ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আমি কোনোদিনই ভালো ছাত্র ছিলাম না, কিন্তু অনেকের ধারণা ছিল আমি ভালো ছাত্র। মামাবাড়ি থেকে বলা হল, বৃত্তি পরীক্ষা দিতে। বাবা একটা বৃত্তির বই কিনে দিয়ে গেছিলেনও, বইটা নিয়ে আমি পড়তে চলে গেছিলাম বাগেরহাটে বড় মামার বাসায়। পড়ব কি? আমি তো তখন ঈশপের মত রাস্তায় গাড়ি চলা দেখি। পার্থক্য, গাড়ি দেখে ঈশপ চেঁচায়, আর আমি তখন চুপচাপ বিস্মিত হতাম। হঠাৎ বাবার মৃত্যুশয্যার খবর শুনে সেই বিশাল এক বৃত্তির বই ব্যাগে ভরে বাড়ি চলে আসলাম।

তখন বর্ষাকাল। ডাক্তার বলেছে মৃত্যুর জন্য দিন গুণতে। কবিরাজ বলছে, নানান কিছু। একমাস ধরে আমাদের বাড়ি হয়নি এমনকিছু নেই। কালির বার, মঁনশার বার, কীর্তন -সবই হয়েছে। এর মাঝে এক কবিরাজ দাওয়াই দিল, একশো রকম গাছের পাতা রস করে খাওয়ালে ক্যান্সার সেরে যাবে। আমি বিশ্বাস করে বসলাম। একশো রকম গাছের পাতা সংগ্রহ করা গ্রামেও খুব সহজ কথা নয়। মনে রাখার বিষয়ও আছে। এখনো আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, একশো রকম গাছের পাতা ঠিকমত গুণতে পারি নাই ক্লাস ফাইভে পড়েও!

বৃত্তি পরীক্ষার কথা বলছিলাম। তার আগে আরেকটা অপরাধের কথা বলি। অসৌচ হলে কড়া নিয়ম পালন করতে হয় হিন্দু সংস্কৃতিতে। আমিও তখন পালন করেছিলাম। ত্রিশদিন এক নাগাড়ে পালন করতে হয়, কিন্তু একদিন আমি চুরি করে ইলিশ মাছ খেয়েছিলাম। বিষয়টা মনে পড়লে ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে দেখতে ইচ্ছে হয়, এক কাপড়ে হাতে একখান তুলসীর ডাল নিয়ে ঘোরাফেরা করলে ঐ বয়সী একটা ছেলেকে কেমন লাগে? কেউ একটা ছবি তুলেও রাখল না!!

দেখতে দেখতে বৃত্তি পরীক্ষার দিন ঘনিয়ে এল। দাদু নিশ্চিত যে আমি বৃত্তি পাব। উনি ঐরকমই নিশ্চিত থাকতেন সবসময়। আমি তো জানতাম… । ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষা একদিনে দুটো হত। দুইদিনই প্রথম পরীক্ষাটা মোটামুটি দিয়েছিলাম। দ্বিতীয়টা আর দিতে ইচ্ছে করত না। আধা ঘণ্টা থাকতে বেরিয়ে এসে মামাকে বলতাম, লেখা হয়ে গেছে। সে তো মহাখুশি, কারণ, ভাবতেন, সব পারি বলেই তো হয়ে গেছে।

পিছন ফিরলে এরকম হাজারো স্মৃতি উঁকি দেয় মনে। কি যেন এক আজব ফ্রেমে বন্দী হয়ে আছি আজকাল। ঘুরেফিরে অতীত এসে আহত করছে আমায়।