ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

একটা বড় ভুল হচ্ছে। বলা হচ্ছে নাস্তিকতার কথা, কিন্তু ওরা আসলে নাস্তিকদের হত্যা করছে না। নাস্তিকতামানেই সম্প্রদায়মুক্তির গ্যারান্টি নয়। উগ্র সাম্প্রদায়ীক নাস্তিক আছে বহুত। আসলে নাস্তিকতা বলে তো কিছু নেই। প্রত্যেকেরই কোন না কোন বিশ্বাস রয়েছে। প্রচলিত ধর্মকর্মে বিশ্বাস না থাকলে তাকে বলা হচ্ছে নাস্তিক। আসলে যৌবনকালে ‘নাস্তিক’ অনেকেই। তাই নীরব নাস্তিকতা এখানে বিশেষ কোন সমস্যা না। সমস্যা হচ্ছে ‘ইসলাম বিদ্বেষী’ ট্যাগিং-এ। সম্প্রদায়মুক্ত হয়ে কিছু বলতে গেলে মুসলমানরা বলবে ও ইসলাম বিদ্বেষী, হিন্দুরা বলবে ও হিন্দু বিদ্বেষী। কারণ, প্রত্যেকটি ধর্মের আড়ালে রয়েছে জাতিস্বত্তা। ধর্ম কেউ মানুক বা মানুক জাতিসত্তা প্রায় সবাই মেনে চলছে। ফলে কোন ধর্মের সমালোচনা আসলে ধর্মের সমালোচনা থাকে না, ওটা একটি জাতিসত্তার সমালোচনা হিসেবে বিবেচিত হয়। দেখা যায়, ধর্মের সাথে একমত না হলেও সমালোচনাটা শেষ পর্যন্ত কেউ-ই মানতে পারে না জাতিসত্তার কারণে। অর্থাৎ কোন ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে কয়েকশো কোটি মানুষের জাতিস্বত্তার বিরুদ্ধে কথা বলা। হত্যাকরীদের শক্তি এবং উৎসাহের জায়গা মূলত এটাই।

যেহেতু বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট একটি দেশ, তাই স্বাভাবিকভাবেই এখানে ধর্ম নিয়ে সমালোচনাটা প্রধানত ইসলাম ধর্ম নিয়েই হয়। এর ফলে সমালোচনাকারীকে প্রথমত নাস্তিক হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও শেষ পর্যন্ত সে ইসলাম বিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত হয়। অন্যধর্মের হলে চিহ্নিতকরণ আরো সহজ হয়। অর্থাৎ শুধু নাস্তিকতায় সমস্যা নেই, সমস্যা হচ্ছে ‘নাস্তিক এবং ইসলাম বিদ্বেষী’ অথবা শুধু ‘ইসলাম বিদ্বেষী’ অথবা ‘আস্তিক কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী’ হিসেবে চিহ্নিত হলে। ‘আস্তিক কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী’রা সহজে হামলার শিকার হবে না, কারণ, এর বিপরীতে রয়েছে ‘আস্তিক কিন্তু হিন্দু বিদ্বেষী’। উভয় দিকে দল ভারী। সহজে কেউ কাউকে আক্রমণ করবে না। নাস্তিক কিন্তু হিন্দু হৈতষী, এটা হিন্দুদের কাছে কোন সমস্যা না। নাস্তিক কিন্তু ইসলাম হিতৈষী, এটা মুসলমানদের কাছে কোন সমস্যা না, যদি কেউ মুখে না বলে সে নাস্তিক। মুখে বললেও যে খুব সমস্যা তা নয়, কারণ, নিজেকে নাস্তিক ঘোষণা দিয়েও অনেকে এদেশে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছে। নাস্তিকতার কারণে হুমায়ূন আজাদ হত্যাকাণ্ডের শিকার হননি, হয়েছেন ইসলাম ধর্ম নিয়ে তাঁর কঠোর সমালোচনাধর্মী লেখাগুলোর কারণে। আহমদ ছফা ঘোষিত নাস্তিক ছিলেন, কিন্তু কোন সমস্যা হয়নি। এখনো এদেশে অনেক ঘোষিত নাস্তিক আছে, তাদের কোন সমস্যা হচ্ছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে নিজেকে নাস্তিক বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন, তাদের কোন সমস্যা হচ্ছে না।

সমস্যা হচ্ছে- নাস্তিক এবং মানব হিতৈষীদের নিয়ে। অাস্তিক এবং মানব হিতৈষীদের সমস্যা নেই, যদি তারা কোন ধর্মের সমালোচনা করতে না যায়। এখন মানবের হৈতষী হতে গেলে, মানবমুক্তির বাধাগুলো নিয়ে কথা উঠবেই। সেই কথাগুলো বলতে গিয়ে কেউ হয়ত প্রেক্ষাপট বিচার করছে না, যেনতেনভাবে একটা কিছু বলে ফেলছে। যেহেতু এরা সংখ্যায় কম এবং সজ্ঞবদ্ধ নয়, তাই সহজ টার্গেটে পরিণত হয়েছে। এদের মধ্যে যারা হিন্দু (জন্মসূত্রে), তারা আরো সহজ টার্গেট। এবং রাজনৈতিক টার্গেট। সহজ টার্গেট, কারণ, ইসলাম বিদ্বেষী হিসেবে সণাক্ত করে হিন্দু কাউকে মারলে প্রতিবাদ হবে তুলনামূলক কম, আমজনতার কাছ থেকে এক্ষেত্রে কিছুটা বেশি মনস্তাত্বিক সমর্থন পাওয়া যাবে। পরপর চারজন ব্লগার নিহত হওয়ায় এবং তাদের মধ্যে তিনজন হিন্দু (জন্মসূত্রে) হওয়ায় জনসাধরণের মধ্যে এমন একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে যে, এই সরকারের সময়ে হিন্দুরা ভীষণ আসকারা পেয়েছে, এমনিক তারা ইসলামের মূলস্তম্ভেও আঘাত হানছে। এর সামাজিক প্রতিক্রিয়াও হচ্ছে ভয়ানক। মারাত্মক সাম্প্রদায়িক সমস্যা এদেশে আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। অবিশ্বাস চরমে পৌঁচেছে, এক কথায় সমাজটা বিষিয়ে উঠেছে। তাই ‘ব্লগার’ হত্যাকাণ্ড মানে শুধু একজন ব্যক্তি খুন হওয়া নয়। খুন হচ্ছে আমাদের অসাম্প্রদায়িকতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসের ভণিতা। সাদা ব্যান্ডেজ অনেকখানি ইতিমধ্যে সরে গিয়েছে, পুরোপুরি সরে গেলে তখন বোঝা যাবে ক্ষত কতটা গভীর!