ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

ব্যবস্থাপক এবার তার লোন রিশিডিউল করে দেবে। ধরলাম, সে ঋণ নিয়েছিল ৩৬০০০ টাকা। ব্যাংক এবার তার নামে লোন পাশ করবে ৪২০০০  টাকা (ধরলাম)। তার পূর্বের ঋণ শোধ হয়েছে, সাময়িক ঝামেলা মুক্ত হয়ে স্বস্তির নিশ্বাঃস ফেলে এখন সে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি এসে ঘুম দেবে।

 

গ্রামে গিয়ে গত বছর এক স্কুল জীবনের সহপাঠির সাথে দেখা হল। নানান কথার ফেরে যেটা বুঝলাম- সে জীবিকার সংকটে আছে। একটা ভ্যান চালাত, বেঁচে দিতে হয়েছে। এখন সে বেকার। আমার কাছে কোনো সহযোগিতা চায়নি, কিন্তু সাহায্য তার দরকার সেটি গোপনও করেনি।

আমি ওকে আমাদের একটা পুকুরে মাছ চাষ করতে বললাম। টাকা দিতে চাইলাম। দিলামও। ও পুকুরে চৌদ্দ হাজার টাকার মাছ ছাড়ল। দুই হাজার টাকার জাল দিয়ে ঘিরে দিল। এক বছরে খাবার বাবদ নূন্যতম ২০০০০ টাকা ধরলে ঐ প্রজেক্টের খরচ দাঁড়ায় ৩৬ হাজার টাকা। সাথে ওর পরিশ্রম। টাকার অংকে তা মাসে ২০০০ টাকার কম তো নয় এই বাজারে। তাহলে যোগ হয় আরো ২৪০০০ টাকা। মোট বিনিয়োগ দাঁড়াল- ৬০০০০ টাকা।

ওর সাথে বসে একটা খসড়া হিসেব করে দেখলাম, সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে প্রজেক্ট থেকে ৪০০০০ টাকা লাভ হতে পারে। সমস্যা হচ্ছে, এই ‘যদিটা’ প্রায়ই বাস্তবে রূপ নেয় না। এক্ষেত্রে তো সব খরচ ঠিকমত ধরা হয়েছে, কিন্তু গ্রামের বেশিরভাগ ক্ষুদ্র (মাছ) চাষি আসলে এই টাকাটা বিনিয়োগ করার ক্ষমতা রাখে না। বিনিয়োগ করতে হয় ধার-দেনা করে। অথবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে।

কৃষি ব্যাংকের ১০% -এর কৃষি ঋণ ঘুষসহ গিয়ে দাঁড়ায় ২০% এ। এর মানে সে ৩৬০০০ টাকা বিনিয়োগ করলে ওটা আসলে ৪৩২০০ টাকার সমান বিনিয়োগ হয়। এই ধরনের প্রজেক্ট ব্যর্থ হওয়ার একশোটা কারণ আছে, তার মধ্যে বৈজ্ঞানিকভাবে করতে না পারা অন্যতম কারণ।

আমাদের প্রজেক্টে কী হল? ব্যর্থ হল। সবকিছু বিজ্ঞানসম্মতভাবে করার পরও কেন ব্যর্থ হল? কারণ, হঠাৎ বন্যায় পুকুরটা ভেসে গেছে। এ দায় কার? নিশ্চয়ই কারো না। আবার কারো? দায়টা আসলে সবার নিতে হবে, যেহেতু কৃষক প্রাইমারি উৎপাদক এবং শ্রমজীবি। রাষ্ট্র দায় নেওয়া মানে দায়টা সবার নেওয়া হয় যেহেতু রাষ্ট্র জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলে।

এক্ষেত্রে টাকাটা যদি ঋণ ধরি, তাহলে আমার সহপাঠি ব্যাংকের টাকা এখন শোধ করবে কীভাবে? পরের বছর মাছ চাষ করবে কীভাবে? এই ঋণের চাপ সে এখন সামাল দেবে কীভাবে?

ব্যাংক কিন্তু তাকে ক্রমাগতভাবে চাপ দিয়ে যাবে এবং মাঝে মাঝে ব্যাংক থেকে পরিদর্শক এসে একটা কিছু বুঝিয়ে ২০০ বা ৫০০ টাকা নিয়ে যাবে যা জমা নাও হতে পারে পরিশোধের খাতায়। এভাবে একসময় লাল নোটিশ দেওয়া হবে তাকে, শেষ পর্যন্ত দালাল এসে বুঝিয়ে তাকে ব্যাংকে হাজির করবে, কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ব্যাংক ক্লোজিং-এ আদায় ভাল দেখাতে চায়।

(যে খবর মাঝে মাঝে আমরা প্রথম আলোর মত পত্রিকায় দেখতে পাই- “কৃষি ব্যাংকে লক্ষ্যমাত্রার ১০০ ভাগ ঋণ বিতরণ, ৯০ ভাগ আদায়”)

ব্যবস্থাপক এবার তার লোন রিশিডিউল করে দেবে। ধরলাম, সে ঋণ নিয়েছিল ৩৬০০০ টাকা। ব্যাংক এবার তার নামে লোন পাশ করবে ৪২০০০  টাকা (ধরলাম)। তার পূর্বের ঋণ শোধ হয়েছে, সাময়িক ঝামেলা মুক্ত হয়ে স্বস্তির নিশ্বাঃস ফেলে এখন সে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি এসে ঘুম দেবে।

আগে তার ঋণ সুদাসলে ছিল ৩৯০০০ টাকা, যা শোধ হল। তাহলে তার নামে ৪২০০০ টাকা এবার পাশ হল কেন? বাকি টাকাটা কোথায় গেল, তাকে তো দেওয়া হল না?

একবার ভরাডুবি হয়েছে বলে মাছের চাষ করতে আর সে যাবে না। এখন হয়ত সে ৫০০ টাকার তরকারী সকালে কিনে সারাদিন বেঁচে ২০০ টাকা লাভ করে সংসার চালাচ্ছে, অথবা পরের বাড়িতে কাজ করছে, কিন্তু ঋণ শোধ করার টাকা তার হাতে কোনোভাবেই জমে না। পরের বছর আবার রিশিডিউল-এর প্রশ্ন। চক্র এক সময় গিয়ে শেষ হয়, যখন প্রাথমিক ঋণ সুদাসলে ডাবল হয়ে যায়, কারণ, তারপরে আর সুদ যোগ করা যায় না। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, কৃষি ব্যাংকের (অবশ্যই অন্য ব্যাংকও) লেজার ঘাটলে এই জায়গাটিতে হাজার হাজার ঘাপলা পাওয়া যাবে।

আচ্ছা, ধরা যাক, তার প্রজেক্টটি সফল হল। পরিকল্পনা ছিল মোট ১০০০০০ টাকার মাছ বিক্রী হবে। ধরুণ, কই মাছ। আজকে ঢাকার এক বাজার থেকে বড় সাইজের এক কেজি চাষের কই কিনলাম ১৫০ টাকা দরে। কিনে আমি বিস্মিত এবং সন্তুষ্ট! কীভাবে সম্ভব?

এক্ষেত্রে উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থার কারণে ক্রেতা লাভবান হল, আর লাভবান হল মাছের খাবার ব্যবসায়ী। মাছ/মাংসের কাঁটাকোটা দিয়েই মাছের খাবার তৈরি হয়, যার দাম ক্ষেত্রবিশেষ ওঠা-নামা করলেও গড়ে ৪০ টাকা কেজি বিক্রী হয়। খাবারের বাজার দর মাছচাষী চাইলেও নামাতে পারবে না, কারণ, মাছের খাবার পঁচনশীল নয়, আর মাছের খাবারের ব্যবসায়ী প্রান্তিক চাষীর চেয়ে স্বচ্ছল, তার অপেক্ষা করার সুযোগ আছে।

মাছ বড় করতে হলে খাবার দিতেই হবে। আবার মাছ বেশি বড় হলে তা বেঁচতেও হবে, কারণ, বড় হয়ে গেলে এক সময় মাছে খাবার খাবে বেশি কিন্তু বাড়বে কম। ফলে দ্রুত ধরে বেঁচতে হবে। কৃষক তো আর এই মাছ হাটে গিয়ে খুচরো বেঁচবে না। গ্রামের বাজারে কয়েক মণ একই মাছ ওভাবে বিক্রি করার সুযোগ নেইও। সে দেবে পাইকারকে।

এখন ভেবে দেখুন তো, আমি যদি ঢাকায় বসে এক কেজি মাছ ১৫০ টাকায কিনি, তাহলে কৃষক কত টাকায় বিক্রী করতে বাধ্য হয়েছে? ধরলাম, সে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রী করেছে। হিসেব করে শেষ পর্যন্ত দেখা গেল প্রজেক্ট সফল হওয়া স্বত্বেও সে কোনোমতে আসল বাঁচাতে পেরেছে। তাহলে সে এখন ঋণ শোধ করবেই বা কী করে আর খাবেই বা কী?

১৫০ টাকায় বাজারে চাষের কই বিক্রী হওয়া মন্দ নয়। তাতে কম আয়ের একটা শ্রেণির আমিষের চাহিদা মেটে। কিন্তু প্রান্তিক কৃষকের হবে কী? তাদের জন্য তো একটা সমাধান বাতলাতে হবে। নইলে তো তারা মরতেই থাকবে। আধুনিক সভ্যতা তো কারো শবদেহের উপর ভর করে টিকে থাকতে চায় না, চাওয়ার কথা নয়।

এইক্ষেত্রে আমি যেটা বুঝি-

১। কৃষককে ঋণ দিতে হবে নামমাত্র সুদে (হতে পারে, ১০০০০০ টাকা পর্যন্ত ২% সুদে);

২। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকবে, প্রতি বছর এলাকা বিশেষ নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রান্তিক কৃষককে ঋণ দিতে হবে;

৩। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হলে অতি-প্রান্তিকদের ঋণ নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত মওকুফ করতে হবে। যেমন, ১০০০০ টাকা পর্যন্ত মওকুফ করা যেতে পারে। এর মানে এই না- যে ১০০০০ টাকা বা তার কম ঋণ নিয়েছে সে শুধু মওকুফ পাবে। ১০০০০০ টাকা পর্যন্ত ১০০০০ টাকা মওকুফ করা যেতে পারে।

৪। বীজ, খাবার ইত্যাদি কৃষককে বিনামূল্যে দিতে হবে। নিশ্চয়ই অনেক না। মেম্বার-চেয়ারম্যানকে বাছাইয়ের দায়িত্ব দিয়ে ঝামেলা বাড়ানোর দরকার নেই। যেমন, জন প্রতি ১০০০ পোনা (ধানের বীজ বা অন্য কিছু, যা-ই হোক না কেন, তা নির্দিষ্ট পরিমাণ) ১০০ কেজি খাবার বা সার-কীটনাশক ইত্যাদি বিনামূল্যে দেওয়া যেতে পারে। এটা ধনী গরীব সবাই পাক, ক্ষতি নেই। কেউ যদি কিছু বীজ আর ১০০ কেজি খাবারের জন্য পুকুর মাছ চাষ করে সে তো ভালোই।

৫। ঋণের, বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষি ঋণের পুনঃতফসিলিকরণের উপর গভীর পর্যবেক্ষণ দরকার;

৬। ঋণ প্রদানে ঘুষ নেওয়া এবং ভুয়া কাগজপত্রের উপর ঋণ দেওয়া বন্ধ করার জন্য কার্যকর উপায় খুুঁজে বের করা দরকার।

নিশ্চয়ই আরো অনেক কার্যকর উপায় খুঁজে পাওয়া যাবে দরদ দিয়ে ভাবলে। কৃষক ঋণ নিতে ব্যাংকে যাবে না (মানে না গেলেও), ব্যাংক ব্যবস্থা এমন হতে হবে, ব্যাংক প্রতিনিধি ঐ এলাকায় এমন কৃষক খুঁজে বের করবে যে কে বা কারা সামান্য টাকার অভাবে চাষাবাদ করতে পারছে না।

আধুনিক ব্যাংক ব্যাবস্থা যদি শুধু টাকা লেনদেন আর হিসেব-নিকেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে তো তা সভ্যতার সাথে বেমানান। সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্য সমতা বিধানে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে ব্যাংক, কিন্তু সেই খাতটি আমাদের দেশে একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থায় আছে। মরছে প্রান্তিকরা, কারণ, তারা ঋণ খেলাপি হতে পারে না। তারা ভয় পায়, তারা ভয়ে ব্যাংকে হাজির হয়। তাদের মাঝে মাঝে ঋণের দায়ে পুলিশে ধরেও নিয়ে যায় মামলা হলে!