ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে (সুপার পাওয়ার) বা আর একটি বিশেষ শক্তির উত্থান হয়েছে বলে অনেকে আশংকা প্রকাশ করছেন। তবে তারা কারা? কতটা সুসংঠিত? বা আদৌ এ রকম কোন শক্তির অস্তিত্ব আছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। আমাদের মত সাধারনের পক্ষে এত উচ্চমার্গীয় বিষয়ে সঠিক ধারনা লাভ করাও সত্যিই দূরহ। আর তাই এ নিয়ে খুব বেশি আলোচনাও যৌক্তিক নয় বলেই মনে করি। তবে কোথাও যে একটা গণ্ডগোল আছে তা সহজেই অনুমেয়। কিছু কিছু খবর আমাদের টেনে নিয়ে যায় কোন এক রহস্যময় ব্লাকহোলে। কোনভাবেই মেলাতে পারি না প্রশ্নের উত্তর। দেশের একটি জাতীয় দৈনি্কে গত ১২ মে ২০১২ এবং ২২ মে ২০১২ ইং তারিখে প্রকাশিত দু’টি ফিচারের অংশবিশেষ উল্লেখ করছি, “এ সরকারের বিভিন্ন দফতরে মন্ত্রী-এমপিদের শত শত ডিও লেটার পড়ে আছে, কিন্তু কেউ খুলেও দেখছেন না। এমনকি প্রভাবশালী মন্ত্রীর কর্মকর্তারাও ঠিকমতো মন্ত্রীর নির্দেশ মেনে চলছেন না। নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নে মন্ত্রী-এমপিদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। অসহায়ের মতো শুধু মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রণালয়ে ঘুরছেন অনেক এমপি। কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত একজন এমপি জানান, উন্নয়নের জন্য এলজিইডিতে শত শত ডিও লেটার দিয়েছেন। কোনো কাজ হয় না। উন্নয়ন খাতের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের চিত্র বেহাল। সড়ক, জনপথ, শিক্ষা বিভাগ উন্নয়নের সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিদের কাজ করে। বাকি সব এলাকাই উন্নয়নবঞ্চিত। তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে, এখন অনেক কর্মকর্তা সরকারি দলের এমপিদের ফোন ধরেন না”।

ঐ একই পত্রীকায় প্রকাশীত খবরে জানা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর তুরস্ক যাওয়ার সময় নির্দিষ্ট ফ্লাইটে নিরাপত্তা ছারপত্র ছাড়াই বিমানের একজন জুনিয়র অপারেশন কর্মকর্তাকে দায়িত্বে রাখা হয়। গোয়েন্দারা জানতে পারেন, সংশ্লিষ্ট জুনিয়র অপারেশন কর্মকর্তা নিষিদ্ধ ঘোষিত ফ্রিডম পার্টির একজন সদস্য ছিলেন। এরই ফলশ্রুতিতে বিমানের মহাব্যবস্থাপক(জিএম) মমিনুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলেও জানা যায়। এর আগে ২০১০ সালে নাইজেরিয়ায় ওআইসি সম্মেলনে যোগ দিতে যাওয়ার সময়ও প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইটে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মত ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনা নিয়ে তদন্ত শুরু হলেও রহস্যজনক কারনে তা ধামাচাপা পড়ে যায়। প্রশ্ন হল কি করে সেই তদন্ত ধামাচাপা পড়ে যায়? আর একে কি শুধুই গাফেলতি বলা যায়?

একই পত্রিকার ১২মে২০১২ তারিখে প্রকাশিত একটি ফিচারে উল্লেখ করা হয়েছে “আতশবাজি পোড়ানোর তুচ্ছ ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামানের কাছে চরমভাবে নাজেহাল হন এমপি একরাম। রাত দেড়টা থেকে ভোর পর্যন্ত ওই ওসি নোয়াখালী সদরের প্রভাবশালী এমপি মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরীকে থানায় বসিয়ে রাখেন। ওই রাতেই বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সম্পৃক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক ফণীভূষণ মজুমদার ওই ওসিকে ফোন করেন। তবে ফণীভূষণ মজুমদারের সঙ্গেও ঠিকভাবে কথা বলেননি ওই ওসি।“

তবে কি এরই ধারাবাহিকতায়ই সাগর-রুনী হত্যাকান্ডের তদন্তকাজে এত গোলমেলে অবস্থা? কেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়েও পড়ে তার অবস্থান পরিবর্তন করলেন? আর কেনই বা তিনি এর তদন্ত প্রধানমন্ত্রী সরাসরি দেখভাল করছেন বলে প্রধানমন্ত্রীর উপর দায়িত্ব চাপাতে চাইলেন। অথচ এই তদন্তকার্যে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতিও নেই।

ইলিয়াস আলী নিখোঁজের বিষয়টা নিয়ে সরকার এবং বিরোধীদল উভয় পক্ষের আচরনই ঠিক স্বাভাবিক বলে মনে হয়নি। আমরা ইলিয়াস আলী নিখোজের বিষয়টা মোটেই হালকা বলে ধরে নিচ্ছি না। কিন্ত তার পড়েও কেন যেন মনে হয় এর প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি যেভাবে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল তা যেন ঠিক তাদের সাথে যাচ্ছিল না। বিশেষ করে গত তিন বছরে তাদের যে আচরন পরিলক্ষিত হয়েছে তার সাথে এ আচরনের মাঝে বিস্তর ফারাক। ঠিক একইভাবে সরকারও যেন হঠাৎই ইউটার্ন নিল। যার জন্য বিএনপি বা ১৮ দলও মনে হয়না যে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে যথেষ্ট সংবেদনশীল সে প্রমান তিনি বহুবার দিয়েছেন। সেই তিনিই যখন ইলিয়াস আলীর স্ত্রীকে আশ্বাস দিলেন তখন ইলিয়াস আলীর স্ত্রীসহ আমরাও হাঁফ ছেড়ে বেচেছিলাম। তারপরে কি হল?

সৌদি কুটনীতিক কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ড আরও বেশি রহস্যময়। এ রহস্যের জট খোলা বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখার জন্য খুবই জরুরী। আর তা বর্তমান সরকারও খুব ভাল ভাবেই জানেন। কিন্ত এ ক্ষেত্রেও আশাজাগানিয়া কোন খবর আমরা পাইনি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই ব্যাপারে বিএনপির যে মাত্রায় প্রতিক্রিয়া দেখানোর কথা তারা সে তূলনায় তেমন কিছুই করেনি। কিন্ত কেন?

বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসনের ব্যাপারে যে যতই বিরুপ মন্তব্য করুক না কেন একটা কথা সতঃসিদ্ধভাবে প্রচলিত আছে আর তা হল পুলিশ চাইলে সব পারে। কথাটা পুলিশের ক্ষমতার উপর মানুষের আস্থারই বহিঃপ্রকাশ। আর তা তাদের অনেকদিনের কষ্টার্জিত অর্জন। যা বলার অপেক্ষা রাখেনা। অথচ সাম্প্রতিক সময়ের ঘটে যাওয়া অত্যন্ত স্পর্শকাতর ঘটনাগুলোর রহস্য উন্মোচনের ক্ষেত্রে যে ব্যর্থতা তা কি তাদের এতদিনের কষ্টার্জিত অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে না? (যদিও সত্যিই কি তারা ব্যার্থ? এ প্রশ্নও জনমনে উকি দিচ্ছে।) আর যদি ব্যার্থ হয়েও থাকেন, হঠাৎ করেই কেন এত ব্যার্থতা তাও কি খতিয়ে দেখা হচ্ছে?

পদ্মা সেতুর দুর্নীতির ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় রেল মন্ত্রী সুরঞ্জীত সেন গুপ্তের মত করে হলেও একটি ভূমিকা নিতে পারতেন, আর সেটাই তার কাছে কাম্য ছিল। কিন্ত তিনি তা করেননি। কেন করেননি তা রহস্যাবৃত। অথচ এ ব্যপারে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার পরেও যদি বিশ্ব ব্যাংক অর্থ ছাড় না করত তখন জনগনের সহানুভূতি হয়ত সরকারেরই পক্ষে যেত। তথাপিও সরকার তা না করে ক্ষতিটা নিজের করল। কিন্ত কেউ না কেউ তো লাভবান হল। সে কে? আর তার ক্ষমতারই বা উৎস কি?

তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুটিও সরকারের পূর্ব পরিকল্পিত বলে মনে হওয়ার কোন কারন নেই। হাইকোর্ট এর রায়ের পূর্ব পর্যন্ত এটা তাদের খুব যে মাথা ব্যাথার কারন তা বোঝার মত তেমন কোন বক্তৃতা বা বিবৃতিও আমরা পাইনি। হঠাৎই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতই একটি ইস্যু তৈ্রী হল। আর এই ইস্যু নিয়েই জানবাজি রাখা লড়াই শুরু হয়ে গেল।

বিদ্যুৎ সমস্যা যে কুইক রেন্টাল বাড়াবে বৈ কমাবে না এ আশঙ্কা খোদ সরকার দলীয় নেতারাও ব্যাক্ত করেছেন। তারপরেও সরকার তার সিদ্ধান্তে অটল থেকে আজ অনেকটাই বেকায়দায় বলে মনে হচ্ছে। সবই তো আর ভূল সিদ্ধান্ত হতে পারে না। তবে জেনে শুনে বিষ পান করা কেন?

সরকার দলীয় মন্ত্রী-এমপিদের কথায় তাদের দলীয় সমন্বয়হীনতা চরমভাবে ফুটে উঠছে। যেন কেউই তার নিজের কথাটি বলছেন না। বর্তমান সরকার নিশ্চয়ই পূনরায় ক্ষমতা লাভের আশা করছেন। কিন্ত জনগনের কাছে পূনরায় ম্যান্ডেট চাওয়ার জন্য কিছু সমস্যার আশু সমাধান প্রয়োজন। কিন্ত সে লক্ষে কি তারা উদ্যোগী হচ্ছেন?

সরকারের নীতিনির্ধারকদের কথা শুনলে মনে হয় তারা নিশ্চিত যে পূনরায় তারাই ক্ষমতায় আসছেন। এই নিশ্চয়তাই বা তাদের কে দিল?

সুত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন।