ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

বোঝা যাচ্ছে দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি কিংবা সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেয়েও অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পরেছে মহানগরীর আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরিয়ে ফেলা। যে কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবাসিক এলাকা থেকে সরে যেতে ছয় মাস সময় বেঁধে দিয়েছে সরকার। এই সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলো সরে না গেলে তাদের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন কেটে দেওয়া হবে। বাতিল করা হবে তাদের ট্রেড লাইসেন্স।

সরকার যে এটা বাস্তবায়নে কতটা মরিয়া তা আমরা ইতিমধ্যেই হারে হারে টের পেয়েছি। অতএব বোঝাই যাচ্ছে সরকার এক্ষেত্রেও আপসহীন ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। এটা স্পষ্ট যে ক্রমশই জনগণ সরকারের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে।

এখন কথা হল যে কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রশ্ন মুল প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে। যেমন: কি, কখন এবং কেন? প্রথম দুটি প্রশ্নের উত্তর সরকার বাহাদুর ইতিমধ্যেই দিয়েছেন। বাকি রইল তৃতীয় প্রশ্নটির উত্তর। আর সেটা হল কেন এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ? উত্তরটি আসবে আবাসিকের চরিত্র ফিরিয়ে আনা। আড়ালে আবাসিক এলাকায় অবস্থিত বাণিজ্যিক ভবনগুলোকে সুবিধা পাইয়ে দেয়া।

fly_28183

সরকার বাণিজ্যিক ভবনকে সহায়তা করবে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় এটাই স্বাভাবিক কিন্তু তাই বলে যে ছোট ছোট এন্টারপ্রেনারদের ত্রাহি অবস্থার সৃষ্টি হবে তার কি হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে আশি ভাগ ছোট এন্টারপ্রেনারের পক্ষে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পরবে। কারণ তাদের পক্ষে একদিকে যেমন ব্যবসা বাঁচাতে এলাকা পরিবর্তন অসম্ভব তেমনি অন্যদিকে বাণিজ্যিক ভবন সমূহের নির্ধারিত ভাড়ায় অফিস পরিচালনাও সম্ভব নয়। কাজেই সরকার যদি তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে তাহলে অনেক এন্টারপ্রেনার বাধ্য হবেন তাদের ব্যবসার পরিধি ছোট করে ফেলতে অথবা বন্ধ করে দিতে। যার ফলে দেশের কর্মচঞ্চল মানুষের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বেকার হয়ে পরবে। দেখা দেবে সামাজিক অস্থিরতা। সরকার নিশ্চয়ই সেটা চায়না।

আমরা সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে স্বাগত জানাই। ঢাকাকে একটি সুস্থ আবাসিক শহরের রূপদানের প্রচেষ্টাকেও সাধুবাদ জানাই কিন্তু সেটা নিশ্চয়ই আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নয়। গতকাল চট্টগ্রামের বাঁশ খালীর গণ্ডমারায় এস আলম গ্রুপের কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পক্ষে-বিপক্ষে দুই গ্রুপের উত্তেজনাকে ঘিরে পুলিশ-আনসার ও গ্রামবাসীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় পুলিশ, আনসার, গ্রামবাসী মিলে ৩০ জন আহত হন। এ দায় কি সরকার এড়াতে পারে?

সাধারণ মানুষ নিশ্চয়ই বিদ্যুৎবিহীন অন্ধকারে থাকতে চান না তাহলে কেন এই ঘটনা ঘটল? আগে থেকে ঐ এলাকার মানুষের সাথে কি আলোচনা করে নেয়া হয়েছিল? সাধারণ মানুষকে তাদের লাভ-লোকসানের বিষয়টি কি বোঝানো হয়েছিল। তাদের সঠিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল? আমরা একটা কারণই বুঝি তা হল প্রতিক্রিয়াশীলদের ষড়যন্ত্র। সেটা হয়তো অমূলক নয় কিন্তু সেক্ষেত্রে তো সাধারণ মানুষকে সঠিক তথ্য প্রদান এবং তাদের সহযোগিতা গ্রহণ আরও জরুরী।

বাস্তুচ্যুত যিনি হন তিনিই বোঝেন তার যন্ত্রণা। সে যন্ত্রণা লাঘবে এস আলম গ্রুপ এবং সরকার কি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সেটাও বিবেচনার বিষয়। পূর্বাপর দৃষ্টান্তগুলি যা স্পষ্ট করে তোলে তা হলো সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোর সাথে জনগণের সম্পৃক্ততার দারুণ অভাব। এমন কি বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রেও দেখা যায় সাধারণ মানুষের সুযোগ-সুবিধাকে একেবারেই আমলে না নেয়ার প্রবণতা। ঢাকায় ফ্লাইওভারগুলো তৈরির ক্ষেত্রে যা দৃষ্টিকটু ভাবে চোখে পড়ছে। মোদ্দা কথা উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সাথে সাথে এক ধরনের আগ্রাসী মনোভাবও স্পষ্টতই চোখে পড়ে। আওয়ামীলীগ সরকারের কাছে যা এ দেশে তাদের বিরোধী মনোভাবাপন্নরাও আশা করে না। সরকারের এটাও মনে রাখা উচিৎ এই আগ্রাসী মনোভাবই আগামীতে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। যা মোটেও কাম্য নয়।

kmgmehadi@gmail.com