ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

image_567_80067
পৃথিবীর কোন দেশই অপরাধ বা অপরাধী মুক্ত নয়। অপরাধ প্রবণতা মানুষের একটি সহজাত কু প্রবৃত্তি। এর থেকে কেউই মুক্ত নন। যিনি প্রকৃত অর্থে মানুষ তিনি তার সেই কু প্রবৃত্তিকে দমন করতে সক্ষম হন। আর যিনি বা যারা ব্যর্থ তাদের জন্যই আইন, বিচার ব্যবস্থা, বিচারালয়।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপরাধীকে সনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে বিচারের সম্মুখীন করা। তার উদ্দেশ্য যে শুধুমাত্র অপরাধীকেই সংশোধন করা তা নয় বরং একইসাথে সমাজের অন্য সকলের কাছেও একটি সতর্কবার্তা পৌঁছে দেয়াই এর মুল লক্ষ। যাতে অপরাধীর মনে এই ভয়টা জাগ্রত হয় যে, অপরাধ করলে শাস্তি পেতেই হয়। আর এর ফলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমে আসে। সে আত্ম সংশোধনের মাধ্যমে হোক আর বিচারের ভয়েই হোক।

কিন্তু আমাদের সমাজে বেশির ভাগ সময়েই দেখা যায় বিচারের বানী নিভৃতে কাঁদে। আর সে জন্যে একক ভাবে কাউকেই দায়ী করার সুযোগ নেই। তদন্ত কার্যক্রম থেকে শুরু করে মহামান্য আদালতের বিবেচনা; এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে যে কোন স্থানের সামান্য অবহেলা বা দ্বায়িত্ব হীনতাই একটি অপরাধীকে পার পাইয়ে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। সবচেয়ে বড় কথা হল বেশির ভাগ অপরাধেরই বিচার চেয়ে ভুক্তভোগিরা নানা কারণে বিচারালয়ের দোরগোড়া অবধি পৌঁছাতে সক্ষম হন না।
আর যা্রাও বা পৌঁছুতে সক্ষম হন তারাও অনেক ক্ষেত্রেই নানা প্রতিকুলতার সম্মুখীন হন। সেখানে দেখা যায় ক্ষমতার অপব্যবহার। অর্থের প্রভাব।
দেখা যায় যে অপরাধী যত বেশি ক্ষমতাধর তিনি তত বেশি সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেন। সুযোগ নেয়ার চেষ্টা মানুষ তখনই করে যখন সুযোগ পাবেন বলে বিশ্বাস করেন। প্রকারান্তরে তারা প্রায়শই সে সুযোগটি পেয়েও থাকেন। যার ফলে দিন দিন অপরাধীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে ঠিক একই হারে বাড়ছে অপরাধের সংখ্যাও।
মাননীয় আদালত সুবিচার করবেন এই আশা নিয়ে বিচারপ্রার্থী আদালতের দারস্ত হলেও দেখা যায় যাদের সহযোগিতায় তিনি মাননীয় বিচারপতির সম্মুখীন হচ্ছেন তারাই তার মামলাটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করলেন যেখানে অপরাধের মাত্রাটিই লঘু করে দেখান হল। অথবা অপরাধীকে পুলিশ ধরতেই পারছে না।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের “অন্ধকারেই পুলিশ” শিরোনামের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, “সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এ যাবৎ কালে সংঘটিত কোনও ধর্মীয় হত্যাকাণ্ডের ক্লু-ই উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। ২০০০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শেরশাহ্ সুরি রোডের বাসায় নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয় পীর আলহাজ মুজিবুর রহমান চিশতীকে (রহ.)। ওই হত্যাকাণ্ডের বাদী হয়েছিলেন ময়মনসিংহের ভালুকার সাবেক সংসদ সদস্য আমান উল্লাহ চৌধুরী। বিশেষ করে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেনজির ভুট্টো ১৯৯১ সালে জয়পুরহাট সদরে ওই পীরের গ্রামের বাড়িতে সাক্ষাৎ করার জন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন। এর পর থেকেই ওই পীরের নাম দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, ওই পীরের অন্যতম ভক্ত ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর গোপীবাগের ৬৪/৬ রামকৃষ্ণ মিশন রোডের বাসায় কথিত ইমাম মাহ্দী পীর লুৎফর রহমান এবং তার ছেলেসহ ছয়জনকে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২০১৩ সালের ৮ আগস্ট ঈদুল ফিতরের আগের দিন খুলনার খালিশপুরে তৈয়াবুর রহমান (৭০) ও তার ছেলে নাজমুন মনিরকে (১৩) গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল দুই অজ্ঞাত দুর্বৃত্ত। ঘাতকরা ভক্ত হিসেবেই ওই বাসায় প্রবেশ করেছিল। তৈয়াবুর রহমান মুসলিম উম্মাহ নামের একটি ধর্মীয় সংগঠনের প্রধান ছিলেন। ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট পূর্ব রাজাবাজারের নিজ বাসায় খুন হন মাওলানা নূরুল ইসলাম ফারুকী। সর্বশেষ ৫ অক্টোবর মধ্য বাড্ডার নিজ বাসায় খুন হন প্রকৌশলী খিজির খান। অন্যদিকে ২৬ ফেব্রুয়ারি মুক্তমনা লেখক ব্লগার ড. অভিজিৎ রায় এবং ঠিক এক মাসের মধ্যে তেজগাঁওয়ে একই কায়দায় কুপিয়ে ও গলা কেটে খুন করা হয় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে। এরপর সিলেট শহরে অনন্ত বিজয়, রাজধানীর খিলগাঁওয়ে নীলাদ্রি চ্যাটার্জি ওরফে নিলয় নীল খুন হন। এর আগে আরও কয়েকজন ব্লগার খুন হলেও কেবল আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যা মামলা ছাড়া সব কটির তদন্তের তেমন একটা অগ্রগতি নেই বলে জানা গেছে।বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১০/১০/২০১৫

কেন এই অবস্থা? এর উত্তর সংশ্লিষ্টদের কাছে কি আছে? তবে সাধারণের মাঝে এই ব্যর্থতাই যে নিরাপত্তা হীনতার অন্যতম কারন বলে চিহ্নিত হচ্ছে সেটা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না।
গত(৯/১০/২০১৫)তারিখের কালের কণ্ঠে আরেকটি প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে কেন এখনো এমপি লিটনকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না। যেখানে তারা কোন রাখ ঢাক না রেখেই বলছেন, সবুজ সংকেত নেই তাই লিটন অধরা!
এমন একটি শিরোনামে জাতীয় পত্রিকার একটি প্রতিবেদন অনেকগুলি প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। যেখানে মন্ত্রী পদে আসীন থাকা অবস্থায়ও লতিফ সিদ্দিকিকে গ্রেফতার হতে হল। মন্ত্রিত্ব, সংসদ সদস্য পদ এমনকি দলিয় প্রাথমিক সদস্য পদ পর্যন্ত হারাতে হল। সেখানে এমপি লিটন কেন এখনো অধরা?
না আমি দুটো অপরাধকে এক করে দেখছি না। তবে অপরাধ অপরাধই কোনটাকেই খাটো করে দেখারও উপায় নেই। আর সে কারনেই প্রশ্নটা উঠছে যে, তবে কি সরকার যা কিছু করে তা জনরোষ থেকে বাচতেই করে?
আর তা ছাড়া অপরাধীর বিচার কি তবে সরকারের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করবে?
তাই যদি হয় তাহলে বলব সরকার প্রত্যক্ষ জনরোষকে প্রাধান্য দিচ্ছে পরোক্ষ জনরোষকে উপেক্ষা করছে। অথচ ধূমায়িত এই জনরোষই এক সময় অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে সব পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। সেটা তারা বিবেচনায় নিচ্ছেন না।
ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রে সরকার জিরো টলারেন্স নিতি গ্রহণ করল।
কখন সে নিতি গ্রহন করল? বহু সময় ক্ষেপণ, বহু ক্ষতির স্বীকার হয়ে তবেই। এটা কিন্তু সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষণ নয়।

মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধ পরিকর। খুবই ভাল কথা এটা তাদের ওয়াদা, তারা তা পালন করছেন। সেই বিচারের পথকে মসৃণ করতে তারা তরুণ প্রজন্মকে মাঠে নামার সুযোগ করে দিয়েছে। তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের সে ঢেউ যে এই বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সরকারকে নৈতিক শক্তির যোগান দিয়েছে, দেশি বিদেশী জনমত গঠনে সহায়তা করেছে। এটা নিশ্চয়ই তারা অস্বীকার করতে পারবে না।
অথচ এই একটি মাত্র কারণে তরুণ প্রজন্মের সেই অন্দোলনের সাথে জড়িত অনেকের গায়েই নাস্তিকের তকমা লাগিয়ে দেয়া হল। তাদের কেউ কেউ নির্মম হত্যাকাণ্ডের স্বীকার হল। স্বজনরা সুবিচারটুকু পেল না।
তারা কি আসলেই নাস্তিক ছিল? প্রশ্নটি এ জন্যেই করছি; কারণ তাদের অনেকেই প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে নিজেদের আস্তিক বলে দাবি করেছেন। অন্তর্যামী জানেন অন্তরের খবর, মানুষ নাচার। অথচ সেই মানুষই তাকে নাস্তিক বলে সাব্যস্ত করছে কোন যুক্তিতে? কবি কাজি নজরুল ইসলামকেও তো এক সময় নাস্তিক বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। মহান আল্লাহর অশেষ কৃপা যে তখন এই সব জঙ্গির জন্ম হয়নি। নইলে নজরুলের মহান সৃষ্টির অনেক কিছুই আমরা পেতাম না।
তর্কের খাতিরেই ধরে নিলাম তারা নাস্তিক। কিন্তু সেটা কি এই আন্দোলন শুরুর পর থেকেই? এর আগে তো কখনোই কোন হিট লিষ্টের কথা শোনা যায়নি। আর কালে ভদ্রে ঘটে যাওয়া দু’একটি ঘটনা বাদ দিলে চাপাতির এমন দৌরাত্ম্য দেখা যায়নি।
অথচ এ দেশে স্বঘোষিত নাস্তিকের সংখ্যাও তো কম নয়। এর আগে কজনের উপর হামলা হয়েছিল? এরপর আমরা যদি কখনো প্রতিশোধমুলক হামলা হতে দেখি রাষ্ট্র কি তখনও ব্যর্থ হবে। আর তখন হামলা পাল্টা হামলার পরে এ রাষ্ট্র কি আর বসবাস উপযোগী থাকবে?
আর যদি সত্যিই তারা নাস্তিক হয়েও থাকে এ রাষ্ট্র কি যে কাউকেই তাদের হত্যার অধিকার দিয়েছে? সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে এমনকি সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে বিচার পাওয়ার আশ্বাসও দিয়েছে। অথচ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কোন রকম সুযোগ না দিয়ে আইনের আশ্রয় নিতে না দিয়ে খুন করা হচ্ছে। রাষ্ট্র ব্যর্থ হচ্ছে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে। এটা কি গ্রহণযোগ্য?

আমাদের দেশে এই মুহূর্তে যদি কোন সঙ্কট থেকে থাকে তা সুশাসন প্রতিষ্ঠার। আর এই সঙ্কটটি কাটিয়ে উঠতে হলে শুধুমাত্র ঝুলে থাকা পুরাতন মামলার নিষ্পত্তিই জরুরী নয় একই সাথে চলমান ঘটনা সমূহের সুবিচার নিশ্চিত করাও সমান জরুরী। বিশেষ করে ক্ষমতাধরদের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ অনেক বেশি জরুরী। তাতে করে যারা ক্ষমতাধরদের ছত্রছায়ায় থেকে অপরাধ করে তারাও নিবৃত্ত হবে।
বিচারের আওতায় আনা জরুরী সকল উগ্র মতাবলম্বীদের। ধর্ম এতে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না বরং ধর্মই সর্বদা উগ্র মতাবলম্বীদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়।

আওয়ামী সরকারের অর্থনৈতিক সফলতা, রাজনৈতিক সফলতা যেমন বিশ্ব দেখছে তেমন সুশাসন প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতাও দেখছে। বরং সকল সফলতা ছাপিয়ে ক্রমশঃ এই ব্যর্থতাই প্রকট হয়ে উঠছে। এর থেকে বেড়িয়ে আসাটা দল ও দেশ উভয়ের জন্যই মঙ্গল। সবশেষে বলব, এমপি লিটনকে গ্রেফতারের জন্য সবুজ সঙ্কেত না পাওয়াটা লিটনের জন্য হয়ত সস্তির কিন্তু দেশের জন্য এমনকি আওয়ামী লিগের জন্য বরং অশনি সংকেত। বিষয়টা তারা উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেই ভাল।

kmgmehadi@gmail.com