ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

১৯৯৬ সাল ঢাকায় বেড়াতে গেলাম ফুফুদের বাসায়। তখন ফুফাতো ভাই স্টোডিয়ামে নিয়ে গেলেন ক্রিকেট খেলা দেখতে । অনেক বেশী দর্শক মাঠে ছিলনা । আবহানী মোহামেডানের ম্যাচ দেখলাম মোটা শরীরের একজন নাদুস নুদুস লোক ব্যাটিং করছে । ফুপাতো ভাই পরিচয় করে দিল ইনি হলেন আকরাম খান। ক্রিকেট সম্পর্কে আমার জ্ঞান তখন সীমিত । দেশের বাইরে তখন আজাহার উদ্দিন এর নাম শুনেছি বাবার মুখে । এরপর আমি ও গ্রামে গিয়ে বন্ধুদের নিয়ে স্কুলের মাঠে ক্রিকেট খেলতে থাকি । তখন কিছু নিয়ম জানি কিছু নিয়ম জানি না ।

১৯৯৭ সাল মালয়েশিয়ায় আই সি সি ট্রপি টুর্নামেন্ট চলছে । বাংলাদেশ বেতার ধারাবিবরণী প্রচার করছে । এতে করে ক্রিকেট যে একটি খেলা তা গ্রামে গঞ্জে সব জায়গায় প্রচার হয়ে গেল । মানুষ ক্রিকেট নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন । রেডিও এর ধারা বিবরণী শুনে জানা গেল বাংলাদেশ এই টুর্নামেন্ট জিতলে বিশ্বকাপ খেলতে পারবে । সকলে প্রতিদিন আগ্রহ নিয়ে রেডিও শুনতে লাগলাম । হলান্ডের বিপক্ষে পরাজয়ের আশংকা যখন জেগে উঠেছিল তখন আকরাম খান হাল ধরলেন । অপারাজিত ৬৮ রান করলেন । আকরামের একটি ইনিংসের ওপরই তো দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট। ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফিতে হল্যান্ডের বিপক্ষে অপরাজিত ৬৮ রানের ওই ইনিংসটি না খেললে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন হারিয়ে যায়। বিশ্বকাপে গিয়ে পাকিস্তানকে না হারালে বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস দাবি করার সাহসও থাকে না। একটি মাত্র ইনিংসের এভাবে কোনো দেশের ক্রিকেট-ভাগ্য গড়ে দেওয়ার উদাহরণ আর নেই।

এরপরের ইতিহাস সকলের জানা । আকরামের ক্রিকেট অধ্যায় শেষ হয় বেশ কিছুদিন পূর্বে । এরপর ও জড়িত ছিলেন ক্রিকেটের সাথে । গত বছর নতুন দায়িত্ব ফেলেন । নির্বাচক কমিটির প্রধান হলেন । শুরু থেকেই বোর্ডের সাথে কম বেশী টানা পোড়ন হলে ও মুখ বুঝে রইলেন সুদিনের অপেক্ষায় । কিন্তু সে সুদিন আর আসে নি । অনেকটা সাহসের সঙ্গে তিনি নিজ দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করে দেশের কোটি ক্রিকেট প্রেমির কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দিয়ে গেলেন । এটি বাংলাদেশ । এখানে স্বাধীন ভাবে কাজ করার অধিকার কারো নেই । পুরো দেশ জানল এমনকি আধুনিক মিডিয়ার কল্যানে জানল পুরো বিশ্ব । সরকারের বড় বড় কর্তা ব্যাক্তিরা যথারীতি মুখে কুলূপ এটে বসে রইলেন নির্বিকার হয়ে । যেন কিছুই হয়নি । এর কারনে আমাদের ক্রিকেটের যে কতবড় ক্ষতি হয়ে গেল সেদিকে তাদের খেয়াল নেই । দল নির্বাচনে হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে প্রধান নির্বাচকের পদ থেকে পদত্যাগ ঘোষণা করছে আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষ আকরামের জয় হয়েছে । পরাজয় হয়েছে আমাদের দেশের হীনমনের রাজনীতির ।

দল নির্বাচনে বোর্ড সভাপতির সর্বশেষ হস্তক্ষেপকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখাটাও যেমন ভুল। এ ঘটনা অতীতেও নিয়মিতই ঘটেছে। নির্বাচকেরা ‘লড়াই’ করে কখনো জিতেছেন, কখনো আপসও করতে হয়েছে। কিন্তু নির্বাচকদের স্বাক্ষরিত চূড়ান্ত দল যখন তাদের না জানিয়েই বদলে দেওয়া হলো, আকরামের সামনে দুটি পথই খোলা ছিল। পদ আর সামান্য কিছু টাকার লোভে আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়া অথবা এই ক্রিকেটীয় রীতি-ভব্যতা না মানার প্রতিবাদ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। আকরামকে অভিনন্দন, তিনি সঠিক পথেই হেঁটেছেন।

গত বছর বিশ্বকাপের দল ঘোষণার আগে টেকনিক্যাল কমিটির সঙ্গে নির্বাচকদের ‘ধস্তাধস্তি’র কথা পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে। একে নিয়েছ কেন, ওকে কেন নাওনি—টেকনিক্যাল কমিটির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জবাবদিহি করাটা ‘নিয়ম’ ছিল আরও আগে থেকেই। বিশ্বকাপের সময় সেটি শালীনতার সীমাও অতিক্রম করে গিয়েছিল বলেই খবর হয়েছিল। কাগজে-কলমে টেকনিক্যাল কমিটি ভেঙে দেওয়া হলেও ছদ্মাবরণে সেটি এখনো বহাল। দল নির্বাচন করার সময় ‘একে নিলে তো অমুকে রাগ করবে’, ‘উনি তো ওকে নিতে বলে দিয়েছেন’ এসব অঙ্ক সব সময়ই মাথায় ঘোরে নির্বাচকদের। এর চেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার আর হয় না।
নির্বাচকদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার রীতিটা তো এমনিতেই হয়নি। কারণ এমন না হলে দল নির্বাচনের সময় নির্বাচকদের মাথায় নানা অঙ্ক খেলা করবে, ক্রমশ তাদের বিচ্যুতি ঘটবে পক্ষপাতহীন থাকার মূল মন্ত্র থেকে। সাহসী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহসও হারিয়ে যাবে। অথচ এই ক্রিকেট বোর্ডের কর্তাব্যক্তিদের তাতে থোড়াই কেয়ার! তাঁরা নির্বাচকদের ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে নিজেদের ক্ষমতা জাহির করায় ব্যস্ত। তাতে দেশের ক্রিকেট গোল্লায় গেলেও কিছু আসে যায় না।

আজ আকরাম খান চলে গেছেন প্রতিবাদ করে । কিন্তু আগামিতে নতুন যিনি আসবেন তিনি আকরামের মত হতে পারবেন ভাবার কোন কারন নেই । লোভ লালসা এবং ক্ষমতার জন্য হয়তো তিনি সব কিছু মেনে নিবেন । এতে করে কি হবে আমাদের স্বপ্ন দেখানো ক্রিকেট একদিন জিম্বাবুয়ের মত হয়ে যাবে । একসময় জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দল শক্তিশালী ছিল কিন্তু তাদের অভ্যান্তরীন কোন্দলের কারনে বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার খেলা ছেঁড়ে দিয়েছেন । আমি চাইনা আমাদের দেশে ও এমন হোক । সব কিছুর পর উচ্চস্বরে বলে যাব আকরাম খান এক মহান ক্রিকেট সৈনিক যার সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাস । আর যাই হোক ক্রিকেটের মঙ্গল আমরা সকলে কামনা করি , ক্রিকেটের অমঙ্গল আমাদের কারো কাম্য নয় । মাননীয় প্রধান্মন্ত্রী এখনি সময় এই দিকে খেয়াল দেবার , চুপ করে থাকার সময় এখন নয় ।