ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

আজ কাল সীসা নামটি অনেক শোনা যাচ্ছে। ফেসবুক এবং ব্লগের কল্যানে এই শব্দটির সাথে আমরা সবাই কম বেশি পরিচিত। সীসা আসলে জিনিসটা কি আসুন একটু জানা যাক।

সহজ ভাবে বলতে গেলে সীসা আসলে হুঁকা। হুঁকার অনেকটা আধুনিক সংস্করণ বলা চলে। এখন হুঁকা কি? হুঁকা হচ্ছে তামাক সেবনের এক ধরনের যান্ত্রিক ব্যবস্থা। আগে আমাদের গ্রাম বাংলায় সাধারণত মানুষ অতিথি আপ্যায়নে পানের সাথে হুঁকা এগিয়ে দিত। গ্রামের মানুষ বিশেষ করে কৃষক শ্রেণীর লোকজন হুঁকা ব্যবহার করে তামাক সেবন করত। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি বাংলায় হুঁকা নিয়ে একটি সুন্দর প্রবাদ ছিল যা এখন আর খুব একটা শোনা যায় না। প্রবাদটি বলার লোভ সামলাতে পারছিনা। প্রবাদটি (আসলে কি একে প্রবাদ বলা যায়? আমি একটু কনফিউসড) এরকম,

হুঁকার ভেতর গঙ্গার জল :

মইচার ভেতর পানি।

এক চুমুক তামাক পাইলে হুক্কুর হুক্কুর টানি।

ওপরানের হুঁকারে তোর নাম কে রাখিল ডাবা।


এখন সীসা প্রসঙ্গে আসা যাক। Dictionary.com সংজ্ঞায়িত করেছে এভাবে, ‘a Persian tobacco pipe in which the smoke is drawn through water.’ আমি এখানে Persian কথাটার উপর একটু জোর দিচ্ছি। কারণ সীসার প্রাপ্ত ইতিহাসের সাথে এর সম্পৃক্ততা রয়েছে। Cyril Elgood এর A Medical History of Persia and the Eastern Caliphate হতে জানা যায়, মুঘল সম্রাট আকবরের দরবারে পারস্যের চিকিৎসক হাকিম আবুল ফাতাহ গিলানি ১৫৮৮ সালে একটি ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেন যার মাধ্যমে তামাক গ্রহণ প্রক্রিয়াকে পানির মাধ্যমে পরিশোধিত করা হয়। পরবর্তীতে যা গালিয়ান (গিলানি থেকে গালিয়ান) নামে পরিচিতি পায়। এই গালিয়ানই হল আজকের সীসা। পারসিয়ান শব্দ shīshe (شیشه) থেকে এসেছে এই সীসা শব্দটি।

সারা বিশ্বেই সীসা এখন একটি জনপ্রিয় নাম। বহির্বিশ্বে প্রায় সব নামীদামী রেস্টুরেন্ট গুলোতেই এর ব্যবহার দেখা যায়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে এটি ওদের সংস্কৃতিরই অংশ বলা চলে। ইউরোপ আমেরিকাতেও এটি সমান জনপ্রিয়। আমাদের একটি ভুল ধারনা যে এটি পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অংশ আসলে তা ঠিক নয়। সীসার ইতিহাসই তার প্রমাণ।

এখন আসি আমাদের প্রসঙ্গে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এখন অনেক সীসা লাউঞ্জ গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরের ভি আই পি এলাকা গুলোতে এই সীসা লাউঞ্জ গুলো বেশি দেখতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রন) আইন, ২০০৫’ থাকলেও নির্দিষ্টভাবে সীসার ব্যবহার ও এর নিয়ন্ত্রন সম্পর্কে এই আইনে কিছু বলা হয় নি। ২০০৬ এর সংশোধনীতেও তা লক্ষ্য করা যায় না। আজকাল বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ সাইট গুলোর বদৌলতে আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন বয়েসের তরুন তরুণীরা সীসা লাউঞ্জ গুলোতে সীসার মাধ্যমে তামাক গ্রহণ করছে। অনেক অভিনেতা অভিনেত্রীর ও সীসা গ্রহণরত অবস্থার ছবি এসেছে। এখন কথা হল সীসা নিয়ে এত সমালোচনা কেন? বিশেষ করে যখন একজন নারী তা গ্রহণ করছে? এ কথা সত্য যে ধূমপান স্বাস্থের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বাহ্যিক পার্থক্য থাকলেও সিগারেটের সাথে সীসার গুণগত কোন পার্থক্য নেই। বাংলাদেশে প্রায় ৩৭% মানুষ সিগারেটের মাধ্যমে ধূমপান করে যার অধিকাংশই পুরুষ। আমরা কিন্তু আইন করে ও সিগারেট খাওয়া বন্ধ করতে পারি নি। তাহলে সীসা নিয়ে কথা উঠবে কেন? রাস্তা ঘাটে একটা ছেলে যখন সিগারেট খায় কই আমরা তো সমালোচনা করি না। কেন এটা কি পুরুষদের জন্মগত অধিকার। তাহলে একটা মেয়ে বদ্ধ লাউঞ্জে বসে সীসা গ্রহণ করলে সমস্যা কোথায়? এটা কি নিচু প্রকৃতির পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা নয়। অনেকে আবার এর মধ্যে ধর্মীয় রঙ চড়ান। তাদের জন্যই মূলত সীসার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে যে সীসা আসলে কোন সংস্কৃতির অংশ। একটা মেয়ে জন্মের পর থেকে তার বাবাকে দেখে আসে ধূমপান করতে, বড় হয়ে ভাইকে স্বামীকে দেখে ধূমপান করতে। তারা ধূমপান করলে কোন দোষ হয় না কিন্তু ওই মেয়ে ধূমপান করলে জাত পাত ধর্ম সব চলে যায়। ছিঃ ছিঃ একে মেয়ে মানুষ তার উপর আবার সীসা! সিগারেটের মতো আমাদের সমাজে সীসার উপর যদি শুধু পুরুষের অধিগ্রহন থাকতো তাহলে আর সমস্যা হত না। মেয়েদের ব্যাপারটাই সব জল ঘোলা করে তুলেছে। এদিক থেকে আমি মেয়েদের ধন্যবাদ জানাই। তাদের কারনেই মানুষ স্বাস্থের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর একটি বিষয় সম্পর্কে সচেতন হতে পেরেছে। দেখা যাক কত দূর কি হয়। আশা করছি ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রন) আইন, ২০০৫’ এর সংশোধনী এনে সরকার অতি শীঘ্রই সীসা লাউঞ্জ ও এর ব্যবহারকে অন্তর্ভুক্ত করবে কেননা আজ এটা সময়ের দাবী।

বিঃ দ্রঃ ধূমপান স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর