ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

download
চিকিৎসকরা রোগীদের জিম্মি করে ফায়দা লুটছেন বিষয়টা নতুন নয়। নতুন হল তাদের নিত্য নতুন ফন্দি আঁটা। যা রোগীদের নাভিশ্বাস উঠিয়ে ছেড়েছে। রোগীদের জিম্মি দশায় ফেলার সবথেকে নতুন অস্ত্রটা হচ্ছে সাঙ্কেতিক ভাষা ব্যবহার। পূর্বে যেটা ছিল নির্দোষ গাফেলতি মাত্র সেটাই এখন আরেকটি অস্ত্র হয়ে দেখা দিয়েছে।
পূর্বে রোগী বা তাদের আত্মীয়স্বজন না পড়তে পারলেও যে কোন ফার্মাসিস্টরা ব্যবস্থাপত্র পড়তে পারতেন এবং নির্দেশিত ঔষধ সরবরাহ করতে পারতেন। যে কোন রোগী যে কোন স্থান থেকে ঔষধটি সংগ্রহ করতে সক্ষম হত। ইদানীং কিছু চিকিৎসক অদ্ভুত সেই লেখার সাথে যোগ করেছেন বিভিন্ন সাঙ্কেতিক চিহ্ন যাতে তার চেম্বারের আশেপাশের ফার্মেসী ছাড়া ঐ ব্যবস্থাপত্রের পাঠোদ্ধার করা অসম্ভব। আপনি যখনই অন্য কোন এলাকার ফার্মেসী থেকে ঔষধ কিনতে যাবেন বিড়ম্বনার স্বীকার হতে বাধ্য। প্রথমত ঐ সাঙ্কেতিক লেখা তাঁরা পরতে পারবেন না দ্বিতীয়ত ব্যবস্থাপত্রে ঔষধের জেনে টিক নাম ব্যবহার না করে ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করায় আপনি বেশির ভাগ সময়ই কাঙ্ক্ষিত ব্র্যান্ডটি পাবেন না যদি পেয়েও যান দেখবেন একই জেনে টিক নামের অন্য ব্র্যান্ডের ঔষধের থেকে ব্যবস্থাপত্রে লেখা ব্র্যান্ডটির দাম বেশী।
কদিন আগে ঠিক এমনই এক বিড়ম্বনার স্বীকার হয়েছিলাম। মায়ের চোখের ছানি অপারেশনের পরে বছর খানেক ভালোই ছিলেন। হঠাতই চোখে এ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিল। মিরপুরে বোনের বাসায় থাকতে ডাক্তার দেখালেন। আমি তাড়াহুড়ো করে নিয়ে আসাতে ঔষধটা আর কেনা হয়নি। ভাবলাম উত্তরা থেকে কিনে নেব। তাজ্জব ব্যাপার! একটা ফার্মেসিতেও ফার্মাসিস্টরা প্রেসক্রিপশনের লেখা পড়তে পারলেন না। ছোট বড় মিলিয়ে কম করে হলেও পনেরটা ফার্মেসি ঘুরে অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম ঐ ডাক্তারের চেম্বারের আশেপাশের কোন ফার্মেসী অর্থাৎ মিরপুর থেকেই ঔষধ কিনে আনব।
ফার্মাসিস্টদের কাছে এমন লেখার ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তাঁদেরই একজন এই চমকপ্রদ তথ্যটি জানাল। এখানেও ডাক্তারের ব্যবসা, মানে কমিশন জড়িত! এই লেখাও ওনার চেম্বারের আশেপাশের ফার্মেসির ফার্মাসিস্টরাই পরতে পারবেন। এবং যথারীতি তিনি তার কমিশনটিও পেয়ে যাবেন।
চিকিৎসকদের দিন দিন এমন অর্থলিপ্সু হয়ে যাওয়ার পেছনের কারণ একটিই আর তা হল তাদের অবৈধ অর্থ গ্রহণের সুযোগ করে দেয়া। একদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তথা সরকারের উদাসীনতা অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক লোভনীয় সব অফার দেয়া। যা তাদের প্রতিনিয়ত আরও বেশী লোভী আরও বেশী অমানবিক করে তুলছে।
বাংলাদেশের মহান(!) চিকিৎসকদের আয়ের কিছু খাত দেখলে সহজেই বুঝা তাঁরা কতটা সেবার মন নিয়ে এই মহান পেশায় বিচরণ করছেন। নিম্নে তাদের নিয়মিত আয়ের খাতগুলো দেয়া হল-
বৈধ আয়:
নির্ধারিত মাসিক বেতন। গাড়ী, বাড়ী ভাতা।
অবৈধ আয়:
*কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে বিভিন্ন হসপিটালের কল এটেন্ড।
*ঔষধের ব্র্যান্ডের দালালি বা ঔষধ কোম্পানির দালালি।
*বিভিন্ন হাসপাতালে ও ডায়াগনোসিস কনসালন্টেন্সি।
*বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পদায়ন ভাতা।
*মেডিকেল ইকুইপমেন্ট এর দালালি।
*পরীক্ষা নিরীক্ষা বাবদ ডায়াগনোসিস সেন্টার থেকে ৪০ থেকে ৬০ ভাগ কমিশন আদায়।
*বিভিন্ন সার্টিফিকেট ও প্রত্যায়ন পত্র দেয়া বাবদ সম্মানী।
*কেবিন বাণিজ্য।
*হাসপাতালে খাবার ঔষধ ও বিভিন্ন সরবরাহ থেকে কমিশন আদায়।
*ফিজাশিয়ান স্যাম্পল বাণিজ্য।
*অপারেশন, ফিজিওথেরাপি ও রেফার্ড সুবিধা।
*ঔষধ কোম্পানির উপঢৌকন।
*আন্তর্জাতিক দাতাদের মাধ্যমে ডাক্তারি ও ঔষধ খাতে হাজার হাজার কোটি ডলারের লোণ,গ্রান্ট,এইড।

ওষুধ কোম্পানির প্ররোচনায় বাংলাদেশের চিকিৎসকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লিখেন। দেশের চিকিৎসায় ৫০ ভাগ ওষুধই অপ্রয়োজনে প্রয়োগ করা হয়। যা রোগীকে বিভিন্নভাবে আরও অসুস্থ করে তুলছে।
ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট, ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউ বিবি) ও আন্তর্জাতিক সংগঠন দি ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারের আলোচক ডাক্তার এইচ এম লেলিন চৌধুরী নিজেই কিছুদিন আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে এ মন্তব্য করেন।
এর বাইরেও রয়েছে চিকিৎসকদের নিয়ন্ত্রন হীন পারিশ্রমিক নেয়ার প্রবণতা যা ৫০০ হতে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
এরপরেও তাদের চিকিৎসক বলবেন নাকি সেবকের নামে দুর্বৃত্ত বলবেন সেটা আপনার বিবেচ্য।

যে মানুষটি ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা খরচ করে একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তিনি কেন লেখাপড়া জানা স্বত্বেও চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র পড়তে পারবেন না? কেন তাকে চিকিৎসকের পছন্দের ব্র্যান্ডের ঔষধ সেবন করতে হবে? কেন তাকে চিকিৎসকের ইচ্ছে অনুযায়ী নির্দিষ্ট ল্যাব থেকে যাবতীয় টেস্ট করাতে হবে?
কেন হাজার টাকা খরচ করে একটি টেস্ট করে আবার ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে রিপোর্ট সম্পর্কে জানতে। জটিল বিষয়গুলোর কথা আলাদা। সাধারণ রিপোর্ট গুলির ফলাফল কেন ডায়গনষ্টিক সেন্টার থেকেই রোগীকে বলে দেয়া হবে না?
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তথা সরকারের কাছে কি এর সদুত্তর আছে?

উদাহরণ স্বরূপ কিছুদিন আগে হার্টের অবস্থা জানতে ইসিজি করালাম রিপোর্টে কোন কমেন্ট না দেখে জানতে চাইলাম হার্টের কি অবস্থা?
টেকনিশিয়ান বলছে আমি বলতে পারব না ডাক্তার দেখাতে হবে?
অদ্ভুত তো আমার তো কোন সমস্যা নেই, ডাক্তার দেখাব কেন? আপনি বুঝতে পারছেন না?
পারছি, তবে বলার নিয়ম নেই।
ডাক্তারের ভিজিট কত?
বেশী না পাঁচশ।
আচ্ছা চলুন আপনার ডাক্তারের কাছে যাই।
ডাক্তার রিপোর্ট দেখে বললেন এমনি তো কোন সমস্যা দেখছি না তবে আরও ভাল করে জানতে হলে ইকো-কার্ডিওগ্রাফ করতে হবে। মানে আবার আরেক টেস্ট তাও আবার পাঁচ সাতশ নয় একেবারে পাঁচ হাজার টাকার ধাক্কা! এবার বুঝুন আমরা কি অবস্থায় আছি।

সরকার যত চেষ্টাই করুক না কেন কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে আলোকপাত না করলে তার কোন সুফলই সাধারন রোগীদের কাছে পৌঁছুবে না। সাধারন রোগীদের উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদানের স্বার্থে অনতিবিলম্বে-
* চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র সকলের পড়ার উপযোগী করে কম্পিউটারাইজড করা বাধ্যতামূলক করুন।
* প্রতিটি টেস্ট রিপোর্টে ফলাফল লিখে দেয়া বাধ্যতামূলক করুন।
* ব্যবস্থাপত্রে ঔষধের ব্র্যান্ড নাম না লিখে জেনে টিক নাম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করুন।
এ ছাড়াও চিকিৎসকদের নানা অনিয়ম এবং অহেতুক টেস্ট করানো থেকে বিরত রাখতে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

kmgmehadi@gmail.com
সহযোগিতায়ঃ লস্কর নাজমুস সাকিব