ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

(Photo by Allison Joyce/Getty Images)

“উকিল তখন বলতে শুরু করে, – তোমারে সোলেমানের ব্যাটা ওসমানের লগে পঞ্চাশ ট্যাকা দেনমোহরে নিকাহ দিলাম। তুমি রাজি আছ?

একথা বোঝার বা বলার মধ্যে কোন নতুনত্ব নেই মায়মুনের কাছে। কথা কয়টা তার অনুভূতিকে একটুও নাড়া দেয় না। তোতা পাখিকে শিখিয়ে দিলে সে যেমন বলে, মায়মুনও তেমনি মা-র কথা অনুসরণ করে।

-রাজী আছি।

সাক্ষী ও উকিল পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। জয়গুন এক গ্লাস শরবত মায়মুনের হাতে দিয়ে বলে, -নে লক্ষ্মী, এক চুমুক খাইয়া গেলাসটা দিয়া দে।
উকিল সরবতের গ্লাস নিয়ে সাক্ষীর সাথে বিয়ের মজলিশে চলে যায়।”

এ অংশটা কালজয়ী উপন্যাস “সূর্য দীঘল বাড়ি” থেকে নেওয়া। উপন্যাস আলোচ্য বিষয় নয়। আলোচ্য বিষয় বিয়ে আর একটুখানি সোশ্যাল সাইকোলজি। এই যে বিয়ের পটভূমি সেটা ছিলো দেশভাগের উত্তরকালীন সময়কালের আবহে। তখন বাল্যবিবাহ প্রথা চালু ছিলো। সাত বছরের মেয়ে, দশ বছরের মেয়ের বিয়ে দিয়ে মায়ের হাঁপ ছেড়ে বাঁচাটা ছিলো নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।

সময় পাল্টেছে। অনেকখানি। বিয়ে করবার ধরণ ধারণও পাল্টেছে। নিকাহ, বিয়ে, বিবাহ, গাঁটছড়া বাঁধা সবকিছুর মূলকেন্দ্রেই থাকে একটা পরিণত ছেলে আর একটা পরিণত মেয়ের আজীবন বন্ধন তৈরী। কিন্তু এর আশপাশের আনুষাঙ্গিকতা আর আয়োজনের ব্যতিক্রমী ধরণ প্রতিটি বিয়েকেই আলাদা একটা সোশ্যাল ফেস্টিভালের রূপ দেয়। আপনি র‍্যাডিসন ব্লুতে হওয়া বিয়ে আর মডারেট একটা কমিউনিটি সেন্টারে আকাশপাতাল পার্থক্য দেখবেন। আর যদি একটা বস্তিতে অনুষ্ঠিত হওয়া বিয়েতে উঁকি দেন তবে সেই পার্থক্যটা সাত আসমান জমিন ফারাক হয়ে দেখা দিবে।

জন্মটা এখানে হওয়ায় চট্টগ্রামে আলহামদুলিল্লাহ অনেক বিয়ের দাওয়াত রক্ষা করার সুযোগ হয়েছে। সেইসব দাওয়াতের জায়গাগুলো? বাদ ছিল না কিছুই। বাসার বুয়ার ছেলে থেকে শুরু করে মাসে তিনবার চারবার বিদেশে ঘুরাঘুরি করা মানুষদের বিয়েতে গিয়েছি। দেখেছি অনেককিছুই। র‍্যাডিসন, সোনারগাঁ, আগ্রাবাদ, পেনিনসুলা এ ধরণের হায়ার ক্লাস ক্লাব, বিয়ের ঘনঘটায় আভিজাত্যের ছোঁয়া পাওয়া যায় ঠিকই তবে একটা জিনিস মিসিং থাকে। কি সেটা একটু পরে বলছি। সেখানে আপনার জন্যে ওয়েটার, টেবিল বয় চেয়ার টেনে দিয়ে আপনাকে বসিয়ে দিবে, কোলের ওপর ন্যাপকিন সাজিয়ে দিবে, কথায় কথায় স্যার স্যার করে টিপস পাবার সেই পুরোনো তোষামোদের জায়গাটা ভরিয়ে দিবে। আপনি উৎফুল্ল হবেন। নিজেকে কেউকেটা ভাববেন। খাওয়া দাওয়া হবে দস্তুরমত চমৎকার! কাঁটা চামচ, ছুরির টুংটাং শব্দ দারুণ একটা অর্কেস্ট্রা তৈরী করবে। আভিজাত্য, এ্যারিস্টোক্রেটিক মনোভাব আপনাকে ক্ষণে ক্ষণে ছুঁয়ে যাবে।

কিন্তু সেখানে নি:শব্দতা ভরাটভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। কথা বললেও আস্তে আস্তে, শান্ত স্বরে বলা লাগে। একটা রুল সেখানে চলতে থাকে। সোশ্যাল রুল? বলা যায়।

এসব ব্যাপার আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। আসলেই যে একটা নামিদামি রেস্টুরেন্ট কিংবা ক্লাব, অনুষ্ঠানে আলাদা রুলস থাকে। একটা মজার পদ্ধতি প্রয়োগ করে এসব রুল গুলো সবার চোখের সামনে ধরিয়ে দেওয়া যায়। কিভাবে? সবাই নিশ্চুপ, নিরবতা বজায় রেখে কাঁটাচামচের অর্কেস্ট্রা তুলছে। এইসময় হঠাৎ আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম কিংবা সবার সামনে হাতা দুমড়িয়ে হাবাতের মতো খেতে লাগলাম। সবাই আমার দিকে তাকাবে। এক মূহুর্ত তাকিয়ে হয় হাসবে না হয় ইগনোর করবে। এটাই স্বাভাবিক। কেন তাকালো? কেন ইগনোর করলো? কেন হাসলো? কারণ, ততক্ষণে সবাই বুঝে গেছে কিছু একটা গড়বড় হয়ে গেছে। এতক্ষণ আমরা যে পরিবেশে ছিলাম, বকবক করছিলাম (?), খাচ্ছিলাম সেই পরিবেশের সিস্টেমে একটা গোলমাল হয়ে গেছে। এখানে তো এভাবে কেউ হাসে না, হাত দিয়ে গপাগপ করে খানা সারে না। এই যে! রুলগুলো কিভাবে ধরা দিলো চোখের সামনে। এটাকে বলে গারফিংক্লিং করে সোশ্যাল রুল বের করা।

সাইকোলজি টানছি না। শুধু দেখাতে চাচ্ছি বাংলাদেশের বিয়ের ধরণ ধারণ কতটা বৈচিত্র্যময় এবং কত ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে তা বিভিন্ন নিয়ম ধারণ করে। একেবারে নিম্ন আয়ের একটা পরিবারের দিকে নজর দেওয়া যাক। অভিজ্ঞতা টানা যায় আবার উপন্যাসও টানা যায়। এ ধরণের বিয়েতে হইহল্লা, উদ্দাম আনন্দ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে পুরো আয়োজনে। থেকে থেকেই চিৎকার চেঁচামেচি। মাঝে মাঝে অদ্ভুত পোশাক পরা ব্যান্ডের দল উচ্চস্বরে বাজনা বাজবে। সবমিলিয়ে জমজমাট পরিবেশ। এই জমজমাট, চিৎকার চেঁচামেচির ন্যাচারাল আনন্দপূর্ণ পার্টটা অভিজাত জায়গায় মিসিং থাকে। সেখানে ফরমালিটি অনেককিছুই কন্ট্রোল করে। সেখানে মেজবানের মতো মাংসের বাটি নিতে হুড়োহুড়ি লেগে যায় না, হলুদ লাগা গ্লাস থাকে না… ওই অংশটা, মায়মুনার কাহিনীই ধরি। শোল মাছ আর কদুর ঘন্ট, পানি পানি ডাল, দুধ-বাতাসা। ব্যস! বরপক্ষের লোকদের জন্যে আপ্যায়ন এভাবেই সাজিয়েছিলো সূর্য দীঘল বাড়ির জয়গুনরা। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় যাদের অবস্থা তারা এর বেশী ভাবতে পারে না। বিশেষত সেই তেতাল্লিশের মন্বন্তর থেকে সদ্য পার হওয়া অর্থাভাবে গড়িয়ে চলা সংগ্রামী পরিবার থেকে এর চেয়ে বাড়তি কিছু আশা করা ভয়াবহ অন্যায়ও বটে। এই যে স্বল্প, অনাড়ম্বর আয়োজনের মধ্যে কিশোরী মেয়েকে (উপন্যাস) বরের হাতে তুলে দেওয়া (তা শুধু পঞ্চাশ বছর আগে কেন, এখনও আছে) এও এক ধরণের আয়োজন বটে। এখন মায়মুনার জায়গাটিই না হয় কল্পনা করি। মৌলবি, গদু প্রধাণ সবাই হাত দিয়ে, লুঙ্গি কোঁচা মেরে পানি পানি ভাত তারিয়ে খাচ্ছে আর মসজিদে জুতো চুরি নিয়ে গল্প সারছে সেই তখন স্যুট, বুট পরে আমি যদি দরজা দিয়ে প্রবেশ করি মানুষের ভাত খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে, বিয়ের কার্যাদি স্তিমিতনেত্রে তাকাবে, মায়মুনা পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিবে। কেন? কেননা আমি তাদের এই বিশেষ সোশ্যাল রুল যেটা তারা নিজের অজান্তেই বছরের পর বছর লালন করে যাচ্ছে সেটা ভেঙ্গে ফেলছি। রুলটা কী? রুলটা হচ্ছে ওরকম একটা পরিবারের ছোট্ট অনুষ্ঠানে সবাই জেনারেলি এটাই আশা করে অন্তত সবার পোশাক আশাক, চাল চলন, খাওয়াদাওয়াতে একটা দৈন্যতা কিংবা গ্রাম্য তারা সবসময় যেটাতে অভ্যস্ত সেটা লেগে থাকবে, ফুটে থাকবে। এমতাবস্থায় অন্য পোশাক, বেশভূষা নিয়ে তাদের অবচেতনে গড়ে ওঠা সামাজিকতা অনেকখানি বিঘ্নিত হয়েছে।

বিয়েশাদির এইরকম অনুষ্ঠান আমাদের দেশে তাই অনেকখানি বৈচিত্র্যের। বিভিন্ন ক্লাস, বিভিন্ন রুল নিয়ে আমাদের সমাজ একটা ছেলের সাথে একটা মেয়ের গাঁটছড়া বেঁধে দেয়। তবে আনন্দের কোন হেরফের হয় না। আনন্দ, আনন্দই। সে আনন্দ কখনো চোখের পানি হয়ে বের হয়, কখনো হাসি হয়ে বের হয়। জয়গুন তার মেয়ে মায়মুনাকে বিদায় দিতে গিয়ে যেমন বাষ্পায়িত চোখ ধরে রাখতে পারে নি তেমনি এখনও একটা মধ্যবিত্ত ঘরের মাও যে কিনা বছরের পর বছর তার মেয়েকে খাইয়ে দাইয়ে বড় করে তুলেছে তাকে বিদায় দেবার সময় না সংযম রাখতে পারতে কম্যুনিটি ক্লাবের সিঁড়িতে বসে গিয়ে অঝোরে কাঁদতেও দ্বিধাবোধ করে না। মায়মুনা তার শ্বশুর আব্বার কোলে চড়ে যেতে যেতে যেমন নতুন পরিবেশের ভাবনা ব্যাকুলতায় চিন্তিত না হয়ে পারেনি তেমনি এখনও ফুলওয়ালা কালো গাড়িতে বসে বসে উর্মি নামের একটি মেয়েও সেই মিশ্রিত ভয়, আনন্দ, উত্তেজনা নিয়ে স্বামীর হাত চেপে ধরতেও ইতস্তত করে না।

এবং আমার বিশ্বাস ষাট বছর পরেও করবে না। কারণ বাংলার এসব প্রাণবন্ত জায়গাগুলো আমাকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে। তবে সেই বিশ্বাসের কয়েকটা জায়গায় ঘুন ধরতে শুরু করেছে এখনই। যখন দেখি নতুন মেয়েটি যে কিনা স্ত্রী হতে চলেছে একজনের, সেই ছেলেটিকে নিয়ে বিদায়লগ্নে চিন্তাহীন মাত্রায় সেলফি তুলে, তখন অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির মা, প্রকৃতই বেদনায় কাঁদা উচিত না আনন্দে হাসা উচিত এই জিনিসটি ভাবতে থাকে- সেই সময়টিতে মনে হয়, নাহ! এইসব আবেগবিহ্বল দিন বুঝি গেলো! সময়টা পাল্টে গেছে। দিয়েছে পাল্টে সমাজকে। মনকেও। অনেকভাবে। বাবার থেকে বন্ধু, মায়ের থেকে প্রেমিকা যখন অনেক অনেক প্রিয় হয়ে দাঁড়ায় তখন সেখানে পরিবারের টান থাকে না, থাকে না সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। যা থাকে তাহলো ‘অনলি এনজয়’ করার প্রবৃত্তি।

বিয়েশাদি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সোশ্যাল রুল চলে এলো। কয়েকটা চিন্তা করার মতো প্রবলেম রেখে যেতে চাই। নিতান্তই সহজ। সোশ্যাল সাইকোলজির আলোকে কিংবা সোশ্যাল সায়েন্সের আবহেই করছি।

১. ধরুন আপনি আপনার বস থেকে বড় একটা রেস্টুরেন্টে বিয়ের ইনভাইটেশন পেলেন। সেখানে আপনি যখন যাবেন আপনার প্রোমোটিং এর বেশকিছু চান্স আছে আবার ভালো ভালো কিছু ব্যক্তিবর্গের সাথে আলাপ করারও সুযোগ আছে। সেক্ষেত্রে আপনি আপনার বসকে বলতেই পারেন, ধন্যবাদ স্যার। ইনভাইট করবার জন্যে।

সেই আপনাকে যখন আপনার গাড়ির ড্রাইভার তার বিয়েতে দাওয়াত করে এবং আপনি যখন দাওয়াত কবুল করে তার বিয়েতে যান তখন উল্টো আপনাকে সেইই ধন্যবাদ জানায়। কোন জায়গাটায় এই পার্থক্য সূচিত হয়েছে এবং কেন? চিরায়ত চলে আসা দুই পরিস্থিতির দুই ধরণের সোশ্যাল রুলস এই দুই ঘটনার কোনটিতে কি লঙ্ঘিত হয়েছে?

২. লাক্সারিয়াস জায়গাগুলোতে গারফিংক্লিং করে অনেক উদ্ভট পরিস্থিতির সৃষ্টি করা যায়। তখন হামবড়া ভাব নিয়ে বসে থাকা স্যুটেড বুটেড মানুষগুলো আপনার দিকে তাকাবে, হাসবে কিংবা ইগনোর করবে। কিন্তু খানিকটা লোয়ার ক্লাস যেমন আমার বুয়ার বিয়েতে যেটা কিনা একটু কম অবস্থাপন্ন জায়গায় সংঘটিত হচ্ছে, একটু দরিদ্র ধরণের… সেখানে সবার থেকে ব্যতিক্রমীভাবে কাঁটা চামচ, ছুরি দিয়ে আমি যদি খাওয়া শুরু করি (এবং গারফিংক্লিং করছি) তাহলে সেই বিয়ের বেশিরভাগ মানুষগুলোর প্রতিক্রিয়া কিরূপ হবে? এবং এই প্রতিক্রিয়া আগের লাক্সারিয়াস জায়গার প্রতিক্রিয়াগুলো থেকে কিভাবে আলাদা?

(সোশ্যাল রুল/সামাজিক কানুন: অবচেতনে মানতে থাকা বিশেষ বিশেষ সমাজের স্বতন্ত্রভাবে গড়ে ওঠা নিয়মনীতি। যেমন, গ্রামাঞ্চলে লোকসম্মুখে প্রেমিকার হাত ধরে হাঁটা দৃষ্টিকটু। যেটা ঢাকা শহরে খুবই সাধারণ। এবং আমরা এ বিষয়ে কেউ তেমন চিন্তাও করি না।

গারফিংক্লিং: সোশ্যাল রুল/সামাজিক নিয়মনীতিগুলো চোখের সামনে নিয়ে আসা, আবিষ্কার করা। যেমন আপনি যদি অন্তর্বাস প্যান্টের ওপর পরে রাস্তায় রাস্তায় হাঁটেন শত শত মানুষ আপনার দিকে হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকবে। প্যান্টের ওপর অন্তর্বাস পরার কথা কেউ ভাবতেও পারে না কেননা এটা একটা সোশ্যাল রুল যে অন্তর্বাস প্যান্টের ভেতরেই পরতে হয়। আর এই যে বিপরীত একটা কাজের মাধ্যমে এটা বের করা হলো এটাই গারফিংক্লিং। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী হ্যারল্ড গারফিংকল এই বিষয়ে গবেষণা করে নাম কুড়িয়েছিলেন। তার নামে টেকনিকটার নাম রাখা হয়েছে।)