ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

প্রচন্ড ক্ষোভ থেকে লিখছি। আমার মধ্যে এখন একটা মন না। পাঁচ লাখ মনের ক্ষোভ ভিতরে এসে জমা হয়েছে। এতমনের ক্ষোভ নিজের মাঝে কি করে এলো সেটা আমি নিজেও জানি না।হয়তোবা সমাজ আমাকে দিয়েছে কিংবা সমাজের মানুষগুলো।

এই মানুষগুলোর মাঝে একটাই সমস্যা সেটা হচ্ছে তারা পড়ালেখাকে পুজো করে ধর্মের মতো কিংবা ধর্মের চাইতেও বেশি। এই পুজোর প্রসাদটা আমাদের একেবারে গিলে খাইয়ে দেওয়া হয়। এই পুজোর প্রসাদ আমাদের মুখের ভেতর এত তিতকুটে বিস্বাদ সৃষ্টি করে যে তা মনের মৃত্যুর পোয়াবারো ঘটিয়ে ছাড়ে। এই মানুষগুলোর মস্তিষ্কের নিউরনে কিভাবে কিভাবে যেন সিমেন্ট দিয়ে আটকে গেছে যে এইচএসসিতে গোল্ডেন পেয়ে মেডিকেলে কিংবা বুয়েটে না যেতে পারলে জীবন ব্যর্থ। মেডিকেল আর বুয়েট ছাড়া এই দেশে আর কোন স্কুল নাই, কলেজ নাই, বিশ্ববিদ্যালয় নাই, পড়াশোনা নাই কিচ্ছুটি নাই, কিচ্ছু নাহ! এখানে যারা পড়ে না তাদের জীবনের ভবিষ্যত নষ্ট। তারা সম্ভবত খেতে পারবে না, খেতে পারলেও সম্মান পাবে না, সম্মান পেলেও টাকা পাবে না, টাকা পেলেও শান্তি পাবে না। আমার ইচ্ছে করে এখনই যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটা রাইফেল লাইসেন্স করে আনাই কেননা সেখানে আগ্নেয়াস্ত্রের ওপর যথেচ্ছ লাইসেন্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং সেই রাইফেল আনিয়ে সমাজ দেবতার মাথার মধ্যে কয়েক রাউন্ড গুলি চালিয়ে নিজের মনের শান্তি মেটাই।

সেই শান্তিটাও সম্ভবত মিটবে না। কেননা তখনই আমাকে লেখার জন্যে আটক করা হবে, হাতের জন্যে শেকল পরানো হবে, মস্তিষ্কের জন্যে ডাক্তার ডাকা হবে। হোক না তাতে কি! আমি ব্লগে লিখি, আমার গল্প লেখালেখির প্রতিযোগিতাতে সেরা নির্বাচিত হয়, আমার একটা ই বুক পাবলিশ হতে যাচ্ছে সামনের মাসে, গণিত অলিম্পিয়াডের চট্টগ্রাম বিভাগের চ্যাম্পিয়ন আমি, এবারের জাতীয় পর্যায়ে সুডোকু চ্যাম্পিয়নও হলাম, বিতর্ক করি, সাব-৪০ রুবিকস কিউবার, রচনা প্রতিযোগিতাতেও সমান বিস্তার – এখন এইসব কিছুকে ইচ্ছে করছে আবর্জনা বাক্সে ছুঁড়ে ফেলে দিতে, সোজা ছুঁড়ে ফেলে দিতে। কেননা আর একটা বছর পরেই যখন হয়তোবা এ প্লাস পাব না, তাদের ধরে নেওয়া পুজনীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোতে হাঁটতে পারব না তখন আমার এসব পাওয়ার দিকে তারা চোখ খুলেও তাকাবে না। তখন এইগুলোই হয়ে উঠবে অভিশাপ। এই অভিশাপগুলোর জন্যে আমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার – আমি যেন বিয়ে টিয়ে করতে পারব না, চাকরি বাকরি করতে পারব না, দুই পয়সার পত্রিকায় সম্পাদক হয়ে ছাপোষাভাবে জীবন চালাব।

আমার এক মামা বইমেলা থেকে কেনা বইগুলো থেকে দেখে বলল, আমি এইসব কাজী নজরুল, কবি, টবিতে বিশ্বাসী না। এগুলোতে জীবন নষ্ট করিও না।

আমার এক স্যার আমার সাইকোলজি সম্পর্কে বেদম আগ্রহ এবং অনার্স লেভেলের মোটা মোটা সাইকোলজির বইগুলোর অধ্যায় শেষ করছি দেখে বলল, জীবনটাকে নষ্ট করিও না। তোমার মেধা আছে। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি তে ঢুকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িও।

প্রতিবারই আমি কিছু বলতে গিয়ে থেমে যাই। পাঁচ বছরের একটা বাচ্চা যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করে, ভালোবাসা কী জিনিস? আপনি হয়তোবা তাকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার স্বরুপ বোঝাতে পারবেন। কিন্তু ভালোবাসার সংজ্ঞা দিতে পারবেন না। সে বুঝবে না। এই মানুষগুলোও বুঝবে না। তারা অসুস্থ। তাদের মস্তিষ্ক অসুস্থ। তাদের কাছে জীবন মানে দৌড়াদৌড়ি করে হু হু করে বুঝে বা না বুঝে পড়াশোনা করা, তারপর একটা চাকরি খোঁজা, বিয়ে করা, বাচ্চাকাচ্চা নেওয়া এবং সেই বাচ্চাকাচ্চাগুলোর ওপর নিজের ব্যর্থতাগুলো চাপিয়ে দেওয়া। পারলে তো নিজের শান্তি। না পারলে গলাটিপে মেরে ফেলার অপশন তো খোলাই আছে।

এখন প্রশ্ন আসবে, তোমার এত ক্ষোভ কেন? তোমার কাজ ভালোভাবে পড়াশোনা করে মানুষের মতো মানুষ হয়ে বুয়েট, সাস্টে পদচারণা করা। আমার নির্লিপ্ত উত্তর- আমি, এই সাধারণ ছাত্র, পারছি না যে পারছি না। দেড় বছরে তেরটা বিশালাকৃতি বই আমার কোন উপকারেই আসবে না। এটা শিক্ষা না। এটা সময় নষ্ট করার ফেসবুকের মতোই আরেকটা উপকরণ। যে ছেলে সাহিত্যিক হবার স্বপ্ন দেখে তার জন্যে বোটানির দুইশ পঁচিশ নং পৃষ্ঠার সেই হাস্যকর ইংরেজী শব্দের বাংলা পারিভাষিক শব্দ মুখস্ত করার বিদ্যা কোন কাজে আসবে না, কোন কাজে আসবে না। আমাকে কোটি টাকা দিলেও আমি এর উল্টোটা কখনোই বলব না, বলব না, বলব না। তার সময় নষ্ট হচ্ছে, তার নিউরনের কনসেন্ট্রেশন কমে যাচ্ছে, তাকে বারবার সুইচ করতে হচ্ছে মনোযোগ, সে মরছে, আমরা তাকে মারছি। মেরে মেরে আবার তাকেই দোষ দিচ্ছি। বিল গেটসকে জিজ্ঞেস করা হলো, এই সময়ে আলাদিনের চেরাগ দিলে তিনি কী চাইতেন? তাঁর উত্তর; এনার্জি আর সময়। মানুষের হাতে সময় কম, শক্তি কম, অথচ মেধা অনেক। এইগুলোকে আমরা অদরকারি বোঝা দিয়ে চাপিয়ে দিয়ে নষ্ট করার তুষ্টিতে মেতে উঠেছি। কী দরকার? দরকারটা কী একটা সদ্য এসএসসি পাশ করা ছেলেকে কিংবা মেয়েকে একসাথে সাহিত্য পড়ানোর, ব্যাকরণ পড়ানোর, গণিত পড়ানোর, ইংরেজী পড়ানোর, পদার্থবিজ্ঞান পড়ানোর, রসায়ন পড়ানোর, উদ্ভিদবিজ্ঞান পড়ানোর, জীববিজ্ঞান পড়ানোর, তথ্যপ্রযুক্তি পড়ানোর? আমরা কী চাই? কী আমাদের লক্ষ্য? আমরা কি ভিঞ্চির মতো পলিম্যাথ বানানোর কারখানা খুলে বসেছি? না আইনস্টাইন, নিউটন, মেন্ডেল, হাইজেনবার্গ, রবি ঠাকুর, জাহেদ হাসানের সংকর বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত হচ্ছি?

চট্টগ্রাম কলেজে না পড়ে, নটরডেম কলেজে না পড়তে পরে জীবনের খুব বড় ভুল করে ফেলেছি? প্রতিনিয়ত আমাদেরই কেন শুনতে হচ্ছে- তোমরা বিষয়বস্তুর গভীরে ঢুকতে পারো না, তোমাদের ইংরেজী জ্ঞান এত অল্প, এই বোর্ডে আসা প্রশ্নটা না পারলে চকবাজারে এসে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝোলা উচিত, এইচএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস না পেলে পটিয়া কলেজের রহিমুদ্দি, সলিমুদ্দির সাথে তোমাদের কোন তফাত নেই…হাবিজাবি….কেন? কেন?

একটা সুস্থ মানুষ কয়টা বিষয়বস্তুর গভীরে ঢুকতে পারে এই প্রতিযোগিতাপূর্ণ সময়ে? একজন শিক্ষক যদি না বোঝে, নামকরা কলেজের শিক্ষকও যদি না বোঝে, একটি দেশের শিক্ষাপ্রণেতারা যদি না বোঝে, একটি দেশের শিক্ষামন্ত্রী যদি না বোঝে তবে সেই না বোঝাজনদেরকে বোঝানোর সাধ্য আমার মতো, আমাদের মতো আমছাত্রদের বোঝানোর সাধ্যি নেই। তখন এই অকার্যকর বিষস্বরুপ শিক্ষাব্যবস্থাকে লা’নত দেওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প রাস্তা থাকে না। এই দেশের ভন্ড বানানোর, মূর্খ বানানোর শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর লা’নত। যতদিন না এই পলিম্যাথ বানানোর কারখানা গুঁড়িয়ে দিয়ে একজনের ছাত্রে নিজের লক্ষ্যের দিকে নজর না দেওয়া হবে অন্তত পাঁচ লাখ সাধারণ শিক্ষার্থী সাধারণই থেকে যাবে। অসাধারণ হতে পারবে না।

আমার বন্ধুগুলো স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিয়েছে। মাঝে মাঝে আমিও ভাবি আমি কি ঠিক স্বপ্নটা দেখছি? এই স্বপ্ন দেখে ফায়দা কী? একটা ছেলে দৈনিক বিশ ঘন্টা পড়ে গেলো ইন্টারমিডিয়েট লেভেলে। তার ক্লাস টেন থেকে স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানের অনার্সের তকমাটা তার কপালে লেগে যাক। কিন্তু দেখা গেলো তার সুযোগ হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে আর পদার্থবিদ্যার সুযোগ এসেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে হাসবে না কাঁদবে? তার ক্লাস টেনের স্বপ্ন তার গলা জড়িয়ে বাঁচবে না মরবে?

বিজ্ঞান কেন শুধু? এই উদ্ভট শিক্ষা মস্তিষ্ককে এমনভাবে ধোলাই দিয়েছে যে মানুষ ভুলে গেছে সমাজবিজ্ঞান নামে একটা বিভাগের কথা, নৃতত্ত্বের আনন্দের কথা, মন নিয়ে কাঁটাছেঁড়া করার আধুনিক বিজ্ঞানের কথা। মানুষ ভুলে গিয়েছে বিজ্ঞানের বাইরেও অনেকখানি জীবন অনুন্মোচিত হয়ে আছে সেই দিকটির কথা। মানুষ, সমাজ তোমাকে কতবার মনে করিয়ে দিতে হবে? তোমার মনে হবার আগে আগে আমার ভেতরটা মরে যাবে নাতো?

আমি নিশ্চিত, এই মেরে ফেলার কাজটাও আমাদের আর করতে হচ্ছে না। জন্মদানকারী মায়েরাই সেই কাজটা সহজ করে দিচ্ছেন। তাহলে দেখুন, পড়াশোনা করতে হচ্ছে নিজের ইচ্ছার বদলে সমাজের ইচ্ছায়, মৃত্যুটাও আসছে সমাজের ক্ষোভের তোপে। তাহলে বেঁচে থেকে কী লাভ?

আমাদের বুকের ভেতর একটা নদী আছে। সেই নদীর স্রোত কোথায় গিয়ে তাকে ভেসে নিবে সেটা কেউ কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু এখন নদীর বুকে অনেক বালির বাঁধ। স্তুপাকৃত হয়ে জমা হয়ে আছে। স্রোত আছড়াচ্ছে, হাহাকার করছে। পার হতে পারছে না। চোখ থেকে শুধু পানি বের হওয়াই বাকি।