ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

আপনাকে ফিরতেই হবে। হ্যাঁ ফিরে আসতেই হবে শেকড়ে। যে স্বার্থ রক্ষার্থে যৌথ পরিবার ছেড়ে একক পরিবারের ভিত গড়েছেন। সেই পরিবার আপনাকে আরও বেশি বিচ্ছিন্ন করে তুলেছে। আপনি এখন সম্পূর্ণ একা। আপনার পরিবারের প্রতিটি সদস্য একা। কেউ কাউকে নিয়ে মুহূর্ত মাত্র ভাবে না। কেউ কাউকে একটুকু অনুভব করতে চায় না। যে যার মত থাকতে শিখেছে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া এঁকে অপরের খোঁজটুকু পর্যন্ত রাখে না।

আপনার সন্তান জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে, আপনার সন্তান সমাজ বিরোধী হয়ে গড়ে উঠছে। আপনার সন্তান আপনার শেষ বয়সে আপনাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে ঝামেলা মুক্ত হতে চাইছে। এটাই তোঁ স্বাভাবিক। এটাই তোঁ হওয়ার কথা ছিল।

আপনি তাকে শিখিয়েছেন কি করে শুধুমাত্র নিজেকে নিয়ে ভাবতে হয়। কি করে মা বাবাকে অশ্রদ্ধা করতে হয়। কি করে তাদেরকে একাকী করে দিতে হয়। আজ আপনার সন্তানেরা কেবল আপনার দেয়া শিক্ষাকেই বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। দুঃখ করার কিছু নেই।

একবার ভাবুন তোঁ আপনি নিজে কিভাবে বেড়ে উঠেছেন। কারা আপনাকে একজন সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। শুধু কি আপনার মা-বাবারই অবদান ছিল নাকি নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশীদেরও অবদান ছিল?

একটা সময় ছিল যখন একটা শিশু তার কৈশোরে পদার্পণ করত অনেকগুলি বিশ্বস্ত এবং সদা সতর্ক চোখের সম্মুখে। তাকে বেড়ে উঠতে হত এই চোখগুলির সামনে। যারা অহর্নীষ তাকে পাহারা দিত, আগলে রাখত। কোন ভুল তাকে স্পর্শ করতে গেলে কারো না কারো চোখে পরতেই হত। ফলাফল, একই সাথে শাসন এবং বুঝ দান। ছেলেটা নষ্ট হতে পারত না। সে বখাটে হয়ে উঠত না।

একটা সময় ছিল যখন রাস্তা ঘাটে চলাচলের ক্ষেত্রে কেউ তার মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করত না। তখন সবটা পথ জুড়েই একদিকে যেমন অসৎ লোক ছিল অন্যদিকে তার কয়েকগুণ বেশি ছিল সৎ লোকের চলাচল।

কার মেয়ে সেটা কেউ ভেবে দেখত না প্রথমেই সবাই মেয়েটার নিরাপত্তা বিধানের চেষ্টা করত। যে সামাজিক বলয় তখন ছিল তা আজকের সময়ের আধুনিকতার মশালবাহক স্বার্থান্ধ মানুষগুলোই ভেঙ্গে ফেলেছেন। তাতে করে তারা কি ভাল কিছু অর্জন করেছেন? মোটেই না।

আপনার সন্তান অন্যায় করেছে আপনি তাকে শাসন করতে গেলেন। আপনার স্ত্রী তাকে বাঁচাতে চাইল আপনি তাকেও ধমকে সরিয়ে দিলেন, ছেলেটাকে পেটালেন। কি লাভ হল? তার ভয়টা কেটে গেল। সে মার খেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠল। কি করবেন আপনি?

অথচ এই একই ঘটনার সময়ে যদি আপনার মা উপস্থিত থাকতেন। তাহলে তিনি আপনাকে নিবৃত্ত করতে পারতেন, ছেলেটাও মার খেত না তার মধ্যে ভয়টাও থেকেই যেত। সে বেপরোয়া হয়ে উঠত না। উপরন্তু আপনার দ্বারা আপনার সন্তান শিখত বয়োজ্যেষ্ঠদের কিভাবে সম্মান করতে হয়। আপনার মা আপনার সন্তানকে শেখাতে পারত মূল্যবোধ। শুধরে দিতে পারত তার ভুলগুলো।

আপনি মায়ের প্রতি কর্তব্য তোঁ দূরের কথা, নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করেও মা’কে নিজের কাছে রাখেন নি। ভাই-বোন আপনার কাছে সাহায্য চাইবে সেই ভয়ে তাদের সাথে সম্পর্ক পর্যন্ত রাখেন নি। অথচ অসুস্থ আপনার অসহায় চোখজোড়া কিন্তু রক্তের সম্পর্কের এই মানুষগুলোকেই এক সময় খুঁজে ফিরবে। তখন তাদের পাশে পাবেন তোঁ?

কার জন্য, কিসের জন্য আপনার এই পাষাণ বৃত্তি? কি লাভ এই ছন্নছাড়া জীবন যাপনে? ফিরে যান শেকড়ে। ভালবাসুন কাছের মানুষগুলোকে। এগিয়ে যান সকলের সাহায্যার্থে, ভাল থাকবেন। আমার এক নিকটাত্মীয়া আছেন যাকে আমি মহামানবী বলি। নিঃসন্তান এই মানুষটি প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে দিনের দুই তৃতীয়াংশ সময় হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে আত্মীয় অনাত্মীয় রোগীদের সেবা করে চলেছেন সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ ভাবে। নিজের টাকা খরচ করে এই যে অর্ধ শতাব্দী ধরে মানুষের সেবা করে চলেছেন তার কি কোন বিনিময় নেই? অবশ্যই আছে, তিনি হয়ত খেতাব পান নি। কিন্তু অজস্র মানুষের ভালবাসা পেয়েছেন। এখনো পাচ্ছেন। পরিচিতরা তাকে সাহায্য করতে পেরে ধন্য হন। স্বাবলম্বীরা নিজেদের খরচে তাকে হজ্জ্ব করতে পাঠান। আপনাকে এমন মহামানব হতে হবে না অন্তত মানবিকগুনাবলি সমৃদ্ধ একজন আদর্শ মানুষ তোঁ হন।

নিজে ভালবাসুন, সন্তানকে ভালবাসতে শেখান। একটুখানি নিঃস্বার্থ হওয়ার চেষ্টা করুন। নিজে ভাল থাকবেন, আপনার সন্তান ভাল থাকবে। ভাল থাকবে এ সমাজ।

kmgmehadi@gmail.com