ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

চেতনা যদি বুকের মধ্যে লালনের সহিত কর্মের সঠিক সংযোগ ঘটায় তাহলেই তা কেবল প্রকৃত সুফল বয়ে আনে। যদি বুকের মধ্যে সযত্নে লালিত সে চেতনা বহিরাংগনে একেবারেও অপ্রকাশিত থাকে তাতেও তেমন সমস্যা দেখি না।
তবে সেই চেতনা যদি বুকের মধ্যে এতটুকু স্থান না পাইয়া শুধু দেখানোর মধ্যেই স্থিত হইয়া পড়ে। তাহলে বোধ করি চেতনার আসল মৃত্যু ঘটে।

হোক তা ভাষা দিবসের চেতনা অথবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। চেতনাকে অন্তরে ধারণ করিয়া সে মতে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ করা হইতেছে কিনা তাহাই লক্ষ করার বিষয়। এখন তো চেতনাকে স্বার্থসিদ্ধির উপায় বানানোর চেষ্টাও দেখা যাইতেছে। মুখে চেতনা, কর্মে উল্টো। এমন চেতনা বাজের তো অভাব দেখিতেছি না। ভয়টা সেখানেই।

ভাষা দিবসে শহীদ বেদীতে উপস্থিত হইয়া ‘জিন্দাবাদ’ বলাটাও এক চেতনা। তবে তাতে কতটা বাংলা প্রীতি কতটা উর্দু প্রীতি বিদ্যমান তা আলোচনার দাবী রাখে।

 

7441037062_4f39f4d60c_b

 

আমাদের অনেক চেতনা রহিয়াছে। পহেলা বৈশাখে বাঙ্গালী চেতনা। একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষার চেতনা। ষোল ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। সমস্যা হইল এই সকল চেতনাই বিশেষ দিনগুলিকে উপলক্ষ করিয়া। এমন কি পহেলা বৈশাখে যে ললনারা লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরিধান করিয়া বিশুদ্ধ বাঙ্গালী সাজেন। তাঁহারাই আবার গৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়া সালোয়ার কামিজে ঢুকিয়া যান।

যাহারা সকাল বেলায় পান্তা ইলিশ আর কাচা লঙ্কা ছারা প্রাতরাশ সারা একেবারেই অনৈতিক বলিয়া ভাবিয়া লন। তাঁহারাই বেলা বারোটার পর ফাস্ট ফুডের দোকানে গিয়া বসিয়া পড়েন। পাঠক ভুল বুঝিবেন না। সালোয়ার কামিজ বা ফাস্ট ফুড কোনটাতেই আমার এলার্জী নাই। বিষয়টা হল চেতনার লালন নাকি সর্বনাশ? তাহাই আমার আলোচ্য।

আমার একটা বাতিক আছে পুড়নো বইয়ের দোকান থেকে বই কেনা। সুযোগ পাইলে পুড়নো কাগজ ক্রেতার ঝুড়িটাও খুঁজিয়া দেখি; কোন মহামূল্যবান বই পাওয়া যায় কিনা। এতে অবশ্য দুই দিকে লাভ। একদিকে অপ্রচলিত বই পাওয়া যায় অন্যদিকে অনেকটা পয়সার সাশ্রয় হয়। আর এই করতে গিয়ে আমার যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হইয়াছে তাহা হইল। অনেকেই বই কিনিয়া বাসায় সাজাইয়া রাখেন এবং উপহার দেন সত্য। তবে তাহা খুলিয়া দেখিবার মানুষের বড়ই অভাব। যা ঐ সব বই খুলিলেই চোখে পড়ে।

তাহলে কি আমি বইমেলার পক্ষে নই? কস্মিনকালেও তা ভাবিবেন না। আমি শুধু অনুরোধ করি, যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করুণ বই পড়ার। বই শুধু সাজাইয়া রাখিবার বস্তু নহে। আর বইমেলাও কেবলই ঘুরতে যাওয়া বা অবকাশ কাটানোর স্থান নহে। বই কিনুন বই পড়ুন। বন্ধু বান্ধবকে বই পড়ায় উৎসাহিত করুণ।

একুশে ফেব্রুয়ারি কেন আট ফাল্গুন হইল না তাহা উদঘাটন করা আমার মত ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের মানুষের কম্ম নহে। আমি সে ভার বহন করিতেও প্রস্তুত নই। তবে মণের মত এটা একটা যন্ত্রণা কাটার মত সর্বদাই বেঁধে। তথাপিও সান্ত্বনা, মহান সে আত্মত্যাগটি অন্তত ফাল্গুনেরই আরেকটি দিনে স্থান করিয়া লইয়াছে।

একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা লইয়া আমরা কাঁদিয়া কাটিয়া অস্থির হই। এমনকি বাংলিশ(!) ভাষায় তাহা প্রকাশ করিয়াও আত্মতুষ্টি লাভ করিয়া থাকি। যদিও ইংরেজি ছারা যাতে ওঠা যায় এটা বিশ্বাস করার কোন কারণই খুঁজিয়া পাই না। ইদানীং তো দেখিতেছি কাগজ বাদ দিয়ে আমার দুঃখিনী বর্নমালা পোষাকে স্থান করিয়া লইয়াছে। তাহাতে তাহার দুঃখ কতটা ঘুচিবে তা বিধাতাই ভাল জানিবেন। বাঙ্গালীকে যে কোনদিন ভাষা বিকৃতি রোধের দাবীতে মানব বন্ধন করিতে হইবে তাহা কি সালাম-রফিক-জব্বার দুঃস্বপ্নেও ভাবিয়াছিল?

মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। এটা নাকি একদল আরেক দলের কাছ থেকে ছিনতাই করিয়া লইয়াছে। হায় আল্লাহ ইহাও এই জাতিকে শুনিতে হয়!

চেতনা আপনার মনের মধ্যে প্রথিত হইয়া থাকিবে। চেতনার প্রকাশ ঘটিবে আপনার কর্মে কথায়। উহা ছিনতাই করিয়া লইবার অবকাশ কোথায়? আপনি বরং বিপক্ষ দলের চাইতেও শক্ত চেতনাধারি হোন। তাহাতে এ দেশের মানুষ আনন্দিতই হইবে কষ্ট পাইবে না। সে যাহাই হোক রাজনীতি রাজাদের কম্ম উহার মধ্যে আমাদের নাক গলানোটাই অনধিকার চর্চা। আমরা বরঞ্চ সাধারণদের লইয়াই থাকি। লাল সবুজের পোশাক পড়িয়া আজকাল আমরা যে চেতনার প্রমাণ দেখানোর চেষ্টা করিতেছি। তাহা হয়ত দোষের নহে তবে তা যদি হয় শুধুই দেখানোর জন্য তবেই বিপদ।

ইদানীং আমাদের উদযাপনের ঘটা আর ব্যবহারিক জীবনের উল্টোরথে চলা দেখিয়া চেতনার চরম সর্বনাশ হইতেছে বলিয়াই প্রতীতি জন্মাইতেছে। কেননা আগামী প্রজন্ম ইহাই শিখিবে যে চেতনা আসলে উদযাপনের উপলক্ষ মাত্র। আর সেই সাথে ইহার যদি কোন সংযোগ থাকিয়াই থাকে তবে তা কেবলই ব্যবসায়িক! পূর্বসূরিরা উত্তরসূরিদের কোন পথে লইয়া চলিয়াছেন তাহা কি একটিবারও ভাবিয়া দেখিয়াছেন?

kmgmehadi@gmail.com