ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

আমার পরিচিত এবং আত্মীয়ের মধ্যে কয়েকজন রয়েছে, যারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। কথাটা থারাপ শুনালেও সত্য যে, এদের কারোরই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতা নেই, এবং পড়ার প্রয়োজনও নেই। এদের একজনে আর্কিটেকচারে পড়ে। আর্কিটেকচারে পড়ার মেধা তার নেই, স্রেফ টাকা দিয়ে নাম কামাইতে গেছে। বাপের নাভিশ্বাঃস উঠিয়ে ছাড়ছে। আরেকজন পড়ে ফ্যাশন ডিজাইনে, তার পিতা নেই, আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পড়তে হয়, কী পড়ছে, তা সে নিজেই জানে না। তার এইসএসসি’র রেজাল্টও আঁতকে ওঠার মত, বিজ্ঞান থেকে সি গ্রেডে পাশ করেছিল সে। এরকম অনেক উদাহরণ আছে। ভাল শিক্ষার্থী কিন্তু প্রাইভেটে পড়েছে, এরকম উদাহরণ খুবই কম। বেশিরভাগ টাকা দিয়ে স্টাট্যাস কিনতে যায় ওখানে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি, এ বক্তব্য হাতে গোনা দু’একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে খাটতে পারে, যদিও আমি বিশ্বাস করতে রাজি নই। সত্য হচ্ছে- প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আর পাঁচটা ব্যবসার মতই, অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় তো রীতিমত সার্টিফিকেট বিক্রীর দোকান।
আমার এক ছাত্র এইসএসসি পাশ করার পর ইংল্যান্ডে চলে গিয়েছিল, ওখানে গিয়ে কাজ করেছে, কিন্তু পড়াশুনা করা হয়নি। দেশে এসে ওর মনে হয়েছে- পড়াশুনা করা দরকার। এর মাঝে হঠাৎ ও আবিস্কার করেছে- যেহেতু এইসএসসি পাশের পর ইতিমধ্যে চার বছরের বেশি সময় চলে গিয়েছে, তাই এখন ইচ্ছে করলেই কোনো একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে নেওয়া যায়। ও উত্তরার কোনো একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ’র সার্টিফিকেট ম্যানেজ করে, এবং কিছুদিন পরে মালয়শিয়ায় চলে যায়। এরকম উদাহরণ আছে ভুরি ভুরি, ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে, তারপর ঘুষ দিয়ে চাকরি ম্যানেজ করে নিচ্ছে না, তারই বা প্রমাণ কোথায়? সার্টিফিকেট বিক্রীর মত ভয়ংকর একটি বিষয় প্রাইভেট ভার্সিটির সাথে জড়িত রয়েছে।

সেদিকে আর না গেলাম। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সমাজে কতটা অস্থিরতা তৈরি করেছে, সে বিষয়ে আসি।

কিছুদিন আগে আমার এলাকার এক গার্ডিয়ান তার ছেলেকে নিয়ে আমার কাছে এসেছিল পরামর্শ নিতে, ছেলে বায়না ধরেছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। পিতার সামার্থ নেই, ছেলে এক বিঘা জমি বিক্রী করে ভর্তি করাতে বলেছে। পিতা বুঝে উঠতে পারছে না। আমি ঐ ছেলে এবং পিতা দু’জনকে বুঝানোর চেষ্টা করলাম। এই বলে বুঝানোর চেষ্টা করলাম যে- একটা চাকরি করার সামার্থ অর্জন করার জন্য আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই লাগে না, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এত টাকা খরচ করে পড়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। শেষ পর্যন্ত আমার বুঝানো কাজে আসেনি। পিতা জমি বেঁচতে বাধ্য হয়েছে। এই অস্থিরতার দায় কে নেবে? লাগামহীন শিক্ষা ব্যবসার জন্যই এটা হয়েছে। সমাজের মানুষ এখন স্ট্যটাস খুঁজছে সবকিছুতে, সেই সুযোগটাই নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি সবচেয়ে বেশি ঘটছে। কোনোমতে এইসএসসি পাশ করে যেকোনো একটি এপার্টমেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পরিচয় দিচ্ছে- বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। পিতা-মাতারাও কিছুদিন গর্ব করছে, কিন্তু অচিরেই অন্ধকার দিকটা বেরিয়ে আসে, পরিবারে তৈরি হচ্ছে অশান্তি।
যে কোনো মূল্যে এখন এই কালচার বন্ধ করা দরকার। মানসিক সামার্থ না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার দরকার নেই, এটি বুঝালে কেউ বুঝবে না, তাই বিভিন্ন শর্তারোপের মাধ্যমেই লাগাম টেনে ধরতে হবে, সেক্ষেত্রে করারোপ অবশ্যই একটি উপায় হতে পারে, তবে সরকারের উচিৎ ছিল ভ্যাট ইম্পোজ করার আগে আরো অনেক বিচার-বিশ্লেষণে যাওয়া। তবে এই চাপটা কেন শিক্ষার্থীরা নিচ্ছে সেটি আমার বোধগম্য নয়, চাপটা দেওয়া হয়েছে মালিকদের উপর। ছাত্ররা চাপ অনুভব করবে টিউসন ফি বাড়ালে এবং তাদের আন্দোলনও করতে হবে তখন, এবং আন্দোলনটা করতে হবে মালিকদের বিরুদ্ধে, সরকারের বিরুদ্ধে নয়।