ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

 

ঈদের ছুটিতে বেশ ঘুরলাম । এখানে সেখানে ,বন্ধুর বাসায় , রাস্তায় , পাহাড়ে , এবং মাঝে মাঝে বিভিন্ন ক্যাম্পে। ভালোই কেটেছে সকলের আন্তরিক সান্নিধ্য আতিথেয়তা । আজ সকালে ফিরে এলাম নিজের নির্জন গুহায় ( যেখানে আমি থাকি সেখানটা আমার কাছে এমনি মনে হয় ) । দুই’জন স্বদেশী আর বাকিরা অন্যান্য দেশের । তাই আমার আবাস স্থল আমার কাছে গুহার মতই লাগে বৈকি ।

রাস্তা দিয়ে আমাদের গাড়ী চলছে বেশ স্পীডে। রাস্তার পাশে হলুদ পোশাক পড়ে কাজ করছে অবিরত বাংলাদেশী শ্রমিক । শহরতলী পেরিয়ে দেখলাম একজায়গায় জটলা করে আছে হলুদ পোশাকের দল । গাড়ী তাদের সামনে গিয়ে থামল । অনেকে সৌদি ভেবে এগিয়ে এল সাহায্যের জন্য । কিন্তু আমাকে দেখে হতাশ হল । গাড়ী থেকে নেমে সকলের সাথে করমর্দন করলাম। সবাই লজ্জা পাচ্ছে বুঝতে পারলাম। কি ব্যাপার আজ ঈদের দিন তোমাদের ছুটি নেই । সমস্বরে সকলে না বলে উঠল । এরা সকলে সিটি কর্পোরেশনের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মী , যাদের কাছে ঈদ মানে ও কাজ । কোনপ্রকার ছুটি নাই । রোদেলা শহরে পিচঢালা রাস্তায় তারা নিয়মিত কাজ করছে । এরা সকলেই বাংলাদেশী । এখানে অন্য দেশি কোন লোক নাই দেখে নিজের কাছেই খারাপ লাগল । অনেকের সাথে কথা বললাম ।

এখানে আসার আগে কেউ জানত না সে এই কাজে আসছে । এখানে এসে বিপদে পড়ে অনিচ্ছা স্বত্বে ও তাকে এই কাজ করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত । জুনায়েদ নামের এক জন বলল , “যখন কোন বাংলাদেশিকে দেখি তখন বেশ লজ্জা লাগে এই কাজ করতে কিন্তু কি করব আস্তে প্রায় চার লক্ষ টাকা লেগেছে সেই টাকার মায়ায় পড়ে এই কাজ করছি “।

আজতো ঈদের দিন তারপর ও কাজ করতে হচ্ছে কিন্তু আমাদের এই দুঃখ দেখার কেউ নাই –বললেন কলিম উদ্দিন উনি টাঙ্গাইল থেকে এসেছেন আজ তিন বছর হল ।

প্রস্তাব দিলাম তাদের ক্যাম্পে যাবার জন্য তারা সানন্দে রাজী হল । অনেক বড় ক্যাম্প। দুই হাজারের ও বেশী প্রাবাসির অবস্থান সেখানে । থাকার জায়গা অনেকটা তাবুর মতই । এদের বেশির ভাগ শ্রমিকের বেতন মাত্র ৩৫০ রিয়াল। যা কিনা অন্য প্রবাসির একমাসের খানা খরচের সমান । তাদের কে ক্যাম্পে খাবার দাওয়া হয় কিন্তু এর মান এত নিম্ন মানের যে পারত পক্ষে কেউ সেখান থেকে খায়না । এসব শ্রমিক বেশিরভাগই অনায়াসে হাতপেতে নেয় বাইরে থেকে । এটা তাদের অভ্যাস হয়ে গেছে । জিজ্ঞেস করলাম দেশের সাথে যোগাযোগ কেমন তখন তারা যা বলল তাতে মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল ।

” আমি এখানে কেমন আছি তা জানতে চায়না আমার পরিবার । তারা ভাবে আমি বেশ আমোদ ফুর্তিতে আছি । তাদের প্রয়োজন টাকার , আমার খোজ খবর নেওয়ার দরকার তাদের নেই “বললেন মানিক গঞ্জ থেকে আসা রুহুল আমিন । ” এই দেশের দুতাবাস ও কোন দিন কোন খোজ খবর নেয়না আমাদের । আমরা অনেকটা অবহেলিতের মতই বেছি আছি । যারা বাইরে দুয়েকটা কাজ পায় তারা মোটামুটি ইনকাম করতে পারে নাহলে এই বেতনে আমার নিজের চলতে কষ্ট হয় আমি কিভাবে পরিবার দেখব । আজ সাড়ে তিন বছরে দেশে পাঠিয়েছি মাত্র ২ লাখ টাকা “বললেন সুমন কিশোরগঞ্জের ।

সন্ধ্যা নেমে এল আমার ফেরার পালা । মনে অনেকটাই কষ্ট নিয়ে আমি আমার গাড়ীতে ফিরে এলাম প্রশস্ত পিচঢালা রাস্তায় । আমার দেশের সূর্য সন্তানরা আমার পেছনে পড়ে রইল তাদের ক্যাম্পে এবং কেউ তখন ও রাস্তায় পরিস্কার কাজে নিয়োজিত । দুচোখের জল এমনিতেই গড়িয়ে পড়ল । তাদের খবর তাদের পরিবার রাখেনা , সেখানে আর কেই বা রাখবে । প্রতিদিন এমন হাজারো প্রবাসীর চোখের জলে কার কি আসে যায় । নাকি সরকারের নাকি আমার নাকি তারপরিবারের । সে এখানে মরু পথে একা এবং নিঃসঙ্গ মরুপথিকের ন্যায়।

Touhidullah82@gmail.com
রিয়াদ , সৌদি আরব থেকে ।