ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

কিরণ মালায় যে স্পেশাল এফেক্টগুলি দেখানো হয় তা খুবই নিন্ম মানের তারপরেও সিরিয়ালটির প্রতি এত বেশি মানুষের আসক্তি কেন? হতে পারে আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের পৌরাণিক কাহিনীর প্রতি একটি আলাদা ফেসিনেশন আছে। এর আগে যখন আমাদের চ্যানেলগুলিতে সিন্দবাদ দেখানো হত তখনো মানুষ এভাবেই মগ্ন হয়ে সে সিরিয়াল দেখত। এখন সেই স্থানটিই দখল করে নিয়েছে “কিরণমালার” মত একটি নিন্মমানের সিরিয়াল। অথচ এই সিরিয়ালটিই কিনা আমাদের রাতের ঘুম হারাম করতে বসেছে!

এই কিরণমালাই যদি বাংলাদেশী কোন চ্যানেলের সিরিয়াল হত সে ক্ষেত্রে আমরা কি করতাম? যদি সেই সিরিয়াল দেখতে গিয়ে আগুনে পুড়ে রাধানগরের যে ১৬টি পরিবার নিঃস্ব হ্ত বা সাতক্ষীরার শ্যামনগরে দুটি শিশুর পানিতে ডুবে মর্মান্তিক মৃত্যু হত? সেই সিরিয়ালের কারনে কুষ্টিয়ার খোকসায় সাত বছরের মেয়ে ঋতুর তালাবন্ধ ঘরের ভেতরে পুড়ে অঙ্গার হওয়াকেই আমরা কি বলতাম? কার দোষ দিতাম? এখানে কিরণ মালা সমস্যা নাকি অভিভাবকদের দায়িত্ব হীনতা? সেটাই বড় প্রশ্ন।

kiran

ভারতীয় বাংলা সিরিয়ালের ক্ষেত্রে কিরণমালার থেকেও অনেক ভয়াবহ সমস্যা তৈরি করছে বিভিন্ন সিরিয়ালে পারিবারিক দ্বন্দ্ব সংঘাতের চিত্র। স্টার জলসা, জি বাংলায় প্রচারিত সিরিয়াল গুলিতে যে ভাবে সংসারের ঝগড়াঝাঁটি, কোটনামি, স্বার্থের দ্বন্দ্ব, পরকীয়া প্রেমকে চিত্রায়িত করা হয় তাতে পারিবারিক বন্ধনটাই ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এরা দেখাচ্ছে, স্ত্রী স্বামীকে দেখছে সন্দেহের চোখে, স্বামী-স্ত্রীকে। ভাই ভাইয়ের শত্রু, ভাই -বোন মিলে অন্য সহোদরদের বিপদে ফেলছে। যেন পরিবারটাই সবথেকে বড় যুদ্ধ ক্ষেত্র। তার থেকে অনেক বেশী বিশ্বস্ত বাইরের মানুষ!

জি বাংলায় প্রচারিত দ্বিপ জ্বেলে যাই সিরিয়ালে বাবা এবং ছেলের মাঝে যে সম্পর্কটি দেখায় সেটা এক কথায় অবিশ্বাস্য! ছেলেকে এবং ছেলের বউকে হেনস্থা করতে এহেন উপায় নেই বাবা যা অবলম্বন করছে না। সেখানে পরিবারটিকে দুটি ভাগে বিভক্ত দেখান হচ্ছে। অনেকটা কর্পোরেট রাজনীতিকে পারিবারিক করে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে সিরিয়ালটিতে। একদল নিত্য সংগ্রাম করছে বেচে থাকার আরেক দল বাইরের শক্তির সাথে হাত মিলিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের একের পর এক বিপদে ফেলছে।

এখানে নেই কোন আদর্শ, নেই ভক্তি-ভালবাসা। এখানে কেবলই সন্দেহ কেবলই কোটনামি আর প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা। সিরিয়ালটিতে দেখান হচ্ছে একটি অনৈতিক সম্পর্ককে অবলম্বন করে বাইরের একটি মেয়েকে ঘরে এনে ঘরের বউকে বের করে দেয়া। তাও আবার পারিবারিক ভাবেই।

স্টার জলসার ‘পটল কুমার গান ওয়ালা’ নামের একটি সিরিয়ালে দেখানো হচ্ছে মাত্র ছয় বছরের একটি বাচ্চা মেয়ে ‘ভিলেন’! সেখানে তার কথা বলা, তাকানো, এক্সপ্রেশন— সব কিছুতেই ‘ভিলেন’ এলিমেন্ট স্পষ্ট। যেখানে সে হিংসায় অন্য একটি বাচ্চার (পটলের) জামা পর্যন্ত পুড়িয়ে দিচ্ছে! সিরিয়ালটা মূলত পটল নামের একটি বাচ্চাকে কেন্দ্র করে। স্বাভাবিকভাবেই অনেক বাচ্চাও ঐ সিরিয়ালটা দেখে। নিশ্চয়ই তারা প্রভাবিত হচ্ছে। যেখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি এই সিরিয়ালগুলির সামাজিক ভাল্গারিজম বড়দের উপর ভয়ংকর প্রভাব ফেলছে সেখানে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব কতটা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরেও যারা এই সিরিয়ালগুলি তৈরি করছেন, প্রচার করছেন এবং প্রচারের অনুমতি দিচ্ছেন তাদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

যেহেতু বিষয়টা ভিন্ন দেশের সেহেতু এই ধরনের সিরিয়াল তৈরি এবং প্রচারের ক্ষেত্রে আমাদের কিছু করনীয় নেই এটা ঠিক। কিন্তু আমরা এই চ্যানেলগুলির এক্সেস তো এ দেশে বন্ধ করে দিতে পারি। আমরা সেটা করছি না। এ তো গেল সরকারের ব্যর্থতা।

আমাদের দেশের নির্মাতারা কি করছেন? আমরা কেন পারছি না আমাদের পারিবারিক, সামাজিক মূল্যবোধ বজায় রেখে এমন সিরিয়াল তৈরি করতে, যা মানুষ হাঁ করে দেখবে। যারা বলছেন বাজেটের কথা, তারা কিরণমালার দিকে তাকান। সেখানে এমন কোন আহামরি সেট নির্মাণ করা হয়নি। সেখানে বলার মত একটি স্পেশাল এফেক্টও কেউ দেখাতে পারবেন না।

ভারতীয় সিরিয়ালগুলির নির্মাতারা মূলত দুটি জিনিষ বেঁছে নেন। এক, পৌরাণিক কাহিনী। যেমন ঠাকুর মার ঝুলি থেকে নেয়া ‘কিরণ মালা’। দুই, পরিবার কেন্দ্রিক জীবন ঘনিষ্ঠ গল্প। যেমন- দ্বিপ জ্বেলে যাই। যেটা মূলত পারিবারিক স্বার্থ, মতপার্থক্য নির্ভর। সমস্যা হল এই একই বিষয়কে তারা পারিবারিক মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ণ রেখে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে চিত্রায়িত করতে পারতেন। কিন্তু করেন নি। সেটা কেন করছেন না তা অন্য বিষয়। তবে এর নির্মাতারা একটি সিরিয়ালের আকর্ষণ ধরে রেখে যেভাবে একে শতাধিক পর্ব পর্যন্ত টেনে নিয়ে যান, সেটা সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে।

আমাদের দেশে এখন যে মানের নাটক, ধারাবাহিক নাটক তৈরি হয় তা না করে যদি আশির দশকের ধারাবাহিক নাটকগুলিও পুনর্নির্মাণ করা হত তাহলেও তা অনেক বেশী জনপ্রিয় হতে পারত। আমরা একদিকে বলছি ভারতীয় বাংলা সিরিয়াল আমাদের সামাজিক সমস্যা তৈরি করছে অন্যদিকে এর বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্থা করতে পারছি না। এটা সমস্যা সমাধানের কোন পথ হতে পারে না।

একবার ভাবুন তো বর্তমান সামাজিক অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে মানুষের হাতে বিকল্প কি বিনোদনটা আছে? আমাদের টিভি চ্যানেলগুলি এক সংবাদকে ঘেঁটে ঘুটে গলাধঃকরণ করানো ছাড়া আর কি শিখেছে? সংবাদের নারী দর্শক কত ভাগ? শিশুরা সংবাদের কি বোঝে? এসব প্রশ্ন তাদের মাথায় কি ঢোকে?

প্রতি ঘণ্টায় সংবাদ, চব্বিশ ঘণ্টা সংবাদ, সংবাদ বিশ্লেষণ, টক শো। এর বাইরে যে আরও কিছু থাকতে পারে এটা যেন তাদের মাথায়ই আসে না। কেন শাইখ সিরাজের কৃষিভিত্তিক অনুষ্ঠান কি মানুষ দেখে না? যারা এই টক শো গুলোর আয়োজন করেন তারা কি তাদের টেবিলটাকে নিয়ে হাটে মাঠে ঘাটে বসাতে পারেন না? অর্থাৎ সাধারন মানুষের কাছে গিয়ে সাধারণ মানুষকে নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারেন না? এটা তো যে কোন বিষয়ে জনমত গঠনেও অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যেমনটি করছে বিবিসি বাংলা।

তা ছাড়াও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে করা অনুষ্ঠান যে কতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ জি বাংলার দাদাগীরি, দিদি নং ওয়ান বা মিরাক্কেল, হ্যাপি প্যারেন্টস ডে। সমস্যা হল এ সব অনুষ্ঠান আয়োজনে প্রয়োজন নিরবিচ্ছিন্ন গবেষনা। আমরা যার ধার ধারি না।
আমরা এতটাই অথর্ব যে, মিরাক্কেলে দুই বাংলা দাপিয়ে আসা বীজিতদের দিয়েও আমরা দুই একটি নাটকে অভিনয় করান ছাড়া আর কিছু করতে পারি নি।

আমাদের যে নাটকগুলি হয় তার মধ্যে মোশাররফ করিমের কমেডি ছাড়া বলার মত একটি কমেডি নাটকও পাওয়া যায় না আর সে গুলিও তো এক পর্ব বা অল্প কয়েক পর্বের। এর বাইরে নাটকে প্রেম ছাড়া অন্য কিছু তো আমাদের মাথায় ঢোকেই না। এ অবস্থায় যতই বলি ভারতীয় চ্যানেল প্রচার বন্ধ করুন সেটা কোন গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়।

আমাদের নির্মাতাদের টার্গেট দর্শক থাকতে হবে, সে অনুযায়ী আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান বানাতে হবে। শিশুদের জন্য আলাদা চ্যানেল হোক, খেলার জন্য আলাদা চ্যানেল হোক, সিনেমার জন্য আলাদা চ্যানেল করা হোক, লাইফ স্টাইল ভিত্তিক, নারী দর্শকদের টার্গেট করে অনুষ্ঠান নির্মাণ করা হোক, সংবাদ চ্যানেলের বোঝা কমানো হোক। এ ছাড়া মান সম্পন্ন পারিবারিক উপজীব্য গল্প নির্বাচন করে দর্শক ধরে রাখার মত সিরিয়াল তৈরি করা হোক। এমনিতেই ভারতীয় চ্যানেলে প্রচারিত নাটকের প্রতি এ দেশের দর্শকদের আগ্রহ কমে যাবে।

আমাদের দেশে নিঃসন্দেহে ট্যালেন্ট আছে, সমস্যা হচ্ছে উদ্যোগে। তারপরেও সংশ্লিষ্টরা যদি মনে করেন এমন গল্প লেখক এ দেশে নেই, কিংবা এমন চিত্রনাট্য তৈরি করার মত মেধার এদেশে অভাব আছে তাহলে তারা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করুক।

এ দেশে যখন প্রথম প্যাকেজ নাটকের আহবান করা হল তখন আমরা অনেক গুলি ভাল কাজ পেয়েছিলাম। আবারও তেমন চেষ্টা করা হোক। সবার আগে তো সিদ্ধান্ত নিতে হবে সিদ্ধান্ত নিন সমাধান কঠিন কিছু নয়।

kmgmehadi@gmail.com