ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

অনেককাল আগে চট্টগ্রাম শহরের দুই স্বনামধন্য কলেজ প্রাঙ্গনে যমদূতগণের হাতাহাতি হয়েছিলো। পুলিশমামারা তখন ভয়াবহরূপ ধারণ করে এফবিআই এর মতো হুটহাট করে মাটির তল থেকে অস্ত্র, চাপাতি আবিষ্কার করে তাক লাগিয়ে দিচ্ছিলেন। সেই তাক লাগানো ব্রেকিং নিউজগুলো দেখে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা দৌড়ে ঘরের ভেতর লুকোচ্ছিলেন। তাঁদের উড়ে চলবার স্বপ্ন নিয়ে তাঁরা শঙ্কিত হচ্ছিলেন। আর তাঁরা কলেজে নাচতে নাচতে ক্লাস করতে পারবেন না, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ক্যাম্পাসে বসে থাকতে পারবেন না, সোনালি চুলের মেয়েটিকে আর দেখতে পারবেন না ইত্যাদি স্বপ্ন ভেঙ্গেচুরে যাচ্ছিলেন। সেই স্বপ্নের জায়গায় গেঁড়ে বসলেন আতঙ্ক নামের সাহেব। যে আতঙ্ক সাহেব রোপিত হয়েছিলেন ক্যাম্পাসের মাটির নিচে। কয়েকটা ধারালো চাপাতি, অস্ত্রের শাসনে। শিবির মামারা তখন এলাকা ছাড়লেন। সরকারি মামারা তখন আস্তানা গাড়লেন। মুজিব তার ঘোষণা দিয়ে মাইকে উচ্চারিত হতে লাগলেন। সেই ঘোষণা শুনবার কোন ছাত্র রইলেন না। তারা ঘরে আবদ্ধ। চুপচাপ ভয়ে দিনাতিপাত করছেন। রোজ দুপুর বারটায় শুরু হওয়া ঝটিকা মিছিলগুলো থেকে তারা ক্রমাগত দূরে থাকবার চেষ্টা করতেন। স্রেফ প্র্যাকটিকালের মুলোগুলোই তাদের আগ্রাবাদ থেকে চকবাজারে টেনে নিয়ে আসতো। এইসব বিষয়গুলো এক ছবির মতো এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে বদলাচ্ছিল। এবং ক্যাম্পাসের গাছের নিচে কয়েকটা আরএফএল চেয়ারে বসে পুলিশমামারা চা খাচ্ছিলেন। তাঁরা দৃষ্টিবদ্ধ ছিলেন সব জায়গায়। ঘুরছিলেন নানা গতিবেগে। কেউ দাড়িওয়ালা বেশে ক্যাম্পাসে পদধূলি দিলেই তাকে সালাম জানানো হতো, অভ্যর্থনা জানানো হতো। কিছু সময় বন্ধুর মতো কুশল জানতে চাওয়া হতো। সরকারি মামারা এসে ক্যাম্পাসের চরিত্র গেল আমূল বদলে। ছেলেরা সাহিত্য চর্চা শুরু করলেন, প্রেমের গাছ রোপন করতে লাগলেন, বারটা বাজতেই সবাই এক এক করে দৌড়ে পালাতে লাগলেন। একবার কলেজ মিলাদে এক দাড়িওয়ালা মাদ্রাসার ছেলের ফোনখানা খোয়া গেল, এক কলেজ ছাত্রীর শ্লীলতা অসাধারণভাবে বাড়ানো হলো…
কলেজে ছাত্র কমতে লাগলেন, ছাত্রী কমতে লাগলেন, ক্যাম্পাস ধীরে ধীরে মরুভূমি হতে লাগল এবং পুলিশমামারা আরএফএলের চেয়ারে বসে বসেই দিনাতিপাত করতে লাগলেন। ক্যাম্পাসের ভেতরেই।

আরএফএল চেয়ার, আরামেই দিন পার!

একবছর পর যখন গ্রীষ্ম আবার হানা দিল, কচি কচি ছেলেমেয়েরা রেজাল্ট, অনলাইন এডমিশন নামের প্যারা অতিক্রম করে কলেজের চৌকাঠে পা রাখলেন তখন ক্যাম্পাস আবার মুখরিত হয়ে গেল। ক্যাম্পাস ইতিহাস জানা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা তখন দ্বিতীয় বর্ষে উন্নিত হয়েছেন। তাদের ভেতর সেই ভয় তখনো বিরাজমান। সাথে যোগ হয়েছে গুলশান ট্র্যাজেডি, শোলাকিয়ার হামলা। সেই ভয়ের মাঝেই নোটিশ আসে-

“দশদিন অনুপস্থিত থাকিলে তাকে থানায় চা-পানি খাওয়ানো হইবে।”

সেই চা পানি খাওয়ার লোভে পা দেওয়ার মতো মোরগ-মুরগি নন সেই দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীগণ। কলেজের সাথে সম্পর্কছেদ করবার পর আবার নতুন বছরে কলেজের সাথে সম্পর্ক গড়বার অভিপ্রায়ে যখন তেনারা কলেজে পা দিলেন দেখেন পুলিশমামারা তখনও আরএফএলের চেয়ারে বসে বসে পা দোলাচ্ছেন। প্রশ্নখানা এসে তাদের চোখের সামনে লটকে থাকল-

তাঁরা আছেন কী করতে?
ক্যাম্পাস রক্ষা করতে ক্যাম্পাসের ভেতরে কেন?
বাইরের গেটে আরএফএলের চেয়ারে বসেন না কেন? সেখানে ছায়া নেই বলে?

তবে তেনারা নিরীহ জাতি বলেই কিনা অতসব প্রশ্ন করবার সাহস পান না। চুপি চুপি পাশের বন্ধুটিকে প্রশ্নগুলি আউড়েই ক্লাসে ঢুকে যান।
আর ওদিকে সিনেমার যে অংশটি চলতে থাকে তাতে দেখা যায়, কলেজের গেট দিয়ে ঢুকছেন এক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। হঠাৎ কাঁধে স্পর্শ পেতেই দেখেন সরকারি মামাদের এক ভাগনে তাঁকে সুধোচ্ছেন, দাঁড়াও।

ছাত্রীটির রক্তে বোধহয় আনা নাসরিন, রোকেয়া সাখাওয়াত, সুফিয়ার রক্ত মিশে ছিলো। তাই বললেন, আমাকে স্পর্শ করবার স্পর্ধা আপনাকে কে দিয়েছে?

ভাগনেটি বললেন, তোমার চেহারা দেখে আমার সন্দেহ হয়েছে।

ছাত্রীটি বললেন, চেহারাতে আমি জঙ্গি লেখা আছে?

ভাগনেটি রুখে গেলেন, তোমার ভিতর গড়বড় তা প্রকাশ পেয়ে গেছে।

এই সিনেমার শুটিং দেখেই বোধহয় আশপাশে আরো মানুষ জড় হতে লাগলেন। সরকারি মামারা টের পেয়ে ভাগনেটিকে টেনে ভিতরে নিয়ে গেলেন। সেই ভাগনেটি যাবার সময় বলে গেলেন, গড়বড় নয়! তোমার বিচার আছে!

জটলাটি ধীরে ধীরে হালকা হচ্ছে। আর পুলিশমামারা আরএফএল চেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছেন…। বড্ড গরম!