ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

ফলের কথাই ধরা যাক- গাছের সব আম একসাথে পাকে না। তাই সব আম একসাথে পাড়ার অর্থ পাকা আমের সাথে কিছু পাকা আমও থাকবে। কাঁচা আমগুলো পৃথক করে, শুধু পাকা আম বাজারজাত করলে আমের দাম বাড়বে। সব আম একসাথে বাজারজাত করলে গড়ে কিছু দাম কমবে। আমাদের দেশের ক্রেতারা প্রথমত কম টাকায় বেশি কিনেত চায়। ডিমান্ড সাইডেরে এই মনোভাবটা ব্যবসায়ীদের মাথায় থাকে। তাছাড়া ক্রেতারা রংচংএ ভোলে, সে বিষয়টিও ব্যবসায়ীরা মাথায় রাখে। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা যেটা করে, সবগুলো আম একসাথে পাকানোর জন্য রাসায়নিক ব্যবহার করে, কারণ, প্রাকৃতিকভাবে পাকাতে গেলে বতি আমগুলো পাকবে, কাঁচা আমগুলো পাকবে না। ক্রেতারা যদি বাস্তবতা বুঝত, অর্থাৎ প্রতি কেজি ভাল পাকা আমের মধ্যে একটি-দুটি খারাপ আম মেনে নিত তাহলে রাসায়নিক ব্যবহারের বিষয়টি সম্ভবত আসত না। কিন্তু আমরা কী করি, একটা কিছু কিনে এমনভাবে ঘাটাঘাটি করে সেরাটা বেছে নিতে চাই যেন দোকানদার বাকিগুলো বিক্রী করবে না।

একটা বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বলি- দোকানে আম কিনতে গেলাম, একজন ক্রেতা পাঁচ কেজি আম কিনে এমনভাবে প্রতিটি আম বেছে বেছে নিল, ফলে বিক্রেতার পুরো তাওয়াটা পঙ্গু হয়ে গেল। ঐ ক্রেতা চলে যাওয়ার পর দোকানদারের সাথে কথা বললাম- দোকানদার দুঃখের কথা শোনালেন। বললেন- বেশিরভাগ ক্রেতাই এরকম, প্রচুর নাড়াচাড়া করে, কোনটি নেবে বুঝে পায় না, একটি বারে বারে ধরে। ক্রেতাদের এই সংকীর্ণ মানসিকতার প্রভাব বিক্রেতাদের উপর পড়ে। ফল সংরক্ষণ করা খুবই কঠিন, কালার ঠিক রাখা আরো কঠিন; ক্রেতারা যদি সচেতন না হয় এবং বিষয়টি না বোঝে তাহলে এক্ষেত্রে সততা বজায় রেখে ব্যবসা করা যায় না, ক্ষোভের সাথে ঐ দোকানদার কথাগুলো বলছিলেন।

বিষয়টির আরো গভীরে যাওয়ার জন্য সদরঘাটের পরিচিত একজন ফলের আড়তদারের সাথে কথা বলছিলাম। ওনার কথা থেকে কিছু রূঢ় বাস্তবতা উঠে আসল। উনি বললেন- যেটুকু ব্যবসা করার কথা আমরা সেটুকুই ব্যবসা করি, বেশি ব্যবসা যেটুকু করতে হয় তা সরকারি বাহিনী এবং মাস্তানদের চাহিদা পূরণের জন্য। উনি ব্যবসার আরেকটি দিকও তুলে ধরলেন- ব্যবসা ব্যাপারটা চাকরির মত না। এক্ষেত্রে ঝুঁকি আছে, তাই মাঝে মাঝে কিছু বেশি ব্যবসা করার প্রয়োজন পড়ে, না হলে লস ট্যাকল করা যাবে না। একইসাথে উনি সরকারের অব্যবস্থাপনার কথা জানালেন- খুব যৌক্তিক একটা বিষয় ওনার কথা থেকে উঠে আসল- পঁচনশীল পণ্যের ট্রাকগুলো কেন আটকে থাকবে? এ ধরনের পণ্যের ব্যবসা যারা করে তারা জানে এক্ষেত্রে ঝুঁকি কতটা বেশি।

একজন মাছ ব্যবসায়ীও এরকম কথাই বলেলেন, আমাদের দেশে পচনশীল পণ্য পরিবহনের জন ফ্রিজ ট্রাক নেই। নরমাল ট্রাকে পণ্য আসে। মারাত্মক গরমে সময়মত ট্রাক আসতে না পারলে বরফে কাজ হবে না, মাছ পঁচে যাবে। এ দায় কে নেবে? মাওয়া এবং অরিচা ঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাক আটকে থাকে। ট্রাকের জন্য সেখানে আলাদা টার্মিনাল এবং আলাদা ফেরির ব্যবস্থা করতে সরকারের কত টাকা খরচ হত? খুব বেশি খরচ হত না, কিন্তু সরকার তা করেনি। দশকের পর দশক ধরে এভাবেই চলছে। ক্ষোভের সাথে কথাগুলো বলছিলেন মাসুদ রানা নামে ঐ মাছ ব্যবসায়ী।

আসলে সমস্যা হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্রে। অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতির কারণেই ফরমালিনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা সবসময় অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। তারা ভাবতে বাধ্য হয়- এই বুঝি সব শেষ হয়ে গেল। এ ধরনের মানসিকতা তৈরি হওয়ার কারণেই তারা অসৎ পথে গিয়ে বেশি ব্যবসা করতে চায়, ঝুঁকিমুক্ত থাকতে চায়।