ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

সাহিত্য দিয়ে শুরু

এদিকে মারামারি হয় না?
প্রশ্নটা শুনে ছেলেটা একগাল হাসে।
আর মারামারি! দুই তিনজন লেগে গেলে দশ বারোজন বলে, ছুটা ছুটা!

উত্তরের ধরণধারণ আমার কাছে তো জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরে থাকা কান্ট্রিসাইডের কোন নিদর্শন। সে কি সত্যিই বলছে? এখানে দশ বারোজন দৌড় দেয় মারামারি ছুটাতে?

কদিন আগেই আমার কলেজ এরিয়াতে মারাত্মক সংঘর্ষ হলো। নগরীর প্রসিদ্ধ চকবাজার এলাকায়। শিবির, লীগ, পুলিশ মিলে কি হাতাহাতি! হাজার রাউন্ড গুলি। এসএসসি ছাত্রের মৃত্যু। পরিবারে শোক। এলাকা শূণ্য। সবাই নিজ নিজ জান নিয়ে ঘরের দরজায় গিয়ে বলছে, আল্লাহ! ভালো বাঁচা বাচিয়েছ।

আর এখানে নাকি মাসে দুই একটা ছোটখাট সংঘর্ষ। ইউনিয়ন পৌরসভা নির্বাচন সামনে। তুমি যদি দশ মিনিট হাঁটো তবে দু একটা বাড়িতে দেখবে পোস্টার ছেয়ে আছে। তবে উন্মুক্ত আকাশ, আমগাছ, ক্ষেতের শুষ্ক পবিত্রতাকে তা বিন্দুমাত্র স্পর্শ করতে পারে নি।

এ নিসর্গ যদি হয় তিনশ ষাট ডিগ্রী, আমি হচ্ছি তার এক ডিগ্রী।

আমি পিচঢালা পথ ধরে হাঁটি। দুইপাশে একশ আশি ডিগ্রী জুড়ে খোলা আকাশ, আর আশপাশে তিনশ ষাট ডিগ্রী জুড়ে ধানকাটা ক্ষেতের সবুজ, সবুজ এবং সবুজ। সোজা, পরিপাটি কালো গেঞ্জি পরে যখন পা চালাই তখন কুন্ঠা বোধ হয়। কিভাবে একজন আর দশজনের সাধারণ বেশের সাথে মানিয়ে নিতে পারে? আমি কি এখন আমার কালো ব্র্যান্ডেড গেঞ্জিটাকে ঘাসের সাথে ঘষে নিব? তাতে আমিও সাধারণ সাধারণ দেখাব? কেউ আমাকে মাস্টার মাস্টার বলবে না, চোখের চশমার দিকে তাকিয়ে থাকবে না…।
তারা হাঁক ছাড়ে, 'মাষ্টার! মাষ্টার! তোমার দেশ কোথায় গো?'

গ্রামে এবং আশপাশের আরো বেশ কয়েকটা গ্রামে শান্তি আর শান্তি। এত শান্তি তা ভাষায় প্রকাশ করবার মতো না। এখানে জীবনদর্শন খুবই সিম্প্লিফাইড। আমার থেকে দুই তিন বছরের ছেলেপুলেরা বিয়ে থা করে বসে আছে। ধানসুরা মোড়টাতে ব্যবসা করে, দোকানে বসে। না হলে বাপের ধানি জমিটাতে গতর খাটে। আর মেয়েরা তো আরো সিমপ্লিফাইড। এসএসসি, এইচএসসি পাশ করবার পর সেখানে জীবনের আল্টিমেট এইম বিয়ে করা। বিয়েতে তাদের আসল প্রাপ্তি অপেক্ষা করে।

তবে কি এই গ্রামে যৌতুক, বাল্যবিবাহ, অশিক্ষা এসব গেড়ে নেই? তাহলে কোন যুক্তিতে আমি শান্তির গ্রাম বলছি? যৌতুক আছে। বাল্যবিবাহও আছে। পঞ্চাশ বছর আগের মতো অতটা প্রকটভাবে না। সেই অপ্রকটতাই মৃত্যুর হার কমিয়ে দিয়েছে। গ্রামের অনেক মেয়েই শিক্ষিত পরিবারের সাথে সম্বন্ধ করে মফস্বলে, একটু আধাউন্নত শহরে পাড়ি জমায়। শিক্ষা? এসএসসি, এইচএসসি কিংবা ডিগ্রী… ওটাতেও স্বচ্ছন্দতা। নির্ঝঞ্চাট জীবনযাপন বিদ্যমান।
বৎসরে বৎসরে মেলা কিংবা চায়ের স্টলে টিভির সিনেমা তাদের বিনোদন। ইলেকট্রিসিটি, এনার্জি বাল্ব, তিন ব্লেডের পাখা তাদের বিলাসিতা। তারা শান্তিতে আছে। পলিটিকাল দাঙ্গা নেই, খুনি মনস্তত্ত্ব নেই, স্বার্থের চর্চা নেই, লোভের ফনাও নেই। তারা শান্তিতে আছে। বড় শান্তিতে আছে।

শান্তি, অশান্তি

সাহিত্য শেষ? 🙂

হ্যাঁ। এবার আসুন। বিষয়টাকে সাইকোলজিকালি চিন্তা করি। আমরা যারা শহর বাজারে রিযিকের খোঁজে গুমরে গুমরে, হা হুতাশ করে মরি তারা একটু চিন্তা করি তো এরা এত শান্তি কোত্থেকে পায়? কিংবা আপনি আমাকেই কাউন্টার এ্যাটাক করতে পারেন- আমি কি করে বলি যে তারা অশান্তিতে জীবনযাপন করে না? তাদের বছরের পরিশ্রমের ধান যদি এক ঝড়েই কুপোকাত হয় তাহলে তাদের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা কি আমি ভেবে দেখিনি? কিংবা আমি কিভাবে বলি যে তাদের প্রেম পিরিতির জ্বালা নেই?

ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্বকে সরিয়ে রেখে যদি সামষ্টিক মনস্তত্ত্ব বিবেচনা করি তাহলে আমরা গ্রামের মানুষের নিশ্চিন্ত জীবনযাপনের পক্ষেই যাব। আমাদের এখানে (শহর- ঢাকা, চট্টগ্রাম) কোন দিনই আমরা নিশ্চিত নই যে আরেকটা খুন কিংবা ধর্ষন হচ্ছে না। আমরা প্রেমে ব্যর্থ হই বটে এবং এর জ্বালা তীব্র তাও সত্যিই কিন্তু আমরা এটাও খুব ভালোভাবে জানি যে আমাদের ভালোবাসার অভাব নেই। আমরা বয়ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ডকে মানিব্যাগের মতো চেঞ্জ করি। তিন চারটা প্রেম করা মেয়ে, ছেলে সমাজে কত যে অশান্তি ছড়াচ্ছে, প্রি – ম্যারেজড সেক্সের ফলে কতশত ফ্যামিলি ভাঙছে, নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি কিভাবে আমাদের মা বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাচ্ছে, কত পরকীয়ার বিষ স্বামী -স্ত্রীর সম্পর্ক নষ্ট করছে তা আমরা দেখি, খুব ভালো করেই দেখি। গ্রামে সামাজিক এত অশান্তি আপনি দেখবেন না। সেখানে স্কুল, কলেজ কতিপয় পড়ুয়ারা প্রেম করে ঠিকই কিন্তু সেসবের এরর আউটকামগুলো আমাদের শহরের মতো তীব্র না। বেশি হলে সেসব বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া কিংবা জোর করে বিয়ে করিয়ে দেবার মধ্যেই মিমাংসা হয়ে যায়। অবৈধ যৌনসম্পর্কে লিপ্ত হয় না এরকম বললেও ভুল হবে। তাও কদাচিৎ। শতে একজন। আমাদের শহরে সেটা অতটা সোজা না। টিনএজ সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেতো সেটা আরো বেশি।

অনেকগুলো ফ্যাক্টর এর পেছনে কাজ করে। কোনটার পেছনে? ওই যে শান্তিমন্ত্র। এর মধ্যে সায়েন্টিফিকালি কেবল একটা ফ্যাক্টরই আমার কাছে অনেক বেশি প্রভাবশালী বলে মনে হচ্ছে। সেটা নিয়েই বাকি আলোচনা।

এক কথায় গ্রামে বৈষম্যবিরাজ করে না (Lack of Discrimination) – এটাই আসল সূত্র। একেবারে ছোট থেকেই আমরা বৈষম্যবাদী মন নিয়ে, সমাজ শ্রেণীর চিন্তা নিয়ে বড় হতে থাকি। খালার বয়সী কাজের লোককে আমরা বুয়া ডাকি, গ্রাম থেকে কেউ আসলে তার প্রতি আমাদের খানিকটা হেয় জন্মে, রাজশাহী থেকে যারা চট্টগ্রামে কাজের খোঁজে আসে তারা বেশিরভাগই রাজমিস্ত্রির কাজে আসে- ফলে তাদেরকেও আমরা খানিকটা নিম্ন চোখে দেখি। বৈষম্য হরেকরকম। স্কুলেও আমরা এর থেকে মুক্ত হই না। প্রাইমারি স্কুলে একেবারে প্রথম থেকেই ছেলে মেয়েদের আলাদা বসতে হয়, হাইস্কুলে তাদের সাথে বেশি কথা বললে তা বাঁকা চোখে দেখা হয়- এসবের মাঝে থেকে থেকেই আমাদের মনটা নারীবাদ, পুরুষবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি ‘বাদ’-এর জন্ম দেয়। ভিখারিরাতো আমরা শহুরেদের কাছে ভিন্ন জগতের মানুষ।

কিন্তু গ্রামে পরিস্থিতি কিরকম?

ইনটিমেট বা আন্তরিক সম্পর্ক যেটাকে বলে সেখানে ঠিক সেটাই। মিস্ত্রি বলতে সেখানে কিছু নাই, শ্রমিকের সংজ্ঞা অজ্ঞাত। সবাই মিস্ত্রি, সবাই শ্রমিক। গ্রামের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে, ভ্যান যে চালায় সেও। তারা সবাই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। সে নির্ভরশীলতা কেমন? গোয়ালা গৃহস্থের গরুর ওপর আবার গৃহস্থ গোয়ালার টাকার ওপর (শহরে ঠিক উল্টো) কিংবা মাটি লেপার শ্রমিক ও তার নিয়োগদাতার পারস্পরিক সম্পর্ক। একটা বাড়িতে জানলা, দরজার মাটি লেপার জন্যে যে শ্রমিকটি এলো (ভুল বললাম যে লোকটি এলো) তার কাজ শুরু করার মিনিট দশেক পর দেখা গেলো গৃহস্থ নিজেও মাটি লেপতে শুরু করেছে। একে অপরের ওপর এই নির্ভরশীলতা যেন ওই শৈবাল, ছত্রাকের সহাবস্থান। আচ্ছা আমরা শহরেও তো একে অপরের ওপর নির্ভরশীল- রিক্সাওয়ালার উপর আমি যেমন, রিক্সাওয়ালাও আমার উপর কিংবা স্কুলের ঘন্টিওয়ালা প্রিন্সিপ্যালের উপর, প্রিন্সিপ্যালের স্কুলও স্কুলের ঘন্টিওয়ালার উপর কোন না কোনভাবে নির্ভরশীল। তাহলে এই দুই নির্ভরশীলতার মধ্যে পার্থক্য কী?

আমরা যারা ব্লগার তাদের কথাই বা বলি না কেন? একজন ব্লগ করলে যদি মন্তব্য না করা হয়, কিংবা নিয়মিত ব্লগারও যদি অন্যদের ব্লগে অনিয়মিত হয়ে স্বার্থের পরোক্ষ একটা ছবি দেখান তাহলে পুরো ব্লগ কম্যুনিটিই ধসে যাবে। নতুন কোন ব্লগার আসবে না, ব্লগ লেখার উৎসাহও কমে যাবে। এটা অন্য এক ধরণের নির্ভরশীলতা। অপরিহার্যতা – যাকে বলা যায়।

গ্রাম আর শহরের নির্ভরশীলতার মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো আন্তরিকতার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি। গ্রামকেন্দ্রিক কাজকর্মে একে অপরে মিলে যে কাজ করে তাতে দেখব একজন আরেকজনের সাথে হাসি ঠাট্টা করছে, পাশের গ্রামের কোন বেটি কার সাথে পালাল তার গুনচর্চা করছে। শহরে এসব ভাবা যায়? কখনো শুনেছেন কোন ফকিরকে সিঁড়ির গোড়ায় বসে মোটাসোটা গৃহিণীকে তার বস্তির কাহিনী শোনাতে? গ্রামে আমরা ঠিক সেটাই পাব। এটাই আন্তরিকতা। এটাই শান্তি। এটাই মন্ত্র।

টাকা পয়সা, এ্যাচিভমেন্ট, সাফল্য এসব দিয়ে বস্তুগত শান্তি হয়তোবা পাওয়া সম্ভব- কিন্তু মানসিক শান্তি? ও স্বর্গীয় জিনিস। স্বর্গীয় বস্তু সবজায়গায় হানা দেয় না। যে জায়গায় হানা দেয় সেই জায়গায় একটা ঝগড়া থামাতে দশজন লোক ছুটে আসে।

পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ? হ্যাঁ?


একটুখানি সাইকোলজি, একটুখানি চিন্তা

১. গ্রাম যতই একটা মফস্বলে পরিণত হতে থাকে ততই সেখানে ঝগড়া বিবাদ, জটিলতা বেড়ে যায় কেন?

২. আর কোন কোন ফ্যাক্টর একটা গ্রামের শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে পারে? আমাদের শহরে এর সবগুলোই কি উপস্থিত?