ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

যৌনতা আর ভা্লবাসা শব্দদুটি আজ সমার্থক হয়ে গেছে। আমাদের ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, সিনেমা, নাটকে ভালবাসা বা প্রেমকে এমনভাবে চিত্রিত করা হচ্ছে যেন ভালবাসা বলতে দুটি নর-নারীর বোঝাপড়া, আর তাদের আবেগ উচ্ছাসে ভেসে যাওয়াকেই বোঝায়। এটা যেন শুধুমাত্র দু’টি নারী-পুরুষের স্বপ্নের পৃথিবী ভাঙ্গা-গড়ার গল্প বই আর কিছু নয়। আর একে এমনভাবে চিত্রিত করা হচ্ছে যেন এটা ছারা কারো জীবন পূর্নাঙ্গ হয় না। আর তাই উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের অন্যতম লক্ষ হচ্ছে জীবনের পূর্নাঙ্গতা(!)পাওয়া। সে লক্ষে তারা কত কিইনা করছে। এই হিরো হওয়ার প্রবনতা তাদের বিকৃত মনোজগৎ গড়ে তোলে। একটু খেয়াল করে দেখবেন। তারা যা করছে তা কিন্ত তাদের উদ্ভাবিত নয়। কোন না কোন সিনেমা বা নাটকে তারা যা দেখছে। ঠিক তাই করছে।

ভালবাসা মানে কি?

ভালবাসা একটি শক্তির প্রতিশব্দ। যে শক্তি কাজ করেছে পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে শুরু করে সভ্যতার শিখরে পৌছান অবধী। যে শক্তি আজো পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রেখেছে। ভালবাসা তখনি স্বার্থকতা লাভ করে যখন তা স্থান করে নিতে পারে সকল ভোগের উর্ধ্বে । অথচ আজ আমরা ভালবাসাকে লালসা চরিতার্থের উপায় হিসেবে ধরে নিয়েছি। যারা আমাদের মিডিয়া অঙ্গনে কাজ করছেন তাদের কাছে আমার অনুরোধ সেলুলয়েডের পর্দায় ভালবাসাকে নায়ক-নায়িকার প্রেমের মত এতটা ছোট ফ্রেমে বন্দি করবেন না। এর ব্যাপ্তিটাও দেখাতে সচেষ্ট হন। নয়ত সন্তানের প্রতি মা-বাবার, মা-বাবার প্রতি সন্তানের, বোনের প্রতি ভাইয়ের, মানুষের প্রতি মানুষের। দেশের প্রতি নাগরিকের যে সম্পর্ক তাকে কি বলবেন? শুধুই দ্বায়িত্ববোধ? ভালবাসা না থাকলে দ্বায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। ভালবাসা শব্দটিকে যদি মহিরুহুর সাথে তুলনা করি তাহলে দ্বায়িত্ববোধ তার একটি শাখা মাত্র।

আশেপাশে কি দেখছি?

ধরুন; রমনাপার্ক, কোন ভার্সিটির ক্যাম্পাস, টি এস সি অথবা যে কোন পাবলিক প্লেসে আপনার বোন বা মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে বেড়িয়েছেন। আশেপাশে যা দেখছেন তাতে কি স্বাচ্ছন্দবোধ করছেন? নিশ্চয়ই নয়? খেয়াল করুন বেশিরভাগই তথাকথিত শিক্ষিত, ভদ্রঘরের সন্তান। এদের দেখে কি তা মনে হয়? ভালবাসা কি মানুষকে নিরাভরন হতে শেখায়? ধর্মিয় অনুশাষন না হয় বাদই দিলাম মানুষের সাধারন বিবেকও যদি কাজ করত নিশ্চয়ই মানুষ এত বেহায়া হতে পারে না। বেলাল্লাপনা আজ লজ্জাকে গিলে খেয়েছে। আজকাল টিভি নাটকের অন্যতম উপজীব্য বিষয় হল বিবাহ পূর্ব জৈবিক সম্পর্ক। এছাড়া হাতের কাছে অবাধ ইন্টারনেট। সাইবার ক্যাফের বদ্ধ ঘর। পর্ন গ্রাফির অবাধ সরবরাহ। এর থেকে মুক্ত থাকা তো অনেকটা পানিতে ডুব দিয়ে জল স্পর্শ না করার মত। আজ আমরা যৌনতাকে ভালবাসার খোলসে মুড়ে করছি যথেচ্ছ ব্যবহার। ধর্মিয় মূল্যবোধ, সামাজিক অনুসাশন সব কিছুই ভেসে গেছে তথাকথিত আধুনিকতার জোয়ারে। যা আমাদের নিয়ে যাচ্ছে আইয়ামে জাহিলিয়ার যুগে।

আমরা কি ভাবছি?

এই লেখা পড়ে কেউ হয়ত বলবেন এর বিরুদ্ধে কঠিন আইন করা উচিৎ। আমি তার সাথে দ্বিমত পোষন না করেও বলব লাভ নেই। শুধুমাত্র আইন করে যদি সমস্যার সমাধান হত। তাহলে মানুষ মানুষকে খুন করত না। কেউ হয়ত বলবেন মেয়েদের পর্দার কথা। আমি তার সাথেও দ্বিমত পোষন না করেই বলব, লাভ নেই। কারন সব নারী যদি কাল থেকে দরজায় খিল এটেও বসে থাকে তবু দূবৃত্তরা নিস্ক্রান্ত হবে না। যতক্ষন না আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী বদলাবে। যতক্ষন না নারী নিজে তার আত্নসন্মানবোধে বলীয়ান হতে পারবে। যতক্ষন না পারিবারিকভাবে নারীকে মর্যাদার আসনে বসানো হবে। আমাদের সমাজে একই নারীকে দেখা হয় বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে এবং খন্ডিতভাবে। আর তাকে মূল্যায়নও করা হয় বিভিন্নভাবে। যেমন মা, বোন, প্রেয়সী, বান্ধবী কিংবা আনন্দোপকরনমাত্র। দেখুন কখনোই তাকে পূর্নাঙ্গরুপে চিন্তা করা হয় না। যা তার স্বত্তাকে ঠিক মানুষের পর্যায়ে না পৌছিয়ে কিছুটা যেন ছোট করে রাখার একটা চেষ্টা বলে মনে হয়। এটা কোন বিশেষ শ্রেনীর মধ্যেই যে সিমাবদ্ধ তা কিন্ত নয়। আর তাই দেখা যায় । সমাজের সর্ব্বনিন্ম শ্রেনী থেকে শুরু করে সর্ব্বচ্চশ্রেনী; সর্বত্রই কম বেশি নারী নির্যাতন হচ্ছে।

গলদটা কোথায়?

তাহলে গলদটা কোথায়? হ্যা এটাই আসল প্রশ্ন। এই ব্যাধীটা আমাদের মগজের। যা সারতে হলে ধোলাইটাও করতে হবে মগজকে। নারী – পুরুষের মধ্যে যে, দৈহিক গঠন ছাড়া কোন পার্থক্য নেই। সবার আগে এই বোধটুকু জাগ্রত করা প্রয়োজন। সেই সাথে ধর্মিয় অনুশাসনকে আধুনিকতার দোহাই দিয়ে বাতিল করাকেও আমার কাছে মনে হয় মূর্খতারই নামান্তর মাত্র।

আমরা কি দায়ী নই?

আমরা স্বার্থান্ধ হয়ে গেছি। নিজেকে নিয়েই আমাদের পৃথিবী। আমার পাশের ফ্লাটে কে থাকে তা আমরা জানি না। প্রতিবেশী বলে যে একটা শব্দ আছে তাই যেন ভূলে গেছি। তারপরে আবার দ্বায়িত্ব পালন! মানুষ সামাজিক জীব। সমাজকে নির্মান করা হয়েছিল মানুষের আর্থ সামাজিক নিরাপত্তার খাতিরেই। আজ প্রযুক্তির উন্নয়নের যুগে এসে আমরা ভাবতে শুরু করেছি আমরা প্রত্যেকেই স্বনির্ভর। এই সমাজ আমাকে কিছু দিতে পারে না বরং স্বাধীনতা খর্ব করে। তাই আমরা এড়িয়ে যাই সামাজিক দায়বদ্ধতা। ভূলে গেছি সামাজিক মূল্যবোধ। আমরা যদি ভাবতে পারতাম সবাই এক। যদি সজাগ থাকতাম আমাদের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে তাহলে মিরপুরের হযরত আলীকে হয়ত এভাবে প্রান দিতে হত না। দেখুন সেদিন হযরত আলী কিন্ত একা ছিল না তারসাথে আরো ক’জন ছিল। যদি তারা সবাই একটি করে ইটও হাতে নিয়ে দাড়াত তাহলে হয়ত দুবৃত্তরা গুলি ছোড়ার সাহসই পেত না। এবং তাদের ধরাও সম্ভব হত।
এরপরে আসুন আমরা আমাদের সন্তানদেরকে কি শিখাচ্ছি? আমার সন্তান দেখছে আমি তার দাদা-দাদীকে অবহেলা করছি। আমরা তাকে বৃ্দধাশ্রমে অথবা গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে সস্তির নিঃস্বাষ ফেলছি। পারিবারিক, সামাজিক মুল্যবোধ এবং দায়বদ্ধতার পাঠ তার পাঠ্য বই থেকে শুরু করে ব্যবহারীক জীবন থেকে সে কতটুকু শিখতে পারছে?

একটি দৃশ্যকল্প।

আমরা একটি পরিবারকে যদি এভাবে কল্পনা করি, ধরুন একটি পরিবার। যেটি গড়ে উঠেছে বাবা-মা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী, চাচা-চাচী এবং চাচাত ভাই-বোনদের নিয়ে। যাকে আমরা যৌথ পরিবার বলে জানি। যেখানে সবাই একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধ। একজন অন্যজনকে লেখাপড়ায় সাহায্য করে, বড় ছোটকে আদর করছে প্রয়োজনে শাষন করছে। তারা একসাথে খেলছে, আনন্দ করছে। যাদের আনন্দের সবচেয়ে বড় উপকরন তাদের পারস্পরিক বন্ধন। হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকা। পরিবারের কোন ছেলে বাহিরে কোথায় যায়, কার সাথে মিশছে, কি করছে এটা লক্ষ করার জন্য এই পরিবারের আছে কয়েক জোড়া বিশ্বস্ত চোখ। এই পরিবারের কোন মেয়েকে তার প্রেমিকের বাড়িতে গিয়ে আত্নহত্যা করতে হয়নি কারন কেউ কোন অনৈ্তিক সম্পর্কে জড়ায়নি। সে সু্যোগও সে পায়নি। কেননা এখানে শুধুমাত্র কয়েক জোড়া বিশ্বস্ত চোখই যে আছে তাই নয়, আছে তার অনেকগুলি হিতাকাংখীও। এই পরিবারের কোন ছেলে রাস্তায় ইভটিজিং করে না কারন প্রথমত তাকে তার আপন এবং চাচাত বোনদের দ্বায়িত্ব নিতে হয়। একত্রে বসবাস এর ফলে মেয়েদেরকে পন্য বা আনন্দপকরন হিসেবে না দেখে মানুষ বা বন্ধু হিসেবে দেখতে শিখেছে। এছাড়াও ঐযে কয়েক জোড়া বিশ্বস্ত চোখ যা তাকে সবসময়ই তটস্ত করে রাখে। এই পরিবারের কোন পূত্রবধু নির্যাতিত হন না বা নিহত হন না কারন ঐ পর্যন্ত কোন ঘটনা ঘটার আগেই পরিবারের সদস্যরা সমাধান করে ফেলেন। এখানে একজন ভূল করলে অন্যজন তার ভূল ধরিয়ে দেন। এখানে কেউ কাউকে অন্যায় কোন কাজে প্ররোচিত করলে অন্যজন তাকে নিবৃত্ত করেন। এখানে কেউ কারো প্রতিদ্বন্দি নয় একে অপরের পরিপুরক। আর তাই একজন কর্তা গত হলে তার পরিবারের সদস্যরা অথই সাগরে পড়েনা।

এই যে পরিবারটির কথা বললাম এটা হয়ত আমার দৃশ্যকল্প মাত্র কিন্ত একবার ভাবুন তো আপনি বা আর একটু পুড়াতন যারা, তারা কি এমন কোন পরিবারেরই সদস্য ছিলেন না? আজকের এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে সমগ্র মানব জাতীকেই যেখানে একটি পরিবারের কাঠামোতে আসা উচিৎ সেখানে আমরা একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠিই পারছি না একটি কাঠামোর মধ্যে আসতে। শুধুমাত্র আমাদের সংকির্নতা আর আমাদের স্বার্থান্ধতার জন্যে।পরিশেষেঃ

এই যে পরিবারটির কথা বললাম এটা হয়ত আমার দৃশ্যকল্প মাত্র কিন্ত একবার ভাবুন তো আপনি বা আর একটু পুড়াতন যারা, তারা কি এমন কোন পরিবারেরই সদস্য ছিলেন না? আজকের এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে সমগ্র মানব জাতীকেই যেখানে একটি পরিবারের কাঠামোতে আসা উচিৎ সেখানে আমরা একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠিই পারছি না একটি কাঠামোর মধ্যে আসতে। শুধুমাত্র আমাদের সংকির্নতা আর আমাদের স্বার্থান্ধতার জন্যে। যেদিন আমরা ভাবতে পারব সবাই আমরা এক। যে মেয়েটি রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে সে আমারই বোন। যেদিন বিপদগ্রস্থ কোন মেয়ে নির্দিধায় আমার কাছে সাহায্য চাওয়ার সাহস পাবে। ভাববে তার পাশ দিয়ে যে হেটে যাচ্ছে সে তার শুভাকাংখী। ঠিক তখনই দূর্বত্ততা উলটোপথে হাটতে শুরু করবে। মানুষই মানুষকে নিরাপত্তা দেয়। প্রয়োজন মনুষত্যের।যা দিনকে দিন ক্ষয়প্রাপ্ত হতে হতে আজ প্রায় ভঙ্গুর অবস্থায় উপনীত।