ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 
22_women-protests-harassment_16042015_0002

গত দশ বছর ধরে প্রায় প্রতিবছর বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালেয়ের ক্যাম্পাসে থেকেছি, যে রকম ভীড় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে হয়, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই যুবক বয়সী নারী-পুরুষ এবং শিশুদের আধিক্য থাকে। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নববর্ষর দিন টইটই করে সারা ক্যাম্পাস ঘুরেছি, ফলে বর্ষবরণের সময় পুরো ক্যাম্পাসের ভিড়ের চরিত্রটি আমার মানসপটে আছে। ভীড়ের মধ্যে সব পুরুষ পকেটে হাত দিয়ে চলে না, তা আমি জানি, তবে বেশিরভাগ পুরুষ সুযোগে নারীর গায় হাত দেয়, সে কথাও বিশ্বাস করি না। তবে কিছু পুরুষ সুযোগটা নেয়। তবে খুব সাবধানে তারা কাজটি করে, যাতে ধরা না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখে, কারণ, নারী অপমানিত হলে, বা নারীর সম্ভ্রমহানী হলে- বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মত মানুষ চারপাশে এখনো যথেষ্ট আছে। আমি অবাক হচ্ছি- কেন সাধারণ জনতা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মত ক্যাম্পাস সংলগ্ন একটি জায়গায় এ ধরণের একটি ঘটনা ঘটতে দেখেও নির্বকার থাকল! জায়গাটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এবং বর্তমান শিক্ষার্থীরাই প্রধানত আড্ডা দেয়- সেদিক থেকে চিন্তা করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র সেখানে থাকাটাও খুব স্বাভাবিক ছিল।
আমি এক্ষেত্রে একটি সমীকরণ অবশ্যই মেলাবো। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি অভিজিৎ রায়কে যখন খুন করা হয়েছিল, তখনও সেখানে অনেক লোক ছিল, কিন্তু কেউ এগোয়নি! পহেলা বৈশাখও কেউ এগোল না! [লিটন নন্দী এবং সংগঠনের তার অন্য দুই বন্ধু বাদে] অস্ত্রধারী খুনিদের ধরতে কেউ না এগোলে তার একটি ব্যাখ্যা তবু একটু হলেও মেলে। কিন্তু এক্ষেত্রে? নাকি ঘটনা অন্যকিছু?
ভিড়ের মধ্যে নারীর গায়ে গাত দিতে কেউ সাহস করলেও, জামা টেনে খুলতে ভিড়ের মধ্যে কেউ সাহস করার কথা নয়। তাছাড়া ভীড়ের মধ্যে সঙ্গবদ্ধবাভে এ ধরণের ঘটনা ঘটানোর যুতসই কোন সমাজবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে বলেও আমার মনে হয় না।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, ঘটনাটি পরিকল্পিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন মৌলবাদীরা কোনদিন পছন্দ করে না। সবসময় বিষয়টিকে তারা বিতর্কত করতে চেয়েছে। তাছাড়া নারীদের উৎসব মুখর অংশগ্রহণ তারা আরো পছন্দ করে না। সেক্ষেত্রে পরিকল্পনা করে তাদের পক্ষে ঘটনাটি ঘটানো মোটেই অসম্ভব নয়। যাই বলি না কেন-এ ধরণের ঘটনা পহেলা বৈশাখের মত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নারী পারিবারিকভাবে আরো বাধার সম্মুখিন হবে নিশ্চিত।

ধারণা করা যায়- পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগে থেকেই ওরা পঁচিশ-ত্রিশজন জায়গাটির দখল নিয়ে রেখছিল, এবং বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের তথ্য থেকে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য থেকে জানা গিয়েছে- ওরা ভুভুজেলা বাজিয়ে জায়গাটিতে উচ্চশব্দ বজায় রেখেছিল যাতে মেয়েদির চিৎকার কারো কানে না পৌঁছায়।

ক্যাম্পাসে বাইরে থেকে যারা আসে, স্বাভাবকিভাবেই তারা একটু দমে থাকে, তাই যেকোন অপরাধমূলক ঘটনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মানসিক সাহস তাদের থাকে না। ধারণা করা যায়- ঐ কুকুরগুলো (ধর্ষক পুরুষগুলো) প্রথমে অনেক নারীর সাথে এমন আচরণ করেছে এবং কোন ধরণের প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের সম্মুখিন হয়নি, যে যার মত নিজেকে বাঁচিয়েছে চলে গেছ। এভাবে এক সময় তারা চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছেছে। দৃষ্টান্তমূলকভাবে একজন নারীর উপর নির্যাতন চালিয়েছে এবং যতটুকু কাভারেজ পেতে চেয়েছে তার চেয়েও বেশি কাভারেজ তারা (মৌলবাদীরা) নিয়ে নিয়েছে।

এ ধরণের ঘটনা বেশি বেশি প্রচার হওয়ার চেয়ে অপরাধীদের শাস্তি হওয়া বেশি জরুরী। এক্ষেত্রে অপরাধীদের ধরা খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়। অপরাধীদের ধরার ক্ষেত্রে জনতার তোলা ছবি কাজে আসবে।  নিশ্চয়ই মোবাইল ক্যামেরার এই যুগে কেউ না কেউ ঘটনার সময় ছবি তুলেছে বা ভিডিও করেছে। সেগুলো জোগাড় করা যেতে পারে। অপরাধীদের ধরে বিষয়টির গভীরতা কত দূরে, তা বের করা না হলে এ ধরণের ঘটনা এখানেই থেমে থাকবে বলে মনে হয় না।