ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

একটু সত্যের সারকাজম থেকে ঘুরে আসি

চ্যাটিং, ফেসবুকিং, ইউটিউব।
লাইক, কমেন্ট, শেয়ার।
ফ্রেন্ডস, আড্ডা, গার্লফ্রেন্ড।

ব্যাস! এই তিনটা লাইনই যথেষ্ট। আর একটা বাড়তি লাইনও লেখার দরকার নাই আমার জেনারেশন বা ইয়ং জেনারেশনকে ব্যাখা করবার। ওদের লাইফ- ফিলোসফি বা জীবনদর্শন এই তিনটা লাইনকে ঘিরেই ঘুরপাক খায়।

আমি ইন্টারনেট বিরোধী নই, জেনারেশন বিরোধী নই, হুজুগের এক প্রান্তে আমি থাকি না। হুজুগ বলতে? এই দেশের মানুষের বৈশিষ্ট্য যেকোনো ইস্যুতে দুইভাগ হয়ে যাওয়া। একভাগ স্বপক্ষে গলা ফাটিয়ে চিৎকার চেঁচামেঁচি করবে। আরেকভাগ বিপক্ষে লাঠিসোটা নিয়ে তেড়ে আসবে। শুধু একটা ইস্যুই দরকার।

ক্যাফেইন খেয়ে খেয়ে মগজ আবার সজাগ হয়ে উঠেছে। তাই হাতও তরতরিয়ে এই ‘অ’ থেকে সেই ‘প’ তে ছুটোছুটি করছে। তো যা বলছিলাম, ইয়াং জেনারেশন।

এখন গার্লফ্রেন্ড মানে একটা পার্ট। প্রেম ভালোবাসা কয়েক মাইল দূরে রাখো। ছো ছো! প্রেম ভালোবাসা! সে আবার কী! গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ক্যাম্পাসে বাহুতে বাহু ধরে হাঁটাব। সবাই ড্যাবডেবে চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকবে। কেউ কেউ আবার নিজের কথা ভেবে ঈর্ষায় জ্বলেপুড়ে মরবে। আর মরুক না! এটাই তো মজা! পার্টও দেখানো গেলো আবার ফিলিংসও নেওয়া গেলো। বান্ধবীকে প্রেমের স্তরে নিয়ে কোন কোন বুদ্ধিজীবী আবার রোমান্সের নামে উপভোগও সেরে নেন। সব ঠিকঠাক থাকলে চলো একসাথে লিভ করি। আর বোর হলে হাত দুটো ছেড়ে দিয়ে দুইদিকে চলি। ভালোবাসা নামের বস্তু কিংবা আবেগটাকে খুন করতে করতে ওই সস্তা চটির বাজারে বিকিয়ে দিয়েছি আমরা। এখন ভালোবাসা গণিকাবৃত্তির মাধ্যমে নিজেকে বাঁচিয়ে ফেরে।

ভালোবাসাকে আপাতত একপাশে সরিয়ে রাখি। এবার আসি আমাদের জীবন সংগ্রামের কথা। লক্ষ্যের কথা। এ যে বড় লক্ষ্য। এই লক্ষ্যের জন্যে কত শ্রম, কত লেখালেখি, কত রাতজেগে আলাপ, নির্ঘুম চোখ, ব্রুঝাকের মতো বিদ্রোহী হয়ে ওঠা পরিবারের সাথে, প্রচলিত শিক্ষাকে ছুঁড়ে মারা আবর্জনার স্থলে। লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারলে আহা! কি খ্যাতি! লক্ষ্যটা কিন্তু খুবই সিম্পল। লাইকের সংখ্যাগুলোকে যত বাড়ানো যায়, কমেন্টের সংখ্যাগুলোকে যত বাড়ানো যায়। একবার সেলিব্রিটি হইতে পারো তোমাকে আর পায় কে! নাচো! গার্লফ্রেন্ড আর ল্যাপটপ নিয়ে প্রাণ খুলে নাচো! একটা পিক আপলোড দিবা আর তোমার সুনাম একেবারে অবাধ্য জলরাশির মতো ধেয়ে ধেয়ে আসবে। বাস্তব জীবনে কেউ না চিনলেও সমস্যা নাই। অনলাইন লাইফে তো তুমি সেরা! আর সেলিব্রিটির তকমাটা ধরে রাখবার জন্যে একটু অনলাইনে থাকিও। ডিএক্টিভ টিএক্টিভ হইলে মহা সমস্যা! রাস্তার চারশ বিশ ছেলেটার সাথে তোমার আর কোন পার্থক্য থাকবে না। পড়াশোনা বাদ দাও, কাজকর্ম বাদ দাও। টয়লেটে গিয়ে তোমার একটা স্ট্যাটাসেই কত আলোচনা। কোন পড়ুয়া আর কর্মঠ এই আলোচনা পাবে শুনি? সুতরাং এটাই তোমার জীবন লক্ষ্য! এর জন্যেই টাকা ইনভেস্ট করো, এর পিছনেই সময় ব্যয় কর। অং সান সুচির কথা মাথায় রাখলে চলবে না। তিনি ওসবের বিরুদ্ধে তো, তাইলে সোশ্যাল থেকে আনসোশ্যাল হতে বলেছেন। ছো ছো! ওসব কে মানে?

হায় বাংলা! হায় বাংলা! ক্রিয়েটিভ একটা অংশ বাদে আর বাদবাকি যে প্রতিনিয়ত চোখের সামনে ঘটে চলছে। জীবন দর্শন কোথায় গিয়ে ঠেকেছে! সত্যি ভাই, অপু-দুর্গার মতো দৌড়াদৌড়ি আমরা করি না ঠিকই, ছাদের ওপর বসে বসে আকাশ দেখি না ঠিকই, লুকিয়ে চুরিয়ে সেই দূরালাপনে প্রেমালাপ করা হয় না ঠিকই, লাইব্রেরি থেকে ভাদুড়ীর বই নিয়ে অখাদ্য বইয়ের ফাঁকে পড়া হয় না ঠিকই, বিকেলবেলা সবার সাথে সোফায় পা ভাঁজ করে বসা হয় না ঠিকই কিন্তু তাই বলে এত সস্তা দরের জীবন দর্শন আশা করা যায় না। কোনভাবেই না। সস্তা কেন বলছি? এই জেনারেশনের জ্ঞানের কোঠা যে খুবই ফাঁপা! টোকা দিলে ঠং ঠং করে বাজে। জ্ঞানফাঁকা কলসি নিয়ে কোন মানুষ কতদূর যেতে পারে। অনলাইনেও কলসি ভরানো যায়। অনলাইন হচ্ছে বিশাল একটা সাগর। কিন্তু সাগরের শুধু তীরেই আমরা কলসিটাকে ভরাই। তখন বালি ছাড়া আর কিছুতে কলসি তৃপ্ত হয় না। নিউটন নুড়ি পাথর কুড়িয়েছেন আর আমরা বালি ভরাই। বালি দিয়ে দিয়ে আমাদের মস্তিষ্ককে একেবারে ধু ধু মরুভূমি করিয়ে ছাড়ি। সেই মরুভূমিতে জীবন মানে ফেসবুক, প্রেম মানে গার্লফ্রেন্ড, সময় মানে আড্ডার মরিচিকাতে গা ভাসিয়ে ভাসিয়ে জীবনের আগাগোড়া রক্তাক্ত করে ছাড়ি।

(ফেসবুক সেলিব্রিটিদের গণহারে গালি দিচ্ছি না। এমন অনেক আছেন যাদের পোস্ট পড়লে সেভ করে রাখার ইচ্ছাটা দমানো যায় না। বারবার পড়তে ইচ্ছা করে। কিন্তু আগাছায় ভরপুর জায়গাটায় তাঁদের দেখা পাওয়াটা যে খুবই মুশকিল!)