ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

শবে বরাতের নামায শেষে যখন বাসার নিচের ছোট্ট ছেলেটার সাথে ফিরছিলাম নীড়ে সে আমাকে জিজ্ঞেস করে, আজকে কে জিতবে?

আমি শুনে আশ্চর্যান্বিত হই। বুঝতে পারি সে কিসের কথা বলছে।

আমার নিশ্চুপ অভিব্যক্তি দেখে সে আবার বলে, আমার মনে হয় কেকেআর…

আমি বলি, আমি আইপিএল দেখি না।

ছেলেটা চোখ গোল গোল করে বলে, কেন? কেন?

কেন-র জবাব দিতে গিয়ে ছোটখাট লেকচার দেওয়ার ঝামেলা এড়াতে সংক্ষেপে বললাম, এটা একটা ব্যবসা।

ভাবি আর হাসি। এই দুই মাস আগে আমরা কত পাগলামিই না করছিলাম। আমরা আসলে আরেকটা রূপ ধরেছিলাম কিংবা খোলসও বলা যায়। সাপ যেমন খোলস পাল্টায় ঋতুতে ঠিক তেমনি আমরাও ক্রিকেট সিজনে খোলস পাল্টাই। বাংলাদেশের তাসকিন আর আরাফাত সানি যখন নিষিদ্ধ করা হলো এশিয়া কাপে আমাদের চেতনা খুব জেগে উঠেছিলো। আমরা মধ্য আঙ্গুল দেখাচ্ছিলাম আইসিসিকে। বলছিলাম আইসিসি মানে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল। আমরা আইসিসির ইন্ডিয়ান কমেন্টগুলোতে গালিগালাজ করছিলাম তারাও বাংলাদেশি কমেন্টগুলোতে। এমন একটা অবস্থা যেন ভারত, বাংলাদেশ সাপে নেউলে সম্পর্ক।

কিন্তু আমরা অনেক ভালো কিনা তাই দুই মাস যেতে না যেতেই মায়ের পেটের ভাইয়ের মতো মিলেমিশে গিয়েছি। আমরা ভারতের দান করা খেলার চ্যানেলে হাঁ করে চেয়ে থাকি। আইপিএল নামের সাদা ওয়াইনে আমরা নেশাতুর হয়ে মাথা ঘুরায়। অতীতকে আমরা ভুলে যেতে পেরেছি। এই সাফল্যে আমাদের দেখানো মধ্যাঙ্গুল পরিবর্তিত হয়ে ভি চিহ্ন দেখাতে শুরু করে।

আমি ভেবেই পাই না, এটা কী করে সম্ভব? মুস্তাফিজুরকে তারা ফ্র্যাঞ্চাইজির লোভ দেখিয়ে সহজেই না হয় হাত করে নিলো কিন্তু এতগুলো দর্শকের কি সেই বোধটাও নেই? আমি বলি, আইপিএল মুস্তাফিজকে নাহয় এক কোটি চল্লিশ লাখ রূপির পারিতোষিক দিয়েছে তাতে বাংলাদেশের রেপুটেশন কি খুব বাড়িয়ে দিয়েছে হায়দরাবাদের বিজনেস কোম্পানি? তারা কি এরপরের স্পোর্টস প্রোগ্রামগুলোতে বাংলাদেশকে তুলে নাচবে? এরকম কয়েকজন মুস্তাফিজকে তারা হাত করে নিচ্ছে বলে ভুল হবে তারা পুরো বাংলাকেই হাত করে নিচ্ছে।

ব্যবসায়ী ললিত মোদির আইপিএল ইন্ডিয়াকে স্বর্ণের খনির সমান টাকা এনে তাদের দেশকে উঁচুতে বসিয়ে দেয় এটা তো সত্যিই। ২০১৫ সালের আইপিএলের সিজনে ভারতের জিডিপিতে ১৮২ মিলিয়ন ইউএস ডলার যোগ হয় (১)। আর আইপিএলের ব্র্যান্ড ক্যাপই তো সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার(২)। তারা বিশ্বের আনাচ কানাচ থেকে প্লেয়ার এনে ব্র্যান্ডের মান তো বাড়াচ্ছেই আর বেশ দুই পয়সা কামিয়ে নিচ্ছে।

১৬১০ সালের দিকে যখন ইংল্যান্ডের কান্ট্রি সাইডগুলোতে মানুষ ক্রিকেট ক্রিকেট করতে থাকে মানুষ তখন সেখানে ব্যবসার ছদ্মবেশ ছিলো না। ছিল কেবল বিনোদনের এক মাধ্যম। সেই বিনোদন যখন উপনিবেশবাদীরূপ ধারণ করে সংস্কৃতির কলোনাইজেশন ঘটাতে থাকে তখন সেটা আর বিনোদন থাকে না সেটা হয় আগ্রাসন। সেই আগ্রাসনকেই আমরা বাঙালি মানুষ দিব্যি বিনোদন ভেবে বসে আছি। আবার সেই বয়লিং ফ্রগ সিনড্রমের কথা স্মরন করি। ব্যাঙ হাঁড়িতে বসে আছে। হাঁড়ি ফুটন্ড পানিতে গরম হয়। ব্যাঙও গরম হতে থাকে। কিন্তু তার শরীর বাইরের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয় তাই সে দিব্যি স্বাভাবিক ভেবে বসে থাকে। কিন্তু যখন সেই ব্যাঙের দেহ সর্বোচ্চ গরম হয়ে যায় তার আর কোন উপায় থাকে না। আমরা হচ্ছি সেই ব্যাঙ আর এই হাঁড়িটা হচ্ছে আইপিএল।

কতটা সর্বনাশা আমাদের সমাজের জন্যে তা কি কখনো ভেবে দেখেছি? বিশেষত একে ঘিরে যে অবাধ জুয়ার সংস্কৃতি তাতে আমাদের শহরের, গ্রামের চায়ের টং, কুলিং কর্নারগুলো একেকটা ছোটখাট ক্যাসিনোও বলা চলে। এই ক্যাসিনোতে গিয়ে গিয়ে দেশের প্রোলিটারেট পিপলগুলো নিজের দিনের শেষ উপার্জন তো খোয়াচ্ছেই সাথে সাথে যুবক ছেলেদেরও ধ্বংস করছে।

আমার এলাকার কথাই বলি। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত এ সময়ে পুকুরের পাশ দিয়ে যদি যান আপনি সেখানে দুটো শব্দ শুনবেন- টাকা এবং রান। এটা অবধারিতই। মাঝে মাঝে দলের নামগুলোও শোনা যায়। ওদিকে ভারত মুস্তাফিজদের খাটিয়ে খাটিয়ে, পঞ্চাশ পয়সা দিয়ে শত পয়সা কামাচ্ছে আর আমাদের যুবক ছেলেরা পকেটের পাঁচ পয়সার পাঁচ পয়সাই হারাচ্ছে।

আর ছয়-চারের সাথে সাথে আইপিএলের গরম মুরগি তথা ‘হট চিকস’-দের চিয়ারলিডার নামকরণ আমাদের যুবকগুলোর চোখ, মন একেবারে ধুলোতে মিশিয়ে দিয়েছে। এইসব বেহায়া নারীর বেহায়াপনা দেখে দেখে আঠারো পেরুনো ছেলেগুলো আর তাদের সাথে পড়া মেয়েদের বোন ভাবতে পারে না। অশ্লীল শব্দ দিয়ে অবজেক্টিফাই করা এখন এক ধরণের অভ্যাস। পর্নো সাইটগুলোর অবাধ বিস্তারের জন্যে এই আইপিএল-এর ‘সম্মানিত’ চিয়ারলিডাররাই অধিকাংশ ভাবে দায়ী। এমনকি একে ভারতেরই উঠতি বয়সের ছেলেদের জন্যে এক অভিশাপ বলে মনে করা হয়। আইপিএলে শিক্ষামূলক উপাদানের ঘাটতি থাকলেও অভাব নেই ধনীক বিনোদনের। একটা বাচ্চা ছেলে যে কিনা ক্লাস সিক্সে পড়ে সে যখন ভারতের সিনেমার পাশাপাশি ওই খেলার আবর্জনা দেখে তাতে তার মনে খুব উন্নত প্রভাব ফেলে?

“There were few instances of supporting education and children. What the TV cameras have been busy showing are cheerleaders, Bollywood stars, and highly subsidised rich individuals.”

– Prabhudev Konana, distinguished teacher at University of Texas at Austin
(৩)

একটা পরিবারে আগে যেখানে একসাথে বসে খেলা দেখা যেত এখন সেখানে ছয় চার হলে বাবা মুখ ঘুরায় ওদিকে, ছেলে ঘুরায় এদিকে।

রেসের খেলা দেখেছন কখনো? ঘোড়াগুলোর উপর বেট লাগিয়ে মালিকগন গ্যালারিতে বসে উত্তেজনায় পগারপার হয়। আইপিএল আর এই ঘোড়ার রেস আলাদা কিছু না। প্লেয়ারদের উপর বেট লাগিয়ে প্রীতি জিনতা, শাহরুখ খানরা গ্যালারিতে বসে থাকে। টাকা কোনদিক দিয়ে যাবে? এই ব্যবসার খেলাতে হাতে গোনা কিছু ধনী হচ্ছে আরো ধনী এবং গরিব হচ্ছে আরো গরিব। বিশেষত ভারত সরকারও যেভাবে আইপিএলের ব্যবসা থেকে কামানোর লক্ষ্যে প্রশ্রয় দিয়ে আসছে তাতে ক্ষুদ্ধ ভারতেরই অনেক বুদ্ধিজীবী। সেই ক্ষোভে শান দিয়ে আইপিএল কমিশনার ললিত মোদির কুষপুত্তলিকা পোড়ানোর ঘটনা সেদেশে বেশি দিনের পুরোনো নয়।

এতসব কিছুর পরও, সমাজটাকে ফকির, অশ্লীল করবার পরও, আকাশসংস্কৃতির আগ্রাসনের পরও আপনি মনে করেন যে আইপিএল খেলা না দেখাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা উচিত?

এরপরেও আইপিএল দেখব? আর যারা দেখেন, ফুর্তি নেন, মজা লুটেন দয়া করে ভারত বাংলাদেশের খেলার সময় ভারত নিয়ে গালিগালাজ করবেন না। চুপ থাকবেন। ওই দুই নলা কথা বা বিশ্বাস পোষণ করা কোন ধরণের কাজ সেটা আজ নাহয় মুলতবিই থাকলো।

ফেসবুকঃ www.facebook.com/towkir9

তথ্যসূত্রঃ

১। “Clearing the fence with brand value”(PDF). American Appraisal. Retrieved2014-11-07.

২। “IPL 2015 contributed Rs. 11.5 bn to GDP: BCCI”. The Hindu. Retrieved6 January 2016.

৩। দ্য হিন্দু টাইমসের সংবাদ