ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়কার স্নায়ু যুদ্ধের অবসান ঘটে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর পরই। তারপর বেশ অনেকটা সময় ধরে একচেটিয়া ভাবেই বিশ্ব নেতৃত্ব দেয় আমেরিকা। কিন্তু ওয়াশিংটনের যুদ্ধবাজ পররাষ্ট্র নীতিতে আমেরিকার অর্থনীতি আজ টালমাটাল। এ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়া তাদের প্রায় ভাঙ্গাচোরা অর্থনীতিকে অনেকটা অদ্ভুত ভাবেই সারিয়ে তুলেছে গত বিশটি বছরে। গত বছর ও নিউইয়র্কে যেখানে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বিলিওনার ছিল। এ বছর এই কৃতিত্বটা রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর। আর দেশ বিবেচনায় বরাবর এর মতই ইউরোপ যে কোন দেশের তুলনায় রাশিয়াতেই রয়েছে সর্বাধিক সংখ্যক বিলিওনার। তাই সারা বিশ্বে যখন অকুপাই ওয়াল স্ট্রীট আন্দোলনে দোদুল্যমান তখন এর প্রায় কোন ঢেউই আঘাত করে নি রাশিয়া কে। একই অবস্থায় আরেক উদীয়মান ক্ষমতাধর দেশ চীনের। বিশ্ব বাজার বলতে গেলে প্রায় পুরোটাই এখন তাদের দখলে। প্রাক সমাজতান্ত্রিক দেশ হওয়ায় রাশিয়া আর চীন দুটি দেশেরই কূটনৈতিক সম্পর্ক এখনো অত্যন্ত মজবুত।

অপরদিকে ল্যাটিন আমেরিকার কথা চিন্তা করলে দেখা যাবে যে ওখানে রয়েছে বিশ্বের অপর উদীয়মান শক্তি ব্রাজিল। এই দেশটির ও সবচেয়ে বন্ধু প্রতিম রাষ্ট্রটি হল রাশিয়া। অন্যান্য ল্যাটিন আমেরিকার দেশ গুলোর মতোই ব্রাজিলের ও আমেরিকার সাথে সম্পর্ক অনেকটাই দা কুমড়ো। দক্ষিন এশিয়ার গুরুত্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যে অনেক খানি এ কথা অনস্বীকার্য। এই অঞ্চলে দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হল পাকিস্তান এবং ভারত। পাকিস্তানের সাথে আমেরিকার সখ্যতা বেশ পুরনো, সঙ্গত কারনেই তাই রাশিয়ার সাথে ভারতের বন্ধুত্ব। বিশ্বে মস্কো নয়াদিল্লী বন্ধুত্ব দেখার মতো। এরকম একটি কথা প্রচলিত, যুদ্ধ হলে অস্র দেবে রাশিয়া আর সৈন্য দেবে ভারত। দেশ দুটির মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও অত্যন্ত গভীর।

ইদানিং কালে অবশ্য লাদেন ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক খুব একটা ভালো না যাওয়ায় আমেরিকা কিছুটা ভারতের দিকে ঘেঁষার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই ইস্যুতে আমেরিকা ব্যাবহার করছে চীনের সাথে ভারতের বিদ্যমান দ্বন্দ্ব কে যেখানে চীনকে ধরা হয় আমেরিকার সবচেয়ে ভয়াবহ হুমকি রূপে।

এবার আসা যাক ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সম্পর্কে। এই সংস্থার প্রধান দুটি দেশ হল জার্মানি এবং ফ্রান্স। দুটি দেশই এখনো আমেরিকার লেজুড় বৃত্তিতে মনযোগী। কিন্তু বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কবলে গ্রিস যখন প্রায় দেউলিয়া তখন বিশ্বের এই অভিজাত পাড়া টেনে তুলতে পারছে না গ্রিস কে। সাহায্যের জন্য হাত পেতেছে রাশিয়া এবং চীনের কাছে। বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের মতো সঙ্গত কারনে সানন্দে কাজটি করতে আগ্রহী দেশ দুটি।

আর প্রাকৃতিকভাবে সবচেয়ে বেশি খনিজ সম্পদের অধিকারী হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের উপর এক রকম ছড়ি ঘোরাচ্ছে রাশিয়া। কেননা রাশিয়া যদি তেল গ্যাস বন্ধ করে দেয় তিন দিনে অচল হয়ে পরবে পুরো ইউরোপ। কথাটা অদ্ভুত শোনালে ও এটাই এখন বাস্তবতা।

এবার আসা যাক মূল প্রসঙ্গে। ইরান প্রসঙ্গ। এখন কথা হল কোন ইস্যুটি দিয়ে ইসরাইল এবং আমেরিকা সহ পশ্চিমা দেশগুলোর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে ইরান। ইস্যুটি অনেক পুরনো। পারমাণবিক ইস্যু। পশ্চিমা দেশ গুলো সন্দেহ করছে ইরান শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক চুল্লীর নাম করে পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলেছে। তাই তাদের এত মাথা ব্যথা। একটি মুসলিম রাষ্ট্রের এই অর্জন তারা সহ্য করতে পারছে না। তারা আক্রমনের হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় আসলেই কি তা সম্ভব।

একথা ওপেন সিক্রেট যে ইরানকে সমস্ত পারমাণবিক প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে রাশিয়া। অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কারনে সানন্দেই তারা এ কাজ করেছে। মস্কো তেহরান সম্পর্কও তাই বেশ সুদৃঢ় এখন। নিজেদের অঞ্চলে প্রভাব বজায় রাখার জন্য মস্কো তাই ইরান আক্রমনের মতো ব্যাপারটি বরদাস্ত করবে এমনটি ভাবার অবকাশ নেই। আর বিশ্বের সর্বাধিক পরিমাণ পারমাণবিক অস্রের মজুদ থাকা এই রাশিয়ার পেছনে রয়েছে ব্রিকভুক্ত বন্ধু প্রতিম চীন, ভারত ও ব্রাজিলের মতো শক্তিশালী দেশ গুলো। মস্কো যখন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মতো সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভুক্ত দেশগুলো কে নিয়ে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট গঠন করতে যাচ্ছে এমতাবস্থায় তাদের আসেপাশের অঞ্চল অস্থিতিশিল করতে দিবে না এটাই যুক্তি সঙ্গত।

সেই সাথে তো রয়েছে ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধের মতো ঘোষণা যার বাস্তবায়ন ঘটলে অর্থনৈতিক মন্দার এই দিনে তা হবে বিশ্ব বাণিজ্যে মরার উপর খাঁড়ার ঘা। এছারাও ধর্মীয় দিক থেকে মিডল ইস্টে এখনো নেতৃত্ব স্থানীয় দেশ হল ইরান। ইরানের উপর আক্রমন হলে মিডল ইস্টেও পশ্চিমা সম্পর্কের অবনতি ঘটবে এটা নিশ্চিত। এত কিছুর পরে ওয়াশিংটন এখন ইরান আক্রমনের মত সাহস দেখাবে কিনা তা আসলে সময়ই ভালো বলতে পারবে।