ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

“মাসে মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা বেতন পাইতা। এতদিনে ম্যানেজার হয়ে যাইতা। গ্রামে বসে মাসে লাখ টাকা অায় করতা। দশ বছর পরে ডিজিএম হয়ে যাইতা। পেনশন রিটায়মেন্ট শেষে দুই কোটি টাকা পাইতা। … “
ইত্যাদি কথাবার্তা আমাকে রোজ কারো না কারো কাছ থেকে শুনতে হয়। তারা মনে করে কৃষি ব্যাংকে চাকরি পাওয়াটা ছিল বিশাল এক ঘটনা। আমি পড়াশুনা করছি কিনা, কোথায় আছি এলাকার অনেকেই হয়ত তা জানত না। তাদের চোখের সামনে হাফ প্যান্ট পরা জামার বোতাম উঁচু নিচু করে লাগানো একটি বোকা বালকের ছবিই ভেসে থাকার কথা। তো যখন তারা শুনল এলাকার কেউ একটা ভালো চাকরি পেয়েছে, এবং সে হচ্ছে আমি, তাতে তারা বিস্মিত হয়েছে। এইজন্য, তাদের অনুভূতিকে আমি সম্মান জানাই। কেউ যখন আমার চাকরি নিয়ে কোনো প্রশ্ন করে, আমি বলি আরো বেশি টাকা আয় করব বলে ছেড়েছি। ক্ষুধার সাথে নিত্য লড়াই করা মানুষের কাছে অন্য কোনো মহৎ যুক্তি দাঁড় করানো মানেই তাদের দুর্ভাগ্যকে উপহাস করা হত। যখন বলি- আরো ভালো সুযোগ আছে বলেই তো… তাতে তারা আশ্বস্ত হয়।

আসলে কি তাই? মোটেই না। কৃষি ব্যাংকের চাকরিটা বাই চান্স ছিল না, বাই চয়েচ ছিল। ব্যাংকের চাকরি করার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না, চাকরি করারই কোনো ইচ্ছে আমার কখনো ছিল না। প্রথম চাকরির পরীক্ষা দিই অনার্স পাশ করার আড়াই বছর পর! তখন বয়স আটাশ (উল্লেখ্য, রিয়েল বয়সের চেয়ে আমার সাটিফিকেটে বয়স বেশি, তাতে অবশ্য ভালো হয়েছে) । এবং ঐটা কৃষি ব্যাংকই। কৃষি ব্যাংকে চাকরি করতে চাওয়ার কারণ ছিল-

১। আমি গ্রামে থাকতে চেয়েছিলাম (বাড়িতে);
২। কৃষি কাজের প্রতি আমার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।

রিক্রুটমেন্টে আমি ছিলাম ফোর্থ অবস্থানে, ফলে চাইলে আমি পোস্টিং ঢাকায় রাখতে পারতাম, কিন্তু পাততাড়ি গুটিয়ে আমি গ্রামেই চলে গিয়েছিলাম। মনোযোগ দিয়ে ছয় মাস চাকরি করেছি, মনোযোগ না দিয়ে করেছি আরো ছয় মাস, তারপর খাতা কলমে আরো এক বছর চাকরি করলেও বাস্তবে করিনি। কেন?

যে চাকরিটা আমি চয়েস করে নিলাম, সেই চাকরিটা আমি কেন ‘ছেড়ে’ দিলাম? সোজা উত্তর হচ্ছে- যে প্রত্যাশা থেকে চাকরি নিয়ে গ্রামে যাওয়া, আমার মনে হয়েছিল কোনোভাবেই সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে না। কৃষি ব্যাংক কে অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীরা হজম করে রেখেছে ভয়ানকভাবে, অামার যেসব বন্ধুরা চাকরিটা করছে তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি- কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, কিন্তু ওখানে থেকে ভালো কিছু করা সম্ভব নয়। অনেকে হয়ত বলবেন- নিজে ভালো থাকলে ঠেকায় কে? না, এটা কোনো কাজের কথা না, নিজে ভালো হয়ে চুপটি করে ঘরে বসে থাকার জন্য এত বিদ্যা বুদ্ধি অর্জন করতে হবে কেন? আবর্জনা সরিয়ে কিছু কাজ করার জন্যই তো এত পড়াশুনা, নাকি? কিন্তু দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আবর্জনার স্তুপ এতই উঁচু যে, ও ঠেলে সরাতে গেলে নিজেই চাপা পড়তে হবে। ভয়ানকভাবে চলছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু কৃষি ব্যাংক কেন, ধারণা করি বাংলাদেশর সকল প্রতিষ্ঠানের অবস্থা এমনই।

বর্তমান ব্যবস্থায় একটি রাষ্ট্র হচ্ছে কিছু প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি, তো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা যদি এই হয়, তাহলে এ থেকে রাষ্ট্রের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। আত্মীয় স্বজন বন্ধু-বান্ধবদের শুধু এটুকুই বলার আছে, জীবিকার প্রয়োজনিয়তা আমি খুব ভালো বুঝি। ২০০২ সালে ঢাকায় এসেছিলাম এক হাজার টাকা পকেটে নিয়ে, ২০১৩ সালে চাকরি ছেড়ে যখন ঢাকায় আসলাম তখন আমার পকেটে একশো টাকা। যেহেতু চাকরি করি বলে সবাই জানে, তাই কারো কাছ থেকে টাকা ধার চাওয়ারও সুযোগ ছিল না, বরং উল্টো অনেকে টাকা চাবে সেটাই স্বাভাবিক।

চাকরি ছেড়ে ফের ঢাকায় এসেছিলাম থার্টি ফার্স্ট নাইটে। ঐ রাতে কোনো আত্মীয়ের বাসায় ওঠার সুযোগ ছিল না, কারণ, তারা ইতিমধ্যে জেনে গিয়েছে যে, আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। সুর্বণা কে নিয়ে যখন ঢাকা পৌঁছুলাম, তখন রাত সাড়ে বারোটা, হোটেলে ওঠার টাকা নেই, ক্যাম্পাসে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু ক্যাম্পাসে ঢোকার প্রতিটি গেটে টহল, আমি ঢুকতে পারলেও ওকে নিয়ে ঢোকা সম্ভব ছিল না। অবশেষ কীভাবে যেন জগন্নাথ হলের গেট পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিলাম, তারপর হলের কর্মচারি বিধান দা কে ডেকে ওনার বাসায় সুবর্ণা কে রেখে আমি এক ছোট ভাইয়ের রুমে গিয়ে ঘুমালাম। আমি আবার ঐ রুমে হলে থাকলাম তিনমাস, সুবর্ণা কে উঠালাম ফার্মগেটের এক হোস্টেলে। এরকম অবস্থায়ও আমাকে পরিবারের ভরণ পোষণ করতে হয়েছে, নিজে চলতে না পারলেও প্রতি মাসে আট-দশ হাজার টাকা পরিবারের পিছনে খরচ করতে হয়েছে চরম দুর্দিনেও। আমি ভাগ্যবান, এবং ভাগ্যের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধও রয়েছে যথেষ্ট। নইলে I should have been abolished.

… জীবিকার এরকম সংকটের মুহূর্তেও যেহেতু কাঙ্ক্ষিত চাকরিটা ছেড়েছি, তাই নিশ্চয়ই সেরকম কোনো কারণ আছে। হা, কারণ আছে, এবং সেই কারণটাই জাগিয়ে তুলতে চাইছি। আজকে একজন উকিলকে (সরকারি) যখন বিষয়টা বুঝিয়ে বলছি- তখন উনি আমাকে বলছেন, আপনি এতদিন মামলা করেননি কেন? আমি বললাম, মামলা চালানোর পয়সা ছিল না। উনি আমার হয়ে মামলা চালানোর খরচ বহন করতে চাইলেন। বললাম, এখন মামলা চালানোর মত পয়সা আমার কাছে আছে।