ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

তারিখ: ২৯শে-ডিসেম্বর-২০১১ইং

ভূমিকার পূর্বেঃ “উইন্ডোজ” অপারেটিং সিস্টেম কে আমি “খিড়কী” বা “জানালা” নামে ডাকতেই স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করি। আমার এ লেখায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি লেখাটা পড়ে আহত হোন বা কষ্ট পেয়ে থাকেন তো সেইজন্যে আমি আন্তরিকভাবেই দুঃখিত। কিন্তু করার ও তো কিছু নেই। আমার লেখায় যদি আমিই শান্তি না পাই তো লিখবো কি করে‍‍? এই কাজটুকু করাই হতো না যদি না “প্রজন্ম ফোরাম” আর “উবুন্টু বাংলাদেশ” এর মেইলিং লিস্টে কিছু মানুষের ভুল ধারনা কে ভেঙ্গে দিতে কিছু কঠিন মন্তব্য না করতাম আর সেখানে আমাদের গৌতম দা আমাকে এই বিষয়ে বিশদভাবে লেখার জন্য উৎসাহ না দিতেন। গৌতম রয় কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার ভেতরের আমি কে টেনে-হেঁচড়ে বের করে নিয়ে আসবার জন্য।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ লেখাটি আমি পর্ব আকারে আসন্ন প্রতিটি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে প্রকাশ করবো। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব। অষ্টম পর্বে লেখার উপসংহার প্রকাশ পাবে ইনশাল্লাহ।

কেন মাইক্রোসফটের নিম্নোক্ত কাজগুলোকে অন্যায় বলেছি তা নিয়ে উত্তেজিত হয়ে যাবেন না যেনো। আগে আমার লেখাটা পড়ে, জেনে, মর্মোদ্ধার করে বুঝে নিন। তারপর যদি দেখেন যে আমার এই লেখা বা মূল সুত্রের লেখায় কোন অংশে ত্রুটি রয়েছে তো আমাকে জানাবেন। আমি সংশোধনীটুকু দেবার/করে নেবার প্রয়াস পাবো। সেই সাথে নিজেও নতুন কিছু জানবার ও শেখবার সুযোগ পাবো। আর আটটি পর্বের কথা তো পূর্বেই উল্লেখ করেছি, তাই লেখাটুকু আট পর্বে সম্পূর্ন প্রকাশিত করবার পূর্বে আমি নিজে এই লেখা নিয়ে কোন প্রশ্নের উত্তর/মন্তব্য দেবো না।

ভূমিকাঃ আমার এই লেখাটি কোন মৌলিক রচনা নয়, সংকলিত একটি অনুবাদ মাত্র, সাথে ব্যক্তিগত কিছ মতামত, মন্তব্য আর চিন্তার প্রকাশ অঙ্গাঅঙ্গীভাবেই জড়িয়েই পুরোটা লেখা হয়েছে। মূল লেখার সুত্রঃ http://en.windows7sins.org/#education-more । আসলে এই কাজটুকু হুবহু অনুবাদের মতো কিছু নয়, চেষ্টা করা হয়েছে যথাসম্ভব সঠিক ভাবটুকু বজায় রেখে সঠিকরুপে, সহজ বাংলায় বর্ননা করতে।

পাদ প্রদীপের আলোটুকু যেখানে নিপতিতঃ এই লেখাটির মূল বক্তব্যই হচ্ছে windows বা “জানালা” অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে, যাঁর মাধ্যমে মাইক্রোসফট আপনার কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রনের জন্য আইনগত দিক থেকে সব রকমের কর্তৃত্বের অনুমতিই নিয়ে নিচ্ছে এবং সেই ক্ষমতাকে সম্পূর্নরূপে অপব্যবহার করে মাইক্রোসফট ঐ কম্পিউটারের সকল ব্যবহারকারীদেরকে অন্যায়ভাবে প্রভাবিত/প্ররোচিত/পরিচালিত করার প্রয়াস নিচ্ছে। তো সেই ‘গুরুতর পাপ’ বা ‘অন্যায়’ যা মাইক্রোসফট করেছে, করছে এবং করতে যাচ্ছে তা সম্পর্কে আপনাদের সবার দৃষ্টি আকর্ষনের জন্যেই আমার এই প্রয়াস।

যে সাতটি ‘পাপ’ বা ‘অন্যায়ে’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ/সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আমার এই লেখা –

১। শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ায় বিষ প্রয়োগ (Poisoning Education)
২। ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তায় অযাচিত হস্তক্ষেপ (Invading Privacy)
৩। একচেটিয়া ব্যবসার লক্ষ্যে অনৈতিক আচরন (Monopoly Behavior)
৪। ব্যক্তি স্বাধীনতায় পরিপন্থী অনৈতিক বাধ্যগতকরণ (Lock-in)
৫। আদর্শমানদন্ডের অপব্যবহার (Abusing Standards)
৬। ডিজিটাল রেষ্ট্রিকশন ব্যবস্থাপনার বলপূর্বক প্রয়োগ (Enforcing DRM)
৭। ব্যবহারকারীর নিরাপত্তার প্রতি হুমকি (Threatening user security)

আজকে আমি, ১। শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ায় বিষ প্রয়োগ (Poisoning Education) বিষয়ে আলোকপাত করবো

শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন কি? শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে একটা বানী বহুল প্রচলিত আছে – “তুমি একজন মানুষকে একটা মাছ দাও এবং তাঁর একটা দিনের খাবারটুকু নিশ্চিত করো। আর যদি তুমি তাঁকে মাছ ধরতেই শিখিয়ে দাও তো তুমি তাঁর জীবনকালের জন্যেই খাবার নিশ্চিত করবে।”

আমার নিজের বোধ থেকে যদি বলি তো – “মানুষের জীবনধারনের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু কে জানতে, বুঝতে ও সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শিখতে সে প্রক্রিয়াটুকুর মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাই শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন।”

আমাদের আগামী প্রজন্মের শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন একটি সরঞ্জাম হিসেবে কম্পিউটারের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে যে, যাঁদের শিক্ষাক্রমে কম্পিউটারকে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তাঁদেরকে শুধুমাত্র একটা সুনির্দিষ্ট কোম্পানীর পন্যের ব্যবহার্যবিধিই শেখানো হচ্ছে: মাইক্রোসফট’র পন্য। মাইক্রোসফট প্রচুর পরিমানে অর্থ বিনিয়োগ করে থাকে বিভিন্ন পরামর্শদাতা ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান এর জন্য যাতে করে বিপনন প্রকিয়া সহজতর হয় আর শিক্ষা বিভাগের সহায়ক বিষয়গুলোকে নিজের আয়ত্তে আনা যায়।

কিভাবে ঘটছে শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়ায় বিষ প্রয়োগ? আসলে মাইক্রোসফটের আয়ের বিশাল খাতসমূহের অন্যতম একটিই হলো শিক্ষার্থীদের শিক্ষা মাধ্যম আর তাই অত্যন্ত কৌশলে আগামীদিনের নাগরিকদেরকে নিজের পন্যের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে নেয়ার প্রয়াসের শুরুটা এখানেই। শিক্ষামাধ্যমগুলোয় শিক্ষার্থীদেরকে মাইক্রোসফটের বিভিন্ন পন্য এবং এই “জানালা” অপারেটিং সিস্টেম চালনা করতে শেখানোর মাধ্যমে আসলে শিক্ষার্থীদের বাবা-মা/অভিভাবকদেরকে একপ্রকারে বাধ্যই করা হচ্ছে বাসা-বাড়ীতেও সেই একই প্রতিষ্ঠানের পন্য ব্যবহার করতে, অন্যথায় ঐ শিক্ষার্থীর শিক্ষার পরিপূর্নতা বাধাগ্রস্ত হবার ভীতি কাজ করছে। একরকম জোরজবরদস্তি মূলকভাবেই একটা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পন্যকে শিক্ষার্থীদের সামনে বাধ্যতামূলক শিক্ষা উপকরনরূপে উপস্থাপন করার দৃশ্য আর কোথাও কি আপনি দেখতে পান?

যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্যই মাইক্রোসফটের পন্যের বিপননে সহযোগীতা করে চলেছে, হয়তো মূল বিষয়টা সচেতনভাবেই এড়িয়ে গিয়ে কিংবা সেটা না বুঝেই, যেহেতু ঐ রাজ্য সরকারের উপরে এই প্রতিষ্ঠান তাঁদের দেয়া বিনামূল্যের পন্যগুলোর মাধ্যমে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছে। কেননা মাইক্রোসফটের প্রতিটা সফটওয়্যার/পন্যই মালিকানাধীন এবং আবদ্ধকৃত, যা কিনা “শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জন” এর সাথে পুরোপুরিই অসামঞ্জস্যপূর্ণ – “জানালা” সিস্টেমের ব্যবহারকারীরা আসলে দ্বিতীয় শ্রেনীর গ্রাহক বা অসচেতন ক্রেতা মাত্র। কেননা যখনই একজন ব্যববহারকারী এই “জানালা” সিস্টেমটা ব্যবহার করছে তাঁদেরকে আইনগতভাবেই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে বেঁধে ফেলা হচ্ছে যেনো নিজের চাহিদানুযায়ী বা কোন নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধানে এই প্রতিষ্ঠান ব্যতীত অন্য কোন সফটওয়্যার তাঁরা ব্যবহার না করতে পারেন, এমনকি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদা নিবারনেও বাঁধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। যেমন উদাহরন স্বরূপ বলা যেতে পারে যদি কেউ ইচ্ছে করে যে আসলে এই “জানালা” সিস্টেম, কোন ব্যবহারকারীর কাছ থেকে নির্দেশনা নেবার পর কিভাবে সেই নির্দেশনাটুকু প্রক্রিয়াকরণ করছে সেটা বিস্তারিত জানবে তো সেটা অসম্ভব, এমনকি এর সোর্সকোডটুকুও গোপন করে রাখা হয়।

শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহারের আসল উদ্দেশ্যই হলো জ্ঞানের ক্ষেত্রে পরিপূর্ন স্বাধীনতা অর্জন এবং তা সুদৃঢ়করণ, এটা নয় যে, কোন একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান কূটকৌশলের প্রয়োগে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখবার পথটুকু সুগম করে নেবে।

মুক্ত সফটওয়্যার গুলো এক্ষেত্রে সঠিক কাজটাই করে থাকে, যা একজন শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করে নিজের জ্ঞানার্জন প্রকিয়াটাকে সুদৃঢ় করতে, বিভিন্ন বিষয়ে নতুন নতুন দিক উন্মোচনের আর শিক্ষা গ্রহনের। আপনি হয়তোবা প্রশ্ন তুলবেন যে, “তাহলে মুক্ত সফটওয়্যার সহযোগে শিক্ষাক্রমের লক্ষ্যে ওএলপিসি বা ওয়াল ল্যাপটপ পার চাইল্ড প্রকল্পে কোন সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি প্রকাশিত হয়নি কেন?” ২০০৩ইং সালে এমআইটি’র প্রফেসর নিকোলাস নেগ্রোপন্টে এই প্রকল্পটি শুরু করেন এই লক্ষ্যে যে বর্তমানের শিশুরা আগামীর শিক্ষা ও প্রযুক্তির ছোঁয়া পাবে তথ্যপ্রযুক্তি আর জ্ঞানার্জনের স্বাধীনতার যুগ্মপৎ প্রয়োগের মাধ্যমে। সেই লক্ষ্যে এই প্রকল্প অতি স্বল্পমূল্যে যন্ত্র তৈরীর উদ্যোগ নেয় (শুরুর দিকের যন্ত্রটির নামকরণ করা হয়েছিলো এক্সও/যো/XO) যেনো লক্ষাধিক শিশু এই যন্ত্রটি ব্যবহার করে সুবিধাভোগী হতে পারে এবং তাতে প্রযুক্ত করা হবে মুক্ত সফটওয়্যার যেনো তাঁরা নিজেদের অর্জিত জ্ঞান এবং মানোন্নয়নকৃত সফটওয়্যার একে অপরের সাথে পছন্দানুযায়ী বিতরন বা শেয়ার করতে পারে। আরো জানতে দেখুন: http://laptop.org/en/vision

তো ঠিক এই পর্যায়ে এসেই মাইক্রোসফট এতটাই চাপ প্রয়োগ করতে থাকে এই প্রকল্পে যে নেগ্রোপন্টে এই প্রকল্পের মূল যে লক্ষ্য সেই স্বাধীনতা বা মুক্তপ্রযুক্তি’র প্রতিশ্রুতিটুকু থেকে পিছিয়ে এসে ঘোষনা করতে বাধ্য হন যে এই প্রকল্পের যন্ত্রগুলোয় স্বাধীনতা খর্বকারী “জানালা এক্সপি” চালানোর ব্যবস্থাও রাখা হবে। (http://www.olpcnews.com/files /microsoft_emails_on_olpc.pdf )

মাইক্রোসফট শুধু এই হুমকি প্রদানের মাধ্যমেই ক্ষ্যান্ত দেয়নি, বর্তমানে মাইক্রোসফটের লক্ষ্য সেই সকল দেশের সরকার যাঁরা এই XO বা যো নামের যন্ত্রগুলো কিনছে, যেনো সরকারের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করিয়ে ওই যন্ত্রগুলোর মধ্যকার মুক্ত সফটওয়্যারগুলোকে “জানালা” এবং সহায়ক মালিকানাধীন সফটওয়্যার দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায়। মাইক্রোসফট এই উদ্যোগে কতটুকু সফল, তা আগামীই বলে দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত করেই বলা যায় যে নিজের পুরো ক্ষমতাটুকু খাটিয়ে এই হুমকি প্রদানের মাধ্যমে মাইক্রোসফট এমন একটি প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করেছে যা কিনা ইতোমধ্যে দশ লক্ষ হতদরিদ্র শিশুর জন্য বিশ্বজুড়ে বিতরন করা হয়েছিলো স্বল্পমূল্যে এবং মুক্ত সফটওয়্যার চালিত প্রযুক্তিতে এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ঐ শিশুদেরকে এখন নিজের পন্যের প্রতি একান্তই নির্ভরশীল করবার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। ওএলপিসি প্রকল্পে এই হুমকি প্রদান হচ্ছে এমনই একটা উদাহরন যার মাধ্যমে মাইক্রোসফট প্রমাণ করেছে যে, মাইক্রোসফট কিভাবে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকারকে এই ভ্রান্তধারনার প্রতি অনুরক্ত করে থাকে যে, কম্পিউটার প্রযুক্তির ব্যবহারে শিক্ষা মানেই হলো “জানালা” অপারেটিং সিস্টেম ও অন্যান্য সকল অনুষঙ্গ সফটওয়্যার।


“আমাকে অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাতে হচ্ছে মিঃ ক্রাইষ্ট. যে আপনি শুধুমাত্র দুইটি মাছ ও পাঁচটুকরো রুটির জন্যেই আমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ। অন্যরা বেশী কিংবা কম যা খুশি পান না কেন, আপনি এর বেশী আর কিছুই পেতে পারেন না।”

সমগ্র বিশ্বকে এই ভয়ংকর অবস্থা থেকে বের করে নিয়ে আসতেই মুক্ত সফটওয়্যার ফাউন্ডেশন(Free Software Foundation বা FSF) কাজ করে যাচ্ছে।

বাঁচতে হলে জানতে হবে, শিখতে হবে, বুঝতে হবে (পর্ব – ২) প্রকাশিত হবে আগামী ৫ই জানুয়ারী ২০১২ইং, বৃহস্পতিবার রাত্রে।