ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 
অবশেষে সে বেঁচে থাকে।

বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম তখন ভেসেছে। যাচ্ছিলাম বহদ্দারহাট এলাকা দিয়ে। উদ্দেশ্য বাস ধরা। কিন্তু সেই বাসের হাতল ধরতে ঘুরতে হচ্ছিল অনেকখানি। মাগরিবের সময় খুব কাছাকাছি। চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার মাঝ দিয়ে রিকশা যেতেই হাঁক ছাড়ি, এ্যাই রিকশা যাবি!
ভাড়া, দরদাম ঠিক করে রিকশায় উঠে বসি। সঙ্গী আরেকজন। দুইজনে মিলে রিকশায় যেতে যেতে গল্প করছিলাম শেষ করা একটা পথশিশু উৎসবের। কিন্তু হায় পরিহাস! শেষ হইয়াও হইলো না শেষ। রিকশার হাতল ধরে টানছে যে বালক তাকে বালক বললে আসলেই ভুল হবে। নিতান্তই শিশু। বৃষ্টির তেজ ততক্ষণে নাই বলতে গেলে। গুড়ি গুড়ি কিছু জলের ফোঁটা ভিজিয়ে দিচ্ছে। চোখ মেলে দেখি চৌদ্ধ বছরের ছেলেটিকে। পরনে সাদা, মলিন হওয়া স্যান্ডোগেঞ্জি, হাফপ্যান্ট। দুটো লিকলিকে, শীর্ণকায় হাত এই রিকশার সাথে যেন খুবই হাস্যকরভাবে তুলনীয়। ক্ষুদ্র দুটি হাত সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে রিকশাটিকে। ভেতরের জমে থাকা কথাগুলো আর থাকতে পারল না।

জিজ্ঞেস করলাম, তোর নাম কী?

: শান্ত ভাইজান।
: পড়ালেখা করস?
: করতাম ভাইজান। তিনমাস আগে ছাইড়া দিসি।
: ছাড়সস ক্যান?
: মাদ্রাসার যে দাম। ষোল পারা কোরআন শিখসি। আর পারি নাই। মাসে দুই হাজার।
: দুই হাজার জোটে না?
: না ভাইজান। পড়ালেখার অনেক দাম রে ভাই, অনেক দাম!

সঙ্গী ভাইটি প্রশ্ন শেষ করতেই আমি আর লাগলাম।

: রিকশা চালায় কত পাস? ডেইলি?
: দুইশ-তিনশ। যেইটা পাই এইটা দিয়ে চলে না।
: থাকস কোথায়?
: চকবাজারের ভান্ডারিয়া লেনে।
: ঘরে আর কে আছে?
: সবাই আছে। বাপ আছে, মা আছে।
: বাপ কী করে?
: হ্যায় সিএনজি চালায়।

পাশের জন সন্দিগ্ধ কন্ঠে বললেন, সিএনজি চালিয়ে তো ভালোই আয় হওয়ার কথা।
কেন জানি সাফাই গাইতে মন চাইলো। আমি যুক্তি দিলাম, সিএনজি, রিকশা চালালেও এগুলোর আলাদা ভাড়া দিতে তো হয়ই। তাতে মালিক, শ্রমিকদের উপর ঠিকই শোষণযন্ত্র চালিয়ে নিতে পারেন। পুঁজিবাদি এই সমাজে এইটাইতো চলে আসছে।
: বাসা ভাড়া কত?
: চার হাজার লাগে।

মনে মনে একটা হিসাব কষলাম। ক্যানভাসে ছবি আঁকলাম। বয়ে নিয়ে যাচ্ছে এক শিশুশ্রমিক। পড়ালেখা বিসর্জন দিয়ে। ঘরদুয়ারের অর্থ সামলাতে, নিজেকে বাঁচাতে, টিকিয়ে রাখতে- এরকম গল্প যেন শাশ্বত। শুধু মাধ্যমগুলো বদলে যায়। কখনো গ্রামের ভিজে, সোঁদাগন্ধের কৃষকের ছেলে, কখনো শহরের তপ্ত রোদে হাড়ভাঙ্গা শিশু রিকশাচালক, কখনো ফুটপাথে পড়ে থাকা, পঙ্গুত্ব বরণ করে নেওয়া শিশু ভিখারি সব জায়গায় একই ছবি, একই গল্প বলে চলে। গল্পটি নিম্নশ্রেণীর, শোষিতদের, জীবনসংগ্রামীদের। এইরকম ছোট ছোট বয়স থেকেই এরা মাথায় নিয়ে তিনটি মানুষের বোঝা, সংসারের বোঝা। শুনতে হয় হাজারো কথা। থেমে থাকে না তবু পথচলা।

আরেক রিকশাওয়ালা দেখে টিটকারি দিতে লোভ সামলায় না। শান্তকে উদ্দেশ্য করে বলে, ব্যডা তুই কমপ্লেন খাইস।
আমরা একটু বেশিই নির্লজ্জ কিনা তাই একচোট না হেসে পারি না। দু:খ কষ্টের গল্পকে নির্লজ্জতার আবরণে ঢেকে দিই।
ভাই জিজ্ঞেস করে, মাদ্রাসার পড়া শেষ করলে কী করবি?
: দেখি না, মাদ্রাসার কোন কামকাজে ঢুকতে পারি নাকি…

এবার আরও একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে আসে। আমরা তো ভাবতেই পারি না। মাদ্রাসার চাকরি! ওরে বাবা! উঁচু উঁচু দালান, কর্পোরেট দেওয়াল, মোটা স্যালারির সাথে একটা সামান্য মাদ্রাসা ঝাঁড়পোছ করা! কিসের সাথে কিসের কি। কিন্তু যাকে আমরা অবজ্ঞা করে কোন কাজই মনে করছি না আপাতদৃষ্টিতে সেটিই হয়তোবা কারও যেন বেঁচে থাকবার শেষ গুটিকয়েক খড়কুটো। আমাদের একটা বদস্বভাব- আমরা প্রত্যেকে নিজে নিজ সমাজকে নিজের চোখে দেখি। নিরপেক্ষ চোখ অন্ধ হয়ে গেছে।

আইনের কথা বলে লাভ নেই। শিশুশ্রম নিয়ে বাপরে! কত আইন, কত তত্ত্ব। ওই আইনের মোটা মোটা বই শুধু নিয়মরক্ষার্থেই। যারা ওসব রচনা করেছে তারা যদি কেউ এসে শান্ত নামে হাজারটা শিশুর হাত রিকশার হ্যান্ডেল, পাথরভাঙার হাতুড়ি থেকে সরিয়ে নিয়ে বইয়ের ওপর বসিয়ে দিয়ে কলমের গোছা ধরিয়ে দেয় তাহলে তা আইন আইন করে চেঁচানোর চেয়েও অধিকহারে বাস্তবিক, কল্যাণকর।
সমস্যা এই কাজগুলো ক্ষুদ্র অলাভজনক সমাজকল্যাণ প্রতিষ্ঠান, সরকারি ক্ষুদ্র উদ্যোগ ব্যতিত হয় না। তাতে না হয় লাখ দুয়েক শিশু ঠিকপথে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু আর বাকি দশ লাখ? লাখ দুয়েকের ঝরে পড়তেই বা কতক্ষণ?

ফেসবুকঃ http://www.facebook.com/towkir9