ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

কথা বলুন! ‘গণতান্ত্রিক’ (!) এই দেশে কথা বলবেন না তো কি করবেন! ‘ভাল’ কোন কাজ যদি নাই ই করতে পারেন তবে ভাল ভাল কথা বলে, অন্য যে কারো যে কোন ‘কাজের’ বা ‘অ-কাজের’ সমালোচনা করা সহ নিজের গুরুত্বপূর্ন মতামত প্রদান করে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করুন, ক্রোধ দমন করুন। আর কিই বা করার আছে আমাদের-আপনাদের! তবে একটু সাবধানে কথা বললে বিষয়টা সুন্দর হয়, যারা আপনাদের ‘গুরুত্বপূর্ন’ কথা শুনছেন তাদের জন্য (যদিও আপনি ভাবতেই পারেন আপনার কথা যারা শুনছেন সেই শ্রোতারা ‘নির্বোধ’)। কথা বলুন, কথা বলতে তো কোনো বাঁধা নেই, কথা বলুন সভা-সেমিনারে, কথার খই ফোটান টেলিভিশনের টক্-শোতে, স্টাফ-বাস, ঘরোয়া পরিবেশ, যে কোন ধরনের আড্ডায়, অথবা অফিসের কাজের ফাঁকে ‘ফাঁকি’ দিতে দিতে। কথা বলা এখন ‘ভাল’ যে কোন কাজ করার চাইতে অনেক বেশী নিরাপদ। ‘ভাল’ কাজ করার সুযোগ ও পরিবেশ এখন অনেক বেশী সংকীর্ন হয়ে গেছে। ‘ভাল’ কাজ করার অধিকার ‘ভাল’ মানুষের কতখানি আর আছে এখন?

দেশে ‘ভাল’ কাজ করার ‘অসুবিধা ও ঝুঁকি’ কতখানি মারাত্মক (!) তা টের পেলাম এই ক’দিন আগেই। অনেকেই হয়তো তা অনেক আগে বহুবারই টের পেয়েছেন এবং হয়তো বা মনে মনে এমন সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলেছেন যে, আর কোন ‘ভাল’ কাজ বেঁচে থাকেত করবেন না, একান্তই নিজ মঙ্গলের জন্য এমন ‘ভাল’ কাজ না করাই ভাল বৈকি! সেদিন বিকেল বেলা বাস থেকে নামতেই চোখে পড়লো রাস্তার পাশে ময়লা আবর্জনার মধ্যে পড়ে থাকা পাটের ছেঁড়া বস্তার কোনায় আগুন জ্বলছে এবং তা বাতাসে বেড়েই চলেছে। আশে পাশে কত দালান-কোঠা, ঘর-বাড়ী, অফিস, দোকান-কারখানা, গ্যারেজ, ব্যাংক! পরবর্তী ভয়াবহতা আশঙ্কা করে দ্রুত গতিতে গিয়ে পা দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছিলাম আর ভাবছিলাম যে, এই ছোট্ট আগুনের শিখা সব জ্বালিয়ে দিয়ে আরেকটি নীমতলীর ঘটনা ঘটাতে পারে! দূর থেকে আমার এই ‘বেকুববিপনা’ খেয়াল করছিলেন আমারই একজন ‘বিদগ্ধ’ সহকর্মী-বন্ধু-বড়ভাই যিনি আবার আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন একসাথে কিছুটা পথ যাবো বলে। আগুন নেভানো দেখে উনি ইতি উতি বার বার দেখতে লাগলেন, সামান্য হলেও আতঙ্ক আর বিরক্তি তাঁর চোখে মুখে। উৎকন্ঠাজড়িত নিচু স্বরে ডেকে বললেন, “আরে হইছে, আসেন তো! আর ভাল কাজ করার দরকার নাই”।

আমি এই ‘ভাল’ কাজটা করতে করতে আর তাকে দেখতে দেখতে একটা বিষয় অন্তত: বুঝতে পারছিলাম যে, বিষয়টাকে উনি ঠিক সহজভাবে নিতে পারছেন না। সামথিং ঢ়ং! কোন রকমে আগুনে ‘ধামাচাপা’ দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। পুরোটা নিভাতে পারি নাই, মনে হচ্ছিল বাতাসের কল্যাণে তা আবার ফুঁসে উঠতে পারে, একবার পেছন ফিরে তাকিয়েও দেখেছি, নেভানোর কাজটা পুরো শেষ না করেই চলে যেতে হচ্ছে বলে কিঞ্চিৎ অস্বস্তিও লাগছিল। সহকর্মীর ‘সিরিয়াস’ ধরনের আহ্বানে দ্রুত সাড়া না দিয়ে পারা গেলোনা, আগুন ফেলে সত্যি সত্যিই হাঁটা শুরু করলাম।
‘আরে ভাই, এই দ্যাশে ভাল কাম করতে গেলে বিপদ আছে! আপনারে আগুন নিভাইতে দেখলে কিছু মানুষজন আইসা আপনারেই দোষী বানাইয়া ফালাইতো, কইতো-আগুন ধরাইছ ক্যা? তখন আপনি যে আগুন নিভাইতেই চেষ্টা করতেছিলেন এটা আর কেউ বিশ্বাস করতো না, মাইর খাইতেন, মাইর। পাবলিকের মাইর একটাও মাটিতে পড়তো না, বুঝছেন?’। কথাগুলো শুনে আমারও খেয়াল হলো, তাই তো! আগুন দেখে কেন যে হুশ ছিল না! প্রানের মায়া তুচ্ছ করে এই ‘ভাল’ কাজ করার কি কোন মানে আছে? যাক, আজকের মতো সম্ভাব্য ‘অজানা’ ধরনের বিপদের হাত থেকে তাহলে বাঁচা গেল! যে হারে নতুন নতুন কায়দায় বিপদ ঘটানোর খবর পাওয়া যাচ্ছে! নব নব স্টাইলে বিপদ ঘটানোতেও এদেশের কিছু মানুষ কম আগায়নি তো! এ রকম কিছু হলে, থানা-হাজত হলে, বউয়ের কাছে মুখ দেখাতাম কি করে? মনে হলো, যাক বেঁচে গেলাম।

দুজন মিলে এদেশে ‘ভাল’ কাজ করার ‘ঝুঁকি ও অসুবিধা’ নিয়ে অসংখ্য উদাহরনসহ বিস্তর আলোচনা করতে করতে যার যার গুহায়, মানে বাসায় ফিরলাম। বাসাটাকে ‘বাসা’ না বলে গুহা বলাই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করি, দম নেয়া যায় না, দম ফেলাও যায় না, বিদ্যুৎ না থাকলে নিজের শরীরটাকেও দেখা যায় না দিনের বেলাতেই, দরজা-জানালা থাকলেও সেসব দিয়ে আলো আসতে পারে না, তবে মশারা, ইঁদুররা, তেলাপোকারা বেশ আরামেই যাতায়াত করতে পারে। পাশাপাশি দুটো বাড়ীর দেয়াল এখানে একটাই। মাঝে একহাতও জায়গা নেই। ঘরে শো-পিছ মার্কা ক’টা জানালা আছে আর কি! সেটাকে গুহা না বলে আর কি বলা যায়? আমার মনে হয়, বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে থাকা ‘বসবাসের অযোগ্য শহর’ এই রাজধানীতে বেশীরভাগ মানুষের বাসাই এরকম, আরো আরো খারাপও কম নাই। আমার সহকর্মীরটা ‘বাসা’ কি না জানি না, কোন দিন যাওয়া হয় নাই, একদিন উৎসাহ ও আনন্দ নিয়ে দাওয়াতও দেন নাই, তার বাসাটাকে গুহা বলাটা ঠিক্ হলো কি না বুঝতে পারছি না। এর সাথে নিশ্চয় উনার ‘প্রেস্টিজ’ জড়িত! প্রিয় সহকর্মী, আপনার ‘প্রেস্টিজের’ কোন সমস্যা করে থাকলে সত্যিই ক্ষমাপ্রার্থী।

যাই হোক, যা বলছিলাম। অন্ধকারে হাত আর পায়ের উপর মোটামুটি মানের ভরসা করে, হাত দিয়ে সিঁড়ির হাতল ধরে সন্তর্পনে সিঁড়ি বেয়ে নিজের গুহায় প্রবেশ করলাম । ভাগ্য ভাল বলতেই হবে! সাড়ে ছয় তলা পর্যন্ত উঠতে কোন আঙ্কেল বা আন্টি বা কারো কাজের ‘বুয়ার’ সাথে ধাক্কা খেতে হয়নি, সরিও বলতে হয়নি, এও কি কম? পরেরদিন কি হবে জানা নাই, আজকের মতো আর কোন বিপদ হবার আশঙ্কা নাই, যদি রাতের বেলা ভূমিকম্প না হয়। তাও বা বুঝি কেমন করে? এখন পর্যন্ততো এ মাসের খরচ নিয়ে বউয়ের সাথে আলাপই হয়নি!

খেয়ে-দেয়ে আয়েশ করে টেলিভিশন দেখতে বসলাম। কি কি দিয়ে খেলাম সেটা আর নাইবা উল্লেখ করলাম! ইদানীং খেতে বসলে খালি মনে হয় এই রকম দিন প্রায় এসে গেছে যখন আমরা অন্যদের কাছে গর্ব ও উচ্ছাস নিয়ে গল্প করবো যে, ওমকের বাড়ী গিয়েছিলাম, সেখানে ডিমভাঁজি দিয়ে ইরির চালের ভাত খেয়েছি! আর এ গল্প যারা শুনবে তারাও অবাক হয়ে ‘ওয়াও’ ‘ওয়াও’ ‘গ্রেট’ ‘গ্রেট’ বলতে থাকবে।

টেলিভিশন দেখি, প্রতিদিনই। এ-চ্যানেল সে-চ্যানেল, হিন্দী-ইংরেজী-বাংলা আর দেশ-বিদেশ করে করে হঠাৎ কোন দেশী চ্যানেল-এ চোখ আটকে যায়। টক্-শো। বাংলাদেশের ‘বরেণ্য’রা কথা বলে থাকেন এ-সব অনুষ্ঠানে। অনেককে দেখেই থেমে যাই, কি বলেন শুনি। আমার মতো হাজার-লক্ষ মানুষ তাদের কথা শুনে। কিছুক্ষণ শোনার পর বুঝি আলোচনার বিষয়বস্তুর সাথে তাঁদের কথার কোন সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক থাকে না। তাঁরা একই সাথে কথা বলেন আরো অনেক প্রসঙ্গে, তবে বেশীর ভাগই থাকে তথ্য-যুক্তি-রেফারেন্স বিবর্জিত ও অসঙ্গতিপূর্ণ। বোঝা যায় বিষয়বস্তুর ধার-কাছেও তাঁরা নেই। একটু উদাহরন দেয়ার চেষ্টা করি। ধরা যাক আলোচনার বিষয়ব্স্তু দ্রব্য মূল্যের উর্ধ্বগতি, বক্তারা কথা বলে থাকেন কমলালেবুর আকার, রং ও স্বাদ নিয়ে। মাঝে মাঝে দু-চারটা উদাহরন দিয়ে বাক পটুতার পরিচয় দিয়ে থাকেন বটে তবে তাতেও বোঝা যায় দ্রব্য মূল্যের উর্ধ্বগতি বিষয়টি আসলে প্রান্তিক, বরং দেশের কমলা বাগানকে খাল বানিয়ে ডিঙ্গা ভাসানোর প্রয়োজনীয়তা-ই এখানে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। নির্ধারিত বিষয়বস্তুর সাথে সঙ্গতিহীন হলেও শ্রোতারা হয়তো বিরক্তিবোধ করতেন না যদি তাঁদের মুখে দেশের অগনিত সমস্যার মধ্যে কোথাও কোন একটা সমস্যার সমাধানের কথা শোনা যেত। অনুষ্ঠানে যদি বক্তা একাধিক উপস্থিত থাকেন তাহলে পরিস্থিতি হয় দেখার মত। একজন আরেকজনকে দেখে নেওয়ার মত কথা বলতে থাকেন অবিরাম। শ্রোতা সাধারনের বিরক্তির বিষয়টি মাথায় রেখে উপস্থাপক-সঞ্চালক সাহেবদের সমন্বয় করার আকুল চেষ্টাও সেখানে ফেইলর হয়। বক্তারা শ্রোতা সাধারনকে উপেক্ষা করে যার যার অবস্থানে অনড় থেকে যান। ‘মহামাণ্যরা’ যা বলতে চেয়েছেন তাই-ই কেবল বলতে থাকেন, অন্য আর কিছু শুনতেও চান না, মানতেও চান না। কি বিষয়ে তিনি কথা বলতে এসেছেন একসময় সেটাও ভুলে যান, কেবল কথা বলার সুযোগ পেলেই হলো, ব্যস্। কারো কিছু মনে করা না করায় উনাদের কিছু আসে-যায় না, বাঘা বাঘা দু-চারজনের মনোতুষ্টি হলেই হলো! কথা বলার সময় তারা এটাও ভুলে যান যে তারা কোন্ সামাজিক অবস্থান থেকে জনসমক্ষে কথা বলতে এসেছেন। তাঁরা ভুলে যান, ঐ মূহুর্তে তাদের কতটা ‘দায়িত্বশীল’ হতে হবে বা একজন ‘ব্যক্তি’র ঐ মূহুর্তে কতখানি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া উচিত। আশঙ্কার বিষয় দেশে টেলিভিশন চ্যানেল বৃদ্ধির সুবাদে এ রকম টক্-শো আর বক্তার সংখ্যা দিনকেদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আমরা ‘মহামাণ্য’দের মতো ‘পন্ডিত’, ‘গুনী’, ‘প্রভাব-বিস্তারে সক্ষম’ ইংরেজীতে যাকে বলে ইনফ্লুয়েনসিয়াল ব্যক্তিদের কাছ থেকে ‘দায়িত্বশীল’ ও ‘যুক্তিশীল’ কথা প্রত্যাশা করি। তারা কেন যে ভুলে যান, উনাদের ‘অযৌক্তিক’ ও ‘দায়িত্বহীন’ কথা-বার্তা অনেকের মনেই ‘জ্বালা’ ধরিয়ে দেয়, হতাশ করে, ব্যঙ্গাত্মক হাসির উদ্রেক করে, সর্বোপরি অনেককেই নিরাশ করে। পরিশেষে বলতে চাই, ‘মহামাণ্যগণ’ কথা বলার সুযোগ পেলেই লাগামহীনভাবে ‘যা-তা’ বলে যাওয়ার প্রতিযোগিতা আপনাদের কারও কারও দু-চারটে ব্যক্তিগত সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরী করে দিলেও, মনে রাখা প্রয়োজন, তা দেশ ও জাতির কোন ধরনের ‘কল্যাণে’ কোন ভূমিকা রাখছে কি না। আর আপনাদেরকে যখন ‘টক্-শো’ অনুষ্ঠানে দাওয়াত করে নিয়ে আসা হয় (আবার শুনেছি কিছূ ‘সম্মানীও’ দেয়া হয়) তখন মনে রাখবেন আপনি অবশ্যই দেশের একজন গুরুত্বপূর্ন ও প্রয়োজনীয় মানূষ ! সারাদিন হারভাঙ্গা খাটুনির পর মানুষজন আপনার ‘মূল্যবান’ বক্তব্য শোনার আশায় টেলিভিশনের সামনে বসে; তাদের প্রতি এতটুকু সম্মান দেখানোর কি কিছু নেই? আগ-পিছ না ভেবে, দায়িত্ব-জ্ঞানহীন এমন বক্তব্য আপনারা দিতেই পারেন তবে সাবধান থাকবেন মানুষের কাছে ‘আজাইর‌্যা’ কথার ‘ওজনহীন’ মানুষ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠতে পারেন আপনি। বৈষম্যের এ দেশের মানুষ নানা সমম্যায় জর্জরিত, পারলে সেসব বিষয়ে সুপরিবর্তন আনয়নের জন্য কথা বলুন, আর যদি তা একেবারই সম্ভব না হয় তাহলে দাওয়াত পেলেও আর কোন টক্-শোতে আসার চিন্তা না করুন। তাতে আর কারও কোন উপকার না হলেও কিছু মানুষজনের মনে জ্বালা ধরানোর একটা পথ অন্তত: বন্ধ হয়ে যাবে।