ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

ধর্মমতে জন্মদিন পালন নিষিদ্ধ, যদিও এর বিপরীত ব্যাখ্যা আছে বলে শুনেছি। ঈদে মিলদুন্নবী এবং জন্মাষ্টমীর মত কৃষ্টিগুলো প্রমাণ করে জন্মদিন পালনে ধর্মের কোন ব্যত্যয় নেই। অবশ্য অনেকে বলে থাকেন, ইসলাম ধর্মে জন্মদিন পালন আসলেই নিষিদ্ধ। সে যাইহোক, ধর্ম নিয়ে পড়াশুনা আমার নেই, আমার আগ্রহের জায়গাও সেটি নয়। কিন্তু এটুকু বুঝি- জন্মদিন পালন অত্যাবশ্যকীয় কোন বিষয় নয়, এটি বিনোদনের একটি অনুষঙ্গ মাত্র। আমার পিতার মৃত্যু দিবস এবং আমার জন্মদিন একই দিনে পড়লে অবশ্যই আমি জন্মদিন উদ্যাপন না করে শোক দিবস পালন করব, এবং এটাই মনুষ্যত্ব।
তুমুল আলোচনা হয়- ১৫ আগস্ট আসলে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন কিনা, আমি সে আলোচনায় আগ্রহী নই। কেউ যদি বলে, অমুক দিন আমার জন্মদিন, তাহলে সেটিই অন্যদের মেনে নিতে হবে। ১৫আগস্ট নিশ্চয়ই অনেক মানুষেরই জন্মদিন, চার দেয়ালের মধ্যে অনেকে তা উদ্যাপন করছেও হয়ত, কিন্তু পাড়ার জরিনা সখিনার জন্মদিন উদ্যাপন আর বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ঘটা করে জাতীয় শোক দিবসে জন্মদিন উদ্যাপন অবশ্যই এক বিষয় নয়। তাই যারা বলেন, ১৫ আগস্ট কি কারো জন্মদিন থাকতে পারে না, তাদের মনোবিকার এবং ভাবনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তেই হয়। ধরে নিচ্ছি- ১৫আগস্ট বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন। তাহলেও কি তিনি গণমাধ্যমকে জানান দিয়ে জাতীয় শোক দিবসের দিন জন্মদিন উদ্যাপন করতে পারেন? এটি কি সরাসরি বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নেওয়া নয়? এটি কি আমাদের জাতীর পিতা, বঙ্গবন্ধু এবং মহান মুক্তিযুদ্ধকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানো নয়? এটি কি বঙ্গবন্ধুর খুনীদের স্বীকৃতি দেওয়া নয়? এটি কি একাত্তরের পরাজিত শক্তিকে সমর্থন জোগানো নয়? নাকি এটি শুধু সমর্থন নয়, বরং একাত্তরের পরাজিত শক্তি এবং বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের সদর্প অবস্থানের প্রতিকী আয়োজন এটি?
অনেকের মতে অবশ্য বিএনপি নামক দলটি ৭১’র মুক্তিযদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত চেতনার সাথে কখনই সাযুজ্যপূর্ণ দল ছিল না। ’৭৫ পরবর্তী সময়ে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ছিল তাদের একটি ভণিতার জায়গা, কারণ, তখনো মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম যথেষ্ট সোচ্চার ছিল, তাই তাদের ভেতরে ক্ষোভ যাতে চূড়ান্ত রূপ না নেয়, সেজন্য বিএনপি’র জনক মেজর জিয়াউর রহমান তখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখার একটি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি জনগণকে দিয়েছিলেন। আসলে ভেতরে ভেতরে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি এবং ’৭১ র পরাজিত শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করাই ছিল বিএনপি’র মূল এজেন্ডা। তারা তা সফলভাবে করেছেও। তাই জাতীয় শোক দিবসে বিএনপি নেত্রীর কেক কর্তন কোনো বিস্ময়কর বিষয় নয়। ধিরে ধিরে সে প্রেক্ষাপট তারা তৈরি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের একটি প্রজন্ম চলে গিয়েছে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে তারা কৌশলে অপসংস্কৃতি ঢুকিয়ে দিয়ে জাতীয় শোক দিবসে কেক কাটার জনসমর্থন আদায় করেছে।
এর চেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হচ্ছে- বিএনপি’র এ রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব আস্কারা পাচ্ছে কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ অনেক জ্ঞানীগুণীর কাছ থেকেও। অর্থাৎ গত কয়েক দশকে তারা বিশাল যে কোষাগার তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে, তা দিয়ে এখনো বাংলা এবং বাঙ্গালী সংস্কৃতি ছুড়ে ফেলে ‘পাকিস্তান’ কায়েমের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যেতে পারছে। গত কয়েক দশকে তারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুগত, অযোগ্য ভৃত্য বসিয়েছে, বিভিন্ন ছদ্মবেশে তারা ক্রিয়াশীল আছে এখনো। এই কেক কাটার মধ্য দিয়ে দেশের ক্ষমতাবানদের (আমজনতা নয়) একটি অংশের মনোভাব স্পষ্ট হয়েছে, এবং তাতে ভালোই হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে এটি বোঝা সহজ হয়েছে- ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্র কায়েমের জন্য লড়াইয়ের জায়গাটা এখনো বেশ প্রশস্ত, এবং সেক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ শুধু জঙ্গিবাদ নয়, বরং জঙ্গিবাদের মূল উৎপাটন এবং সমর্থকগোষ্ঠী নিঃশ্বেষ করা সর্বাগ্রে জরুরী।