ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 
karagar_3927_0

অনেকদিন আগে বলেছিলাম মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের আদলে জঙ্গি আসক্ত নিরাময় কেন্দ্র করা প্রয়োজন। কথাটা শুনে কেউ হেসেছে কেউ কেউ আবার সমর্থনও জুগিয়েছে। আজ আবার বলছি এটা সময়ের প্রয়োজন।

ইসলাম দাওয়াতের ধর্ম। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত এবং বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারিত হয়েছে দাওয়াতের মাধ্যমে। ইসলামের দাওয়াত দেয়া উম্মতি মোহাম্মদীর উপর অর্পিত দায়িত্ব। আর সে কারণেই অন্যান্য সকল উম্মতের থেকে শ্রেষ্ঠত্ব উম্মতে মোহাম্মদীর। প্রশ্ন হল সে দাওয়াতটা কিভাবে দেয়া হবে?

মহানবী(সঃ) এর পরে তার সাহাবাগন, তাবেঈন গন, তাঁবে তাবেঈন গন যাদেরকে আল্লাহর নবী রসূল(সঃ) নিজ মুখে ইসলামের স্বর্ণযুগের মানুষ বলেছেন। তারা কিভাবে ইসলাম প্রচার করেছেন ইতিহাস সে সাক্ষ্য দেয়। তাঁবে তাবেঈন গনের পরে ইসলামের দাওয়াতে নিযুক্ত হয়েছেন অসংখ্য পীর, অলি আউলিয়া, গাউস কুতুব মূলত তাদের হাত ধরেই এতদঅঞ্চলে ইসলামের প্রসার ঘটে।

আমরা যদি ইসলামের এই সব মহান খেদমত দারদের জীবনী পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাই তারা অত্যন্ত সাদাসিধে সহজ সরল জীবন যাপন করতেন। তাঁদের আর্থিক অবস্থা মোটেই ভালো ছিল না। অনেক কষ্টে সংসার চালাতেন। অথচ প্রত্যেকে সমস্ত প্রকার লোভ লালসা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখতেন। মুরীদানদের দেয়া টাকা পয়সাও নিজেরা ভোগ করতেন না অসহায়দের মাঝে বিতরণ করে দিতেন। তাঁদের বেশভূষা ছিল অতি সাধারণ। আদব কায়দার ব্যাপারে সচেতন থাকতেন এবং অন্যদেরকেও সেই নির্দেশ দিতেন। এই সব মহান বুজুর্গ সারা জীবন ইসলামের খেদমত এবং মানব কল্যাণ করে গেছেন। তাদের আদর্শ জীবন যাপনই ছিল ইসলাম প্রচারের প্রধান অস্ত্র।

ইসলাম মানুষকে ভালবাসতে শিখিয়েছে। ইসলাম মানব সেবার নির্দেশ দিয়েছে। আর এই আদর্শ মুসলমানদের হাতে কলমে নিজের জীবনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শিখিয়েছেন মহানবী(সঃ) স্বয়ং।
তেমনি অজস্র ঘটনার একটি যা আমরা কমবেশি অনেকেই জানি।

রসুল(স) যেপথ দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করতেন, সে পথে কাটা বিছিয়ে রাখতো এক বিধর্মী বুড়ি। মহানবী( স) ইসলাম প্রচার করছেন, তাই তাকে অপছন্দ করতো ঐ বুড়ি ।কাটা পায়ে ফুটে যাতে তিনি কষ্ট পান সেটাই ছিল তার উদ্দেশ্য।

প্রতিদিন এভাবে কাটা বিছিয়ে রাখতো সেই বুড়ি এবং মহানবী( স) এর পায়ে ফুটলে তিনি ব্যথা পেতেন, বুড়ি তা দেখে মজা পেত এবং দুর থেকে দেখে হাসত। মহানবী (স) তার পায়ের কাটা খুলে, পথ থেকে দুরে ফেলে দিতেন যাতে তা অন্যের পায়ে না বিধে।এভাবে বেশ কিছুদিন পর হঠাৎ একদিন মহানবী খেয়াল করলেন তার চলার পথে আর কাটা নেই, তিনি অবাক হলেন। খোজ নিয়ে জানতে পারলেন যে সেই বুড়ি অসুস্থ।তখন তিনি তাকে দেখতে গেলেন এবং তার সেবা শশ্রুষা করলেন। মহানবীর এই মহানুভবতা দেখে বুড়ি অবাক হলেন এবং নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইলেন।

মহানবী(সঃ) শুধু মুসলমান নয় কাফেরদেরকেও ক্ষমা করতে শিখিয়েছেন যার উদাহরণ পাই তায়েফের ময়দানে ঘটে যাওয়া ঘটনায়। একবার নবীজি দাওয়াতের কাজে তায়েফের ময়দান দিয়ে যাচ্ছেন,এমন সময় কাফেররা তাদের ছোট ছোট ছেলেদের কে লেলিয়ে দেন ।তারা পাহাড়ের দুই পাশ থেকে নবীজিকে আক্রমণ করলো,দুই পাশ থেকে নবীজিকে পাথর মারতে লাগলো,এমন অবস্থায় নবীজি একবার পড়ে যাচ্ছেন আবার কাফেররা নবীজিকে উঠাচ্ছে আর হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে,এভাবে নবীজি তিনবার বেহুশ হয়ে পড়লেন আবার হুশ এলো। তখন ফেরেশতারা নবিজীর কাছে অনুমতি চাইল ঐ পাহাড় গুলি দিয়েই চাপা দিয়ে কাফের গুলারে শেষ করে দেয়ার।
নবীজি তাদের বললেন, আমি যদি তোমাদের কে হুকুম করি,আর যদি তোমরা কাফেরদের মেরে ফেল, তাহলে আমি কার কাছে পৌঁছবো ইসলামের দাওয়াত। নবীজি দুই হাত উঁচু করে আল্লাহ্‌’র দরবারে দোয়া করলেন, হায় আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন, এই কাফেররা আমাকে চিনতে পারে নি। আমি তোমার নবী ওরা সেটা বুঝতে পারেনাই,না জেনে না বুঝে আমার উপর যে অত্যাচার এরা করেছে,আল্লাহ্‌ তুমি যেন রাগ করে কাফেরদের উপর গজব দিয়ো না। তাদের কে হেদায়েত দান কর।

মহানবীর আরেকটি মহানুভবতার গল্প- মক্কা বিজয়ের দিন মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশ করছেন তাঁর প্রিয় জন্মভূমিতে। সাথে হাজার হাজার সাহাবী, সবাই আনন্দিত। ছেড়ে যাওয়া মক্কা নগরীতে ফিরে আসতে পেরে আনন্দে আত্মহারা মুহাজিরগণ।

মহানবী ঘুরে ঘুরে দেখছেন ফেলে যাওয়া বাড়ি-ঘর, চেনা-অচেনা পথ-ঘাট, হাট-বাজার।চলতে চলতে দেখতে পেলেন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক বুড়ি। হাতের কাছে বুড়ির একটি ভারী বোঝা। বুড়ির কাছে দাঁড়ালেন তিনি।  জিজ্ঞেস করলেন কোথায় যাবেন বুড়ি মা? বলল ঐ পাহাড়ে যাবো বাবা। কিন্তু সে যাবে কেমন করে? বোঝাটা যে কাঁধে উঠাতে পারবেনা। তাই মহানবী বললেন, আপনার বোঝাটা আমি নিচ্ছি। আপনি বুড়ো মানুষ, কি করে টানবেন এতো বড় বোঝা।

নিজ কাঁধে করে মুহাম্মদ (সঃ) বুড়ির বোঝাটা নিয়ে পৌঁছলেন পাহাড়ে। বুড়ি খুশি হয়ে বলল, একটু দাঁড়াও বাবা। এখানে আমার লোকজন রয়েছে। ওদের কাছ থেকে তোমার জন্য কিছু পারিশ্রমিক এনে দিই। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো বুড়ি। সাথে টাকা-পয়সা, ছেলে-মেয়ে নাতি-নাতনি। তারা চিনতে পারলো মহানবীকে।

যে মুহাম্মদকে তারা অত্যাচার করে মাতৃভূমি মক্কা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। যাকে মদিনায় পর্যন্ত ধাওয়া করেছে। যাকে কাবা শরীফে তওয়াফ করার জন্যও আসতে দেয়া হয়নি। সেই মুহাম্মদ কিনা মুটে হয়ে বুড়ির বোঝা এত দূর পথ বয়ে এনেছে। এই অপূর্ব মহানুভবতা দেখে সেদিন বুড়ি তার আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এ মহান ব্যক্তির হাতে বাইয়াত হয়ে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করলো।

ইসলাম তো এই। মহানুভবতা, আদর্শ জীবন যাপন, সততা আর মানব সেবা। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ না করাই ইসলামের আদর্শ। মহানবী সঃ এর শেখানো পথেই হেঁটেছেন তার সাহাবাগন। জেরুজালেম বিজয়ের ক্ষেত্রে হযরত উমরের কাছ থেকেও আমরা তেমনি এক অনন্য দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়,

ভৃত্য চড়িল উটের পৃষ্ঠে উমর ধরিল রশি,
মানুষে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধুলায় নামিল শশী।

এত কথা এত ঘটনা বলার পেছনে কারণ একটাই আর তা হল আজ যারা ইসলামের নামে জঙ্গিবাদকে পৃষ্ট পোষকতা দিচ্ছে যার জঙ্গি হয়ে উঠছে আসলে তারা কি সত্যিকারের ইসলামের স্বাদ পেয়েছে? যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছেন তারা এ পথে হাঁটেন নি। ইসলাম প্রচারক গনকে কখনো কেউ ভয় পেয়েছে এমন একটি উদাহরণও দেখাতে পারবে না। ইসলাম ত্রাস সৃষ্টি করে কোথাও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

কি আশ্চর্য ইসলাম প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব ইসলামিক স্কলাররা নিচ্ছেন না সেই দায়িত্ব নিচ্ছেন কথিত বড় ভাইয়েরা! এটা কি করে সম্ভব হল? এর জন্য কি আজকের বিশ্বের ইসলামিক স্কলাররা দায়ী নন? তারা কি নিজেদের দায় এড়াতে পারেন? আমরা ইসলামের দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে বিধর্মীকে প্রধান লক্ষ ধরে এগোই। অথচ একটি বার চিন্তা করেও দেখি না আমরা যারা মুসলমান বলে দাবী করি। ইসলামের প্রধান পাঁচটি স্তম্ভকে কে কতটা আঁকড়ে ধরে আছি।

ঈমানের পরেই যে নামাজের স্থান। যে নামাজ মসুলমানকে ভিন্নধর্মাবলম্বি থেকে আলাদা করে সেই নামাজই আমরা প্রতিষ্ঠা করছি কি? এরপরে রয়েছে রোজা, হজ্জ, যাকাত। আমরা কি এসব মেনে চলি? আপনি ইসলাম প্রচার করবেন আগে তো নামধারী মুসলমানদের দিকে তাকান। তারপরে না ভিন্নধর্মাবলম্বিকে লক্ষ হিসেবে নির্ধারণ করবেন।

আর তাদেরকে আকৃষ্ট করতে হলে আগে নিজেকে ততটাই আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলন। মহানবী(সঃ) তো সেই শিক্ষাই দিয়েছেন। আজ যারা বেহেশত লাভের উদ্দেশ্যে জঙ্গি তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে তাদেরকে এর থেকে বেড় করে এনে কি করবেন? তাদেরকে যদি এই রোগ থেকে মুক্তই না করেন তো লাভ কি হবে? এ সব জঙ্গিরা নাকি জেল খানায় থাকা অবস্থায় ইমাম হয়ে যান? কোথায় তাদের পরিশুদ্ধ করবেন তা নয় বরং তারা অন্যদেরকেও প্রভাবিত করার সুযোগ পাচ্ছে এটা কি ঠিক হচ্ছে?

জঙ্গিদের জন্য আলাদা সংশোধনাগার করুন, জঙ্গিআসক্তি নিরাময়ে ব্যবস্থা নিন। তাদের প্রকৃত ইসলামি শিক্ষা প্রদান করুন। তাদের পুনর্বাসন করুন এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে রাখুন নয়ত এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান কখনোই হবে না।

kmgmehadi@gmail.com