ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

একটা ঘটনা সবসময় আমি চেপে রেখেছি। চয়েজে করে চাকরি নিয়েও কেন আমি কৃষি ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিলাম, এ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি আমি বহুবার। কিন্তু সত্য ঘটনা সবসময় আমাকে চেপে যেতে হয়েছে। সবাইকে বলতে হয়েছে ভগিচগি একটা কিছু।

আমি কৃষি ব্যাংকের চাকরি চয়েজ করে নিয়েছেলিাম, কারণ, গ্রামের বাড়িতে থেকে ভালো বেতনে এই একটি চাকরিই করা যায়। তাছাড়া কৃষি ব্যাংক দেখে আসছি সেই ছোট বেলা থেকে সে কারণেও আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

আমিই তো রোজ নিজেকে একবার করে প্রশ্ন করি যে আমার সামনে কোনো বিকল্প ছিল কিনা। আসলে বিকল্প ছিল না।

বাবুল আক্তার ইস্যু তৈরি না হলে কখনই সত্য ঘটনাটা এই মুর্হূতে আমি প্রকাশ করতাম না। কারণ, জনতা এসব বুঝবে না, উল্টে অহতেুক জনতার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে দুর্বল অবস্থায়, যেখান থেকে সুযোগ নিতে পারে অনেকে।

এসপি বাবুল আক্তাররে ঘটনার কারণে আমার বিশ্বাস হয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে ভেতরে কী হয় তা জনতা কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারবে। প্রথাবিরোধীরা (ঘুষ-দুর্নীতি-জুচ্চুরি প্রথার বিরোধী) যে ভালো কিছু চায়, সেটি তারা বুঝবে।

কৃষি ব্যাংকরে চাকরি থেকে কেন আমি দূরে আছি সেটি ডিটেইলস বলি। তাতে আমার বোঝা অন্তত একটু হলেও কমবে।

আমি ১/১২/২০১১ তারিখে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, বিভাগীয় কার্যালয় খুলনায় উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করি। ৫/১২/২০১১ তারিখে প্রথম কর্মস্থল হিসেবে মোল্লাহাট, বাগেরহাট শাখায় যোগদান করি। যোগাদানের পর আমি এতটাই কড়াকড়ির শিকার হই যে আমার মাস্টার্স পরীক্ষাও ঠিকমত দিতে পারিনি। একটি পরীক্ষা দিয়ে গিয়ে একদিন অফিশ করে পরের দিন ঢাকায় এসে আবার পরীক্ষা দিতে হয়েছে।

কিছুদিন পরে ট্রেনিং এ যাই। এরপর বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ শেষে শাখায় ফিরলে আমাকে পুরনো লেজার, বিশেষ করে কু-ঋণগুলো হিসেব করে (যোগ করে) আলাদা কাগজে লিখতে বলা হয়। কাজটি করতে গিয়ে আমার চোখে কিছু অসংগতি ধরা পড়ে। অসংগতিগুলো নিশ্চিত হয়, যখন আমাকে একজন দালালের সাথে টাকা আদায় করতে ফিল্ডে পাঠানো হয়। দেখলাম, ভয়ভীতি দেখিয়ে একেবারে ছা-পোষা মানুষের কাছ থেকে কু-ঋণের উপর ৫০০/১০০০ টাকা বা যেমন সম্ভব আদায় করা হলেও তা খাতায় উঠছে না।

এছাড়া ঋণ সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অসংগতি চোখে পড়ে। যেমন, ধরা যাক কেউ ২০,০০০ টাকা ঋণ নিয়েছিল। সুদে আসলে তা এখন দাঁড়িয়েছে ৩৫,০০০ টাকায়। তাকে বলা হল, যেহেতু তুমি শোধ করতে পারছ না, তুমি এবার ৪০,০০০ টাকা ঋণ নাও। সে চল্লিশ হাজার টাকা ঋণ নিল, কিন্তু কোনো টাকা হাতে পেল না। তার পূর্বের ঋণ শোধ হল। আবার তার নামে ৩৫,০০০ টাকা ঋণ বরাদ্দ হল। ক্লোজিংএ ঋণ পরিশোধও হল, ঋণ প্রদানও হল। কিন্তু আসলে তো ব্যাংকও ঠকল, ব্যক্তিও ঠকল। এবং একইসাথে প্রশ্ন দাঁড়াল মাঝখান দিয়ে ৫,০০০ টাকা কোথায় গেল?

এর চেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয়ও আছে। ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী কোনো আসল সুদে-আসলে দিগুণ হয়ে গেলে, তার ওপর আর সুদ চার্জ করা যায় না। মোল্লাহাটা শাখায় (আমি শুধু মোল্লাহাট শাখার কথা জানি) সে নিয়মেরও বালাই ছিল না। লেজারে নিয়মানুযায়ী টানা থাকলেও গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হত।

ঋণ সমন্বয়ে গ্রাহকরা এবং ব্যাংক কীভাবে ঠকে সে বিষয়টি আর একটু পরিষ্কার করার প্রয়োজন রয়েছে। ধরা যাক, কেউ ঋণ নিয়েছিল ৩০,০০০/- টাকা। সুদে-আসলে তা এখন ৫৮,০০০/- টাকা হয়েছে। টাকাটা আর ২,০০০/- টাকা বাড়তে পারে। নিয়মানুযায়ী এর চেয়ে বেশি বাড়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ গ্রাহক যদি ঋণের টাকাটা শোধ করে, তাহলে সর্বোচ্চ তাকে ৬০,০০০/- শোধ করতে হবে।

কিন্তু ব্যাংক এক্ষেত্রে যেটা করে, ছা-পোষা গ্রাহককে ভয়ভীতি দেখিয়ে ঋণ সমন্বয় করে দেয়। তার নামে এবার বরাদ্দ যদি হয় ৬০,০০০/- টাকা, তাহলে কোনো একদিন তাকে বা তার বংশধরকে সর্বোচ্চ শোধ করতে হবে ১,২০,০০০/-। যেখানে সে ৬০,০০০/- শোধ করে পারত, কোনো টাকা নতুন করে হাতে না পাওয়া সত্ত্বেও এবং ব্যাংকে কোনো টাকা জমা না হলেও ভবিষ্যতে তাকে শোধ করতে হবে ১,২০,০০০/- টাকা। এরকম পদে পদে শুভঙ্করের ফাঁকি আছে কৃষি ব্যাংকে। হয়ত অন্য ব্যাংকেও আছে, জানি না।

এছাড়াও ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে এমন অনেক ঋণ ঐ শাখায় রয়েছে যে ঋণ গ্রহীতার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। পদে পদে অনিয়ম রয়েছে বাগেরহাট, মোল্লাহাট শাখায়। বিষয়গুলো অমানবিক এবং অগ্রহণযোগ্য মনে করে খুলনার তৎকালীন মহা ব্যবস্থাপক এবং কৃষি ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান বরাবর দুটি মেইল করি। উক্ত মেইলের প্রেক্ষিতে বাগেরহাটের মূখ্য আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক এবং খুলনা হতে আরো একজন উপ-মহাব্যবস্থাপক বিষয়টি সরজমিনে তদন্তে আসেন। তবে মূলত, আমাকেই ওনারা জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন, এবং মৌখিকভাবে বলেছিলেন, একজন নবাগত কর্মকর্তা হিসেবে আমার ওসব না দেখাই ভালো। এটা ছিল মূলত প্রচ্ছন্ন হুমকি।

এরপর ব্যাংকে ম্যানেজার আমাকে ইনএকটিভ রাখতে শুরু করেন। আমি স্বেচ্ছায় একাউন্ট খোলার কাজটি নিই। সেখানেও বিপত্তি বাধে, কারণ, ঐ শাখায় একাউন্ট খুলতে ৫০ টাকা করে নেওয়া হত। আমি টাকাটা না নেওয়ায় ট্রেন্ড নষ্ট হয়, এবং তাতেও অন্যরা আমার উপর অসন্তুষ্ট হন।

মাঝে মাঝে এমন অনেক ঘটনা শাখায় ঘটতে থাকে যে শাখায় চাকরি করাই খুব কঠিন হয়ে যায়। আমার জিনিসপত্র হারাতে থাকে, ব্যাগ হারিয়ে যায় ইত্যাদি। তারপরও আমি পরিস্থিতি মেনে নিয়ে কাজ করতে থাকি।

এরপর হঠাৎ ১২/৮/২০১২ তারিখে আমার নামে মোল্লাহাট শাখায় একটি বদলীর আদেশ আসে। এবং সে মোতাবেক ০৬/০৯/২০১২ তারিখ, বৃহস্পতিবার আমি বিভাগীয় কার্যালয় বরিশালে যোগদান করি। মনে করেছিলাম, বরিশালেই আমার পোস্টিং, কিন্তু ঐদিনই আমার নামে আরেকটি বদলীর আদেশ করা হয়, এবং ০৯/০৯/২০১২ তারিখ, রবিবারের মধ্যে ভোলা জেলার চরফ্যাশন শাখায় যোগদান করতে বলা হয়।

এটা ছিল আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন, কারণ, আমি যেহেতু পরিবারের একমাত্র ভরণপোষণকারী এবং আমার মা অসুস্থ, তাই এত দ্রুত এরকম দুটি বদলীর সম্মুখিন হয়ে মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম।

চরফ্যাশন শাখায় গিয়ে যা ঘটতে থাকে তা ছিল আরো অমানবিক। আমাকে শাস্তিপ্রাপ্ত হিসেবে বিবেচনা করা হতে থাকে, যে ধরণের শাস্তি বড় ধরনের অনিয়ম বা চুরির দায়ে কাউকে দেওয়া হয়। আমি ছিলাম উধ্বর্তন কর্মকর্তা, কিন্তু চরফ্যাশন শাখায় আমাকে পরিদর্শকদের নিচে থেকে কাজ করতে হত।

এছাড়াও অনেক আনঅফিশিয়াল ব্যাপার ঘটতে থাকে। অজানা মোবাইল নাম্বার থেকে হুমকি আসে ইত্যাদি। চরফ্যাশন শাখায় কিছুদিন চাকরি করার পর মানসিক এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি এবং বাড়ি চলে যাই। শুক্রবার এবং শনিবার বাড়িতে থেকে আবার চাকরিতে যোগদান করার ইচ্ছে ছিল, তবে মানসিক এবং শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হওয়ায় আমি চাকরিতে যোগদান করতে অসমর্থ হই এবং বিষয়টি চরফ্যাশন শাখার ব্যবস্থাপক মহোদয়কে ফোনে এবং টেলিগ্রামের মাধ্যমে জানাই।

আমি কৃষি ব্যাংকে লক্ষ্য নিয়ে যোগদান করেছিলাম। ছোটবেলায়, আমার পিতা মারা যাওয়ার পর কৃষি ব্যাংকে আমাদের একটি ঋণ ছিল, যেটি শোধ করতে আমাদের খুব কষ্ট হয়েছিল। ছাত্র জীবনে আমি মনে মনে রেখেছিলাম, কৃষি ব্যাংকে চাকরি করতে হবে এবং বাড়িতে থাকতে হবে। কৃষি ব্যাংকের চাকরির পরীক্ষায় মেরিট লিস্টে চতুর্থ পজিশনে থেকে আমি যোগদান করেছিলাম। খুলনা অঞ্চলে মেরিট লিস্টে আমি এক নম্বরে ছিলাম।

যাইহোক, এরপর আমার মানসিক অবস্থা খুবই বাজে অবস্থায় পৌঁছায়। বাড়িতে বসবাস করার মত অবস্থাও আমাদের তখন ছিল না। বাধ্য হয়ে মা এবং স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসি এবং নিজের চিকিৎসা করাই। চিকিৎসায় আমার ক্রোনিক ডিপ্রেসনের পাশাপাশি প্যানক্রিয়েটিক সমস্যা ধরা পড়ে। কোনো খাবার হজম হত না। তখন আমার অতল সমুদ্রে পড়ে যাওয়ার মত অবস্থা। বুঝে পেতাম না কী করা উচিৎ।

এরপর মূল সার্টিফিকেটের প্রয়োজনে হেড অফিশে যোগাযোগ করি। কর্মী ব্যবস্থাপনা বিভাগ-১ হতে জানতে পারি যে আমার সার্টিফিকেট হেড অফিশে নেই, ওটি রাখা হয়েছে বরিশাল জিএম অফিশে। এরপর কী করেছিলাম আমার ঠিক মনে নেই, তবে চরফ্যাশনের শাখা ব্যবস্থাপক মহোদয়ের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। সর্বশেষ সার্টিফিকেট আনতে শাখায় গেলে আমাকে আঞ্চলিক অফিশে যোগাযোগ করতে বলা হয়, আঞ্চলিক অফিশে যোগাযোগ করলে আমাকে একমাত্র রিজাইন দেওয়ার মাধ্যমে সার্টিফিকেট নিতে হবে বলে জানানো হয়।

অনুরোধ করে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে আমি বাধ্য হয়ে রিজাইন দিয়ে সার্টিফিকেট নিই। তবে ঢাকায় এসে একটি মেইল করে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহোদয়কে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। এবং এরপর মাঝে মাঝে চেষ্ট করেছি পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে চাকরিতে আবার যোগদান করতে। একইসাথে তখনও আমি ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে। চাকরিতে যোগদান করার মত যথেষ্ট ফিট ছিলাম না। সবমিলিয়ে একটা লম্বা সময় কেটে যায়। এরপর যতই চেষ্টা করি না কেন কোনোভাবেই বিষয়টি আমি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে আর আনতে পারিনি।

শেষ পর্যন্ত অবস্থা দাঁড়িয়েছে, পরিবারের কাছে আত্মীয়স্বজনরে কাছে বন্ধু-বান্ধবের কাছে আমি একজন অপরাধী, কারণ, যেহেতু আমাকে চাকরি ছেড়ে আসতে হয়েছে।