি প্রকল্প ভেস্তে যায়। আসলে একে বলা উচিৎ একেকটি প্রকল্পের গলা চেপে ধরে হত্যা করা হয়।

বাজারে একই পণ্যের হাজারটা ব্র্যান্ড থাকবে। তার মাঝেই আমার ব্র্যান্ড মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। সিদ্ধান্তটি এমনই থাকা উচিৎ। বিএসএফআইসি’র তো অর্থের সমস্যা নেই তাদের উচিৎ ছিল এই পণ্যটির আকর্ষণীয় টিভিসি তৈরি করে প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেলে বেশী বেশী প্রচার করা। তারা টিভিসি ঠিকই তৈরি করেছে যা মাত্র একবারই কোন একটি চ্যানেলে আমি দেখেছিলাম।

যে কারণে অধিকাংশ মানুষ জানেনই না বিএসএফআইসি’র উৎপাদিত আখের চিনি বাজারজাত করা হচ্ছে। অথচ এই চিনিটির বাজারে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। বহুদিন যাবত আখের চিনির বাজারে অনুপস্থিতির কারণে এখন আর এই চিনিটির খোঁজও কেউ করেনা এটা ঠিক, কিন্তু তার মানে এই নয় যে এর ভোক্তা নেই। আসল কথা হল ভোক্তার কাছে তার উপস্থিতির খবরটি পৌঁছুতে তো হবে?

একজন বিপণন কর্মী হিসেবে আমি নিজে যেটা জানি তা হল, একটি নতুন পণ্য বাজারজাত করতে হলে প্রথমেই বাজারে তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হয়। সেটা যদি পঞ্চাশ ভাগ সম্ভব হয় তার ফলও হবে পঞ্চাশ ভাগ। আর তার পরেই যেটা জরুরী তা হল পণ্যের ডিসপ্লে। যেখানে পণ্য নিজেই নীরব বিপণন কর্মীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সব শেষে ডেপথ তৈরি করে ফেলা যাতে সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী পন্য প্রবেশের সুযোগই কমে যায়। অথচ এই চিনিটি বাজারজাতের ক্ষেত্রে এমন কোন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে মনে হল না।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করার মত আর তা হল ফরমালিন যুক্ত মাছ বা ফলে যেমন মাছি বসে না ঠিক তেমনি বাজারে বর্তমানে প্রচলিত চিনির উপরেও মৌমাছি বসে না। অথচ আখের চিনির একটি বস্তা খুলে রেখে দেখুন সেখানে কি পরিমাণ মৌমাছির আনা গোনা হয়। প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি বলেই যে আখের চিনির উপরে মৌমাছিরা নির্ভয়ে বিচরণ করে সেটা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই বিষয়টিও উৎপাদককে ভোক্তার নিকট তুলে ধরতে হবে। বিএসএফআইসি’র এমন একটি স্লোগান নিয়ে এগিয়ে যাওয়া উচিৎ যেখানে তারা বলবে, আসুন আমরা স্বাস্থ্য সচেতন হই দেশীয় চিনি ব্যবহার করি। আসুন আমরা দেশপ্রেমী হই কৃষি নির্ভর অর্থনীতিকে সমৃদ্ধশালী করি। দেশের উন্নয়নে অবদান রাখি।

বিএসএফআইসি যদি বিপণন খরচ ছারাই এই পন্যটি বাজারজাত করতে চায় তাহলে তো অন্তত ব্যবসায়ীদের আকর্ষণীয় মুনাফার ব্যবস্থা করবে, যাতে তারা স্ব উদ্যোগেই পণ্যটি বিক্রির চেষ্টা করে। সম্ভবত তারা সে উদ্যোগটিও গ্রহণ করেন নি কারণ আজ পর্যন্ত কোন দোকানদারের কাছেই এই চিনিটি নাম ধরে না চেয়ে পাই নি। তাদের আচরণে স্পষ্টতই বোঝা যায় এটা তারা বিক্রিতে আন্তরিক নন। আর ব্যবসায়ীর আন্তরিকতা যে লাভের সাথে সম্পর্কযুক্ত সেটা কে না জানেন।

কোন বিপণন ব্যবস্থা ছারাও এই পণ্যটি টিকে থাকবে। অনেকটা মিল্ক ভিটা তরল দুধের মত। যা এ দেশের মানুষের দেশপ্রেমের একটি উদাহরণও বটে। তবে সেটা একটি প্রতিষ্ঠানকে খুব বেশী যে লাভজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় না। তার প্রমান তো মিল্ক ভিটা নিজেই। সব শেষে বলব, চিনি শিল্পকে রাষ্ট্রায়ত্ত সবচেয়ে বড় শিল্পে পরিণত করার এটা একটি অনেক বড় সুযোগ। আর সেই সুযোগটি কাজে লাগাতেই প্রয়োজন সুষ্ঠু বিপণনের ব্যবস্থা গ্রহন। যার মাধ্যমে প্যাকেট জাত আখের চিনি বাজারে একটি ভাল অবস্থান তৈরি করে নিতে সক্ষম হবে।

1395111_112452012423119_3726608156403277803_n

kmgmehadi@gmail.com