ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

c2029270394bc8443c1224ff0f29010c_xlargeভাববাদী তত্ত্ব অনুসারে জীবন জীব কোষের কোন গুণ বা ধর্ম নয়। পরমাত্মা থেকে আসা একটি অলৌকিক ও অবস্তুগত শক্তি, কিন্তু প্রকৃতিবাদী তত্ত্ব অনুসারে চেতনা বা মন পরমাত্মা থেকে আসা কোন অলৌকিক ও অবস্তুগত শক্তি নয়; বরং মস্তিষ্ক কোষ থেকে আসা বস্তুগত একটি গুণ বা ধর্ম বিশেষ। তাই মস্তিষ্ক বিলীন হবার সাথে সাথেই মন বা চেতনার চির অবসান ঘটে। অন্যদিকে ভাববাদী তত্ত্ব অনুসারে মস্তিষ্ক কোষের অবসান হবার সাথে সাথে মন বা চেতনার চির অবসান ঘটে না,স্থানান্তরিত হয় মাত্র।

ভাববাদী তত্ত্ব অনুসারে মানুষের দেহের মধ্যে আত্মা নামক অবস্তুগত একটি অবিনাশী অস্তিত্ব আছে। মানুষের দেহের অবসানের পরেও আত্মার অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকে। অন্যদিকে প্রকৃতিবাদী তত্ত্ব অনুসারে মানুষের দেহের অবসানের সাথে সাথে জীবন,মন,চেতনা ইত্যাদির চির অবসান ঘটে। আত্মা বলে অবিনাশী ও চিরন্তন কিছু নেই। কাজেই আত্মার অমরত্বের কোন প্রশ্নই ওঠে না।
আমার প্রশ্ন হল ভ্রূণের হার্ট বিট আগে পাওয়া যায় না আগে মস্তিষ্ক গঠিত হয়? আধুনিক বিজ্ঞান বলছে ভ্রূণের মস্তিষ্ক পরে গঠিত হয়। আগে হার্ট বিট আসে যদি মস্তিষ্ক পরেই গঠিত হয়ে থাকে তাহলে হার্ট বিট কিভাবে পরিচালিত হয়?

সকল জীবের বেলায়ই দেখা যায় কিছু স্বভাব গত বৈশিষ্ট্য। ক্ষুধার অনুভূতি, খাওয়ার উপায়, হাসি, কান্না, রাগ এমনকি পাখির বেলায় উড়তে চেষ্টা করা(জন্মের পর থেকে আলাদা করে রাখলেও) এই যে শিক্ষা এটা তারা কোঁথা থেকে পায়। মস্তিষ্কে কি এসব প্রোগ্রামিং করা থাকে তাহলে সেটা কে করে রাখল। আবার চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে মস্তিষ্ক একদিনে বা হঠাত করেই গঠিত হয় না। খুব ধীরে ধীরে এটা পূর্ণতা লাভ করে। তাহলে সেই মস্তিষ্কই বা কি করে জিবের নিয়ন্ত্রক হতে পারে? এ ক্ষেত্রে প্লেটোর দর্শন স্পষ্ট। আর সেটা হল- আমাদের আত্মা মানুষের মধ্যে দেহ ধারণ করার পূর্বেও অস্তিত্বময় ছিল এবং দেহহীন সে অবস্থাতে সে জ্ঞানপূর্ণও ছিল।” শুধু তাই নয় সক্রেটিস যুক্তিবাদে অনন্য সাধারণ প্রতিভা প্লেটো (৪২৮/৪২৭-৩৪৭ খ্রি:পূ) যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন যে আত্মা অমর ও অবিনশ্বর। দেহের মৃত্যুর সাথে আত্মার মরণশীল দেহ পরিত্যাগ করে অমর জগতে প্রবেশ করে। প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ ও ‘ডায়লগ গুচ্ছ’ যুক্তি-বিন্যাসের এক অপরূপ সৃষ্টি। ডায়লগ ‘ফিডোতে’ তিনি আত্মার ‘অমরত্ব’ ও ‘অবিনশ্বরতা’ প্রমাণ করেছিলেন।

‘ফিডো’ সংলাপটি ভালভাবে পড়লে জানা যায় যে প্লেটোর সময় ‘আত্মা’ যে নশ্বর, এটাই ছিল চলতি বিশ্বাস। সাধারণ মানুষের মনে ধারণা ছিল, মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার আত্মাও শূন্যে মিলিয়ে যায় এবং এই মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আত্মারও হয়তো অবলোপ ঘটে।
তাদের সেই ধারনাকে ভুল প্রমাণ করে প্লেটো বলছেন, “আত্মা ও দেহ যখন পরস্পর সংযুক্ত হয় তখন প্রকৃতির বিধান অনুযায়ী আত্মা শাসক এবং দেহ শাসিতের ভূমিকা গ্রহণ করে। কেননা দুয়ের মধ্যে যে স্বাভাবিকভাবে হুকুম করে এবং শাসন করে তার ভূমিকাই অধিকতর ঐশ্বরিক এবং যে হুকুম শোনে এবং আজ্ঞা মানে তাকে অধিকতর রূপে মানবিক বলে বোধ হবে।

যিনি যতই যুক্তি দিন না কেন কৃতকর্মের বিচারের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতেই হোক আর স্বাধীন চেতনা থেকেই হোক আবহমান কাল ধরেই বস্তুবাদীরা সৃষ্টি মানলেও তার স্রষ্টাকে মেনে নেয়নি। আজোও সেই ধারাবাহিকতাই চলছে। বস্তুবাদীরা সব কিছুর মুল খুঁজতে গিয়ে কেবল বস্তু পর্যন্ত গিয়ে আটকে যান। তার পেছনে আর তারা এক পাও এগোবেন না। যা অনেকটা সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়ার মত।
আপনি যদি বস্তু বা শক্তিকে সৃষ্টির মুল প্রেরণা বলে ধরে নিতে রাজি থাকেন তাহলে সেই শক্তি বা বস্তুর উৎসটাও আপনাকে খুঁজে পেতে হবে। যদি তাতে ব্যর্থ হন। তাহলে সকল শক্তির আধার যে স্রষ্টার অস্তিত্ব তা মেনে নিতে হবে।
বস্তুবাদীরা কেন কখনোই শক্তি বা বস্তুর উৎস খুঁজতে চান না সে উত্তরটি আজো কোন রথী মহারথী দেন নি।

একটু লক্ষ করলে দেখা যায় যেখান থেকে বস্তুবাদীরা শুরু করতে চান বা করেন সেখান থেকে মূলত তাদের মধ্যে আর ভাব বাদীদের মধ্যে তেমন দ্বিমত নেই। দ্বিমতটা হল ভাববাদীরা আরও পেছনে যেতে চান আর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে এর পেছনে এক মহা পরাক্রমশালি শক্তির অস্তিত্ব আছে। অর্থাৎ যে শক্তি সব সৃষ্টির মুলে এবং জাগতিক সব কিছুর নিয়ন্ত্রক।
বস্তুবাদীরা এখানটায় এসে অবাধ্য বালকের মত ঘাড় বাঁকিয়ে বলে, না আমরা এটা সমর্থন করি না।
ভাল কথা; সব সিদ্ধান্তই বা কেন সবাই গ্রহণ করতে যাবে। অবশ্যই প্রত্যেকের কাছে গ্রহণ করা বা না করা উভয় ক্ষেত্রেই যুক্তি থাকবে। কিন্তু এই অবাধ্য বালকদের কাছে আপনি কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যাও পাবেন না।
বস্তুবাদীদের কাছে শুরুটা বস্তু দিয়ে। আরে ভাই বস্তু/শক্তিটা কোথা থেকে এলো? কখন থেকে বিশ্ব জগতের সুনির্দিষ্ট নিয়ম এর যাত্রা শুরু হল। কিংবা আমরা এখন যেমন জানি সূর্য থেকে পৃথিবীর বর্তমান দূরত্বই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রেখেছে। সেই দূরত্ব কি করে নির্ধারিত হল এর কোন সঠিক ব্যাখ্যা বস্তুবাদীরা দিতে পারেন না।
তারা প্রকৃতি মানেন প্রকৃতির নিয়ম মানেন কিন্তু এর নিয়ন্ত্রক মানেন না। কেন মানেন না সেই উত্তরটি সম্ভবত তারা জানেন কিন্তু প্রকাশ্যে বলেন না।
মানুষ কেবল মাত্র বস্তুর আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে। বস্তুকে ব্যবহার উপযোগী করতে পারে। কিন্তু আজ অবধি কোন মৌলিক বস্তু সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়নি। এমনকি তারা এটাও প্রমাণে সক্ষম হন নি। যে নতুন করে কোন মৌলিক পদার্থের উদ্ভব হয়েছে। যা এর আগে পৃথিবীতে ছিল না। প্রশ্ন হল পৃথিবীতে যতগুলি মৌলিক পদার্থ রয়েছে তা কেন একবারেই সৃষ্টি হল। কেন আরেকটি নতুন সৌর জগত এমনি এমনিই সৃষ্টি হচ্ছে না। কেন এই সৌর জগতে নতুন পদার্থের অবির্ভাব হচ্ছে না।

এমনি এমনিই যদি সৃষ্টি হবে তা কেন একবারই হল। এমন হাজারটা প্রশ্ন রয়েছে যা স্রষ্টার অস্তিত্বকেই প্রমাণ করে। কিন্তু এর বিপরীতে তাদের কাছে এমন কোন প্রমাণ নেই যা স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে।
অনেকে বলেন না দেখে বিশ্বাস মূর্খতা। আমি যদি তাদের কাছে তাদেরকেই দেখতে চাই? তারা কি আত্মাকে দেখাতে পারবেন?
এ ক্ষেত্রেও তাদের ব্যাখ্যা আজগুবি আর তা হল আত্মা বলতে কিছু নেই। মস্তিষ্কই দেহের নিয়ন্ত্রক। সম্ভবত এই তত্ত্বের পেছনেও রয়েছে সচেতন এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা। কেননা আত্মাকে মেনে নেয়া তোঁ পরমাত্মাকে মেনে নেয়ারই শামিল।
ভাববাদীরা বলছেন যে দেহ আমরা বয়ে বেড়াই তা তো আর আমি নই। এ আমাদের এক খোলস মাত্র। মৃত্যুর পরে যাকে আমরা বলি মৃত দেহ। জীবিত অবস্থায় সেই দেহের মধ্যে যে আমি বাস করি। সেই আমিটাই আত্মা।
এখন আই আমিটাকে ভাববাদীরা বলছে আত্মা আর বস্তুবাদীরা বলছেন মস্তিষ্ক। আসলেই কি সেটা প্লেটোর দর্শনের কাছেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আমরা শুধু বলতে পারি যে আমি আমার আমিকেই(আত্মা) কখনো দেখতে পেলাম না। সেই আমি তাহলে আমার স্রষ্টাকে কি করে দেখব?
এখন এই দেখতে পেলাম না, ছুঁতে পারলাম না বা অনুভূত হল না এটাকেই যদি অস্বীকার করার একমাত্র ব্যাখ্যা ধরা হয় তাহলে সেটা যৌক্তিক হতে পারে না।

মানুষ ঠিক ততটাই বোঝার ক্ষমতা রাখে যতটা গভীরে সে পৌঁছুতে সক্ষম হয়েছে। যা সে দেখেনি যা শোনেনি কিংবা যা সম্পর্কে তার কোন ধারনাই নেই সে তা সম্পর্কে সে কোন ছবি আঁকতে পারে না। না স্বপ্নে না বাস্তবে। এটা মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। এই একটি মাত্র কারণেই গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে এলিয়েনের খোঁজে ছুটে বেড়ানো মানূষ আজ অবধি মানুষের অবয়বের বাইরে গিয়ে এলিয়েনের অবয়ব আঁকতে পারেনি।
মানুষের এই দুর্বলতার কারণেই তারা তার স্রষ্টাকে নিজেদের কাতারেই নামিয়ে আনে। নিজেদের মত করেই ভাবে স্রষ্টার অবয়ব। আঁকার চেষ্টা করে তাকে। কেউ তার সন্তান আছে মনে করে। কেউ তার অংশীদার তৈরি করে। কেউ তাকে কারো সন্তান বলে মনে করে অর্থাৎ আমরা আমাদের দিকে তাকিয়েই তার অবয়ব কল্পনা করি।

এ সবই সৃষ্টির দুর্বলতা। সৃষ্টি কখনোই তার স্রষ্টা সম্পর্কে সম্যক ধারনা লাভে সক্ষম হতে পারে না। আপনি একটি রোবট তৈরি করে তাকে যতটা কর্মদক্ষতা দান করবেন সে ততটাই দক্ষ হবে। যে প্রোগ্রামিং করে দিবেন সে সেই অনুযায়ী কাজ করবে। যদি তাকে চিন্তা শক্তি দিতে সক্ষম হন আর সর্বদা তার অগোচরেই থাকেন সে আপনাকে তার নিজের মত করেই ভাববে। অথচ আপনি তার মত নন।

সব শেষে এটাই বলব সৃষ্টিই স্রষ্টার অস্তিত্বের সবথেকে বড় প্রমাণ। সৃষ্টি তা বুঝতে অক্ষম হতে পারে কিংবা অহংবোধে অস্বীকার করতে পারে তাতে স্রষ্টার মহত্ব এতটুকু কমে না। স্রষ্টা মহান তিনি অবিনশ্বর। তিনি এক এবং অদ্বিতীয়।

kmgmehadi@gmai.com