ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে পশ্চিম পাকিস্তানীরা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের খাঁটি মুসলিম মনে করত না। বর্তমান সময়ে ওপার বাংলার মানুষ বাংলাদেশের মানুষদের খাঁটি বাঙ্গালী মনে করে না। অামারা যে ধরনের বাংলা ভাষায় কথা বলি সেটিও প্রমিত নয় বলে তারা মনে করে। এটা ভাষা ও বাঙ্গালীত্ব বিষয়ে পশ্চিম বাংলার মানুষের বাংলাদেশের মানুষ সম্পর্কে ধারনা। গোটা ভারতাবাসী বাংলাদেশকে আসলে কীভাবে দেখে? বাংলাদেশের প্রতি ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিই বা কী? কারো মনোভাব বোঝা কঠিন, তবে বাংলাদেশের প্রতি ভারতবাসীর মনোভাব যে কোনদিন আন্তরিক ছিল না তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অমীমাংসিত বিষয়গুলি। ভারত চাইলে বিষয়গুলো মীমাংসা হয়ে যেত একদিনের মধ্যে এবং তাতে ভারতের হারানোর তেমন কিছু ছিল না। কিন্তু ভারত সবসময় ইুস্য তৈরি করে রেখেছে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ভাটার দেশ হওয়ায় ভারতের জন্য পোয়াবারো হয়েছে, পানিই হচ্ছে তাদের প্রধান বাজির ঘোড়া। প্রশ্ন হতে পারে- ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে কী চায়? অর্থাৎ বাংলাদেশের কাছ থেকে পাওয়ার এমন কী আছে, যা ভারত পাচ্ছে না এবং যার জন্য পানি চুক্তিগুলো বারে বারে আটকে যায়? সত্যিকার অর্থে- অনেব বিষয় আছে, মুখে যাই বলা হোক না কেন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কটি আসলে বাধ্যবাধাকতার, বন্ধুত্বের নয়। আমরা বলি- ভারত আমাদের কাছ থেকে সবই পেয়েছে, কিন্তু ভারত তা মনে করে না। এ ব্যাপারে পশ্চিম বাংলার কয়েকজনের সাথে ফেসবুকে কথা বলে তাদের মনোভাব জানতে পেরেছি। আমরা বলি- ভারত বাংলাদেশে বৃহৎ বাজার পেয়েছে। বাজার পাওয়ার বিষয়টি সত্য, তবে ওরা মনে করে- বাজারটি বাংলাদেশ ভারতের হাতে তুলে দেয়নি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ টাকার অংকে সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানী করে চীন থেকে, এবং চীন থেকে বাংলাদেশ এমন অনেক পণ্য আমদানী করে যা ভারত থেকেও আমদানী করা যেত। আরো উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে এমন অনেক পণ্য আমদানী করে যা ভারত থেকে আমদানী করা যেত। সেক্ষেত্রে টাকার অংকে বাংলাদেশ ভারত থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ আমদানী করলেও ভারত তাতে খুশি নয়। তারা মনে করে- বাংলাদেশ বাধ্য না হলে ভারত থেকে কিছু আমদানী করে না। তাই একথা স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, বাংলাদেশ থেকে রপ্তানী অায়ে ভারত খুশি নয়, বরং তাদের ভাষায়- বাংলাদেশে রপ্তানি করে খুব বেশি লাভ করার সুযোগ ভারতের তৈরি হয় না, স্টাটাসকো মেইনটেইন এর জন্য তারা কম দামেও অনেক সময় রপ্তানি করতে বাধ্য হয়।
এরপরে আসে টিভি চ্যানেলের কথা। ভারতের অনেক চ্যানেল বাংলাদেশে দেখানো হয়, কিন্তু বাংলাদেশের কোন চ্যানেল ভারতে দেখানো হয় না। এটি অনেক দিনের একটি সমস্যা। এ ব্যাপারে ওপার বাংলার বেশিরভাগ মানুষ মনে করে- বাংলাদেশের চ্যানেল ভারতে দেখানোর প্রয়োজন নেই। ফেসবুকে দশজনের সাথে কথা বলে মাত্র তিনজন পেয়েছি যারা বাংলাদেশের চ্যানেল ভারতে চালু হওয়া উচিৎ মনে করে। তাহলে আপনাদের চ্যানেল কেন এখানে চলবে –এমন প্রশ্নের জবাবে তাদের বক্তব্য- ‘আপনারা বন্ধ করে দেন।’ এটা পাবলিকের বক্তব্য। বন্ধ করা সহজ নয়। স্টার জলসা/স্টার গোল্ড বন্ধ করলে স্টার স্পোর্টস/বিবিসি/সিএনএন/জিওগ্রাফি/ডিসকভারির মত চ্যানেলগুলো বন্ধ করা লাগবে। অর্থাৎ শাকের সাথে যেমন পোকা আসে তেমনি স্টার জলসা/স্টার গোল্ডের মত চ্যানেলগুলো বাংলাদেশ সরকার চালু রাখতে বাধ্য হয়।
এররকম বাধ্যবাধকতা সবক্ষেত্রে আছে। খাদ্যাভাস্যের কারণে বাংলাদেশের মানুষ পেঁয়াজ বেশি খায়, কিন্তু বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ হয় না, ফলে পেঁয়াজের মূল যোগানটা আসে ভারত থেকে। ভারত যদি পেঁয়াজের রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, তাহলে সাথে সাথে পেঁয়াজের দাম ষাট/সত্তর টাকা হয়ে যায়। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে পেঁয়াজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলেই ‘ওনিয়ন ডিপ্লোম্যাসির’ মত টার্ম তৈরি হয়েছে।
সর্ববশেষ এবং প্রধানত বাংলাদেশ ভারতের কাছে বাধ্য হয়ে রয়েছে জঙ্গি দমন বিষয়ে। একথা অনেকে স্বীকার করে যে, পাশ্ববর্তী দেশ ভারত না হলে বাংলাদেশকেও পাকিস্তান অথবা আফগানিস্তানের বাস্তবতা বরণ করতে হতে। লাগাতারভাবে জঙ্গী তৎপরতা বিষয়ে তথ্য দিয়ে বাংলাদেশকে ভারত সহযোগিতা করে যাচ্ছে, যেটি আমরা পাবলিক না জানলেও সরকারের উচ্চ পর্যযায়ের লোকেরা বলে থাকেন।

অর্থাৎ ভারতের উপর বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় নির্ভরশীলতা যেমন রয়েছে, অাবার জঙ্গী উত্থানের আশংকার কারণে ‘অপ্রয়োজনীয়’ নির্ভভরশীলতাও রয়েছে। এখন, যত বেশি নির্ভরশীলতা কমানো যাবে বাংলাদেশ ততটা কার্যযকরভাবে বাধ্যবাধকতার সম্পর্ক থেকে ভারতের পেটের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় কাজ না করে ভারত বিরোধিতায় সরব থাকার অর্থ নিজেদের আরো বেশি করে কোনঠাসা করা। অামাদের প্রয়োজন সক্ষম হওয়া, এবং জঙ্গীবাদের বীজ এখানে বপিত হতে না দেওয়া। ভারত আমাদের কলোনি ভাবে, কিন্তু আমরা কখনই ভারতকে প্রভু ভাবি না, ভাববও না। কিন্তু শুধু ভারতকে প্রভু না ভাবার মধ্য দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না, হবে কি? আমরা ভারতকে প্রভু ভাবি না, কিন্তু আমেরিকা/ইউরোপের প্রভুত্ব বরণ না করে নিয়ে আমাদের উপায় থাকে না, এতে ভারত ভাবার সুযোগ পায়- তাহলে প্রতিবেশী হিসেবে আমরাও কেন প্রভু নই? সক্ষমতা অর্জন করে আমাদের প্রমাণ করতে হবে- কেউই আমাদের প্রভু নয়। সমানে সমান হতে হবে, তাহলে ভারত হোক আর আমেরিকা হোক কেউ-ই আর আমাদের কলোনি ভাবার সুযোগ পাবে না।