ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

বাচ্চা কোলে নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি বা বাচ্চাদের দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করানোর দৃশ্য ঢাকা শহরে সচরারচর দেখা যায়। ইদানিং খুব ছোট বাচ্চা কোলে নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি বেশি দেখা যায়। সন্ধ্যের পরে অপেক্ষাকৃত অন্ধকার জায়গায় তাদের দেখা যায়। খবর নিয়ে জানা যায়, কখনো তার বাচ্চার মা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেয় কখনো অন্য কিছু বলে। সেগুলো যাচাই করা জনতার দায় হতে পারে না, কিন্তু ঐ বাচ্চাটি তো সবার দায়, আমার, এই সমাজের, রাষ্ট্রের এবং পুরো পৃথিবীরও।

এগুলো যদি ‘সৎ’ ভিক্ষাবৃত্তি হয় তাহলে বাচ্চা নিয়ে ওভাবে অন্ধকার জায়গায় বসে পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষের কাছে ভিক্ষা চাইবে কেন? বরং আলোতে বসবে, তাই না? ভিক্ষা চাইতে লজ্জা পায় বলে অন্ধকারে বসেছে? হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।

কিন্তু এভাবে চলতে পারে না। চাইলেই যে কেউ একটা মানুষ পৃথিবীতে নিয়ে আসবে, তাকে নিয়ে যাচ্ছেতাই করবে, এটা হয় না। ভরণপোষণ তো শুধু মানুষ মানুষের করে না। ভরণপোষণ করে প্রকৃতি, যা সে কখনো দাবী করে না। প্রকৃতির ধারণ ক্ষমতা বলে একটা বিষয় আছে, ধারণা ক্ষমতার অতিরিক্ত কিছু প্রকৃতিতে থাকতে পারে না।  বিপর্যয় ঘটবেই।

প্রকৃতির ব্যপ্তি যেমন বিশাল, আবার স্থানিকও। সে হিসেবে আমাদের জনসংখ্যা অবশ্যই এখন ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত। কতটুকু জায়গায় কতটি গাছ লাগানো যায় তার একটি হিসেবে আছে, সংখ্যাটা অনেক বেশি হয়ে গেলে গাছগুলো বাঁচে না অথবা খুব রুগ্ন হয়ে বাঁচে। মানুষের ক্ষেত্রেও হিসেবটি করতে হয়। আমাদের জাতিগত শারীরিক এবং মানসিক রুগ্নতার প্রধান কারণ যে অতিরিক্ত জনসংখ্যা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে বেড়ে ওঠা, অশিক্ষা, দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, গৃহকর্মী নির্যাতন ইত্যাদি অনেক অপরাধ কর্মই সরাসরি অতিরিক্ত জনসংখ্যা সমস্যার সাথে সম্পর্কিত।

একটা শিশুকে আমরা শুধু ভরণপোষণ করার কথা বলি, তা তো করতেই হয়, কিন্তু শিশুকে সবচেয়ে বেশি দিতে হয় সময়! ঘুম বাদ দিলে বাকী সময় একটা শিশুর আর কিছুই করার থাকে না। আবার কোনো কিছুতে নিয়োজিত থাকা ছাড়া সে এক মুহূর্তও থাকতে পারে না।

শিশু মনোবৈজ্ঞানিকেরা বলে থাকেন, পাঁচ বছর পর্যন্ত শিশুর ভাষাগত এবং মনোবৃত্তিক বিকাশ খুব বেশি হয়, এই সময়ে শিশুর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের গুণাবলী প্রতিষ্ঠিত হয়। শিশুটি কী ধরনের পরিবেশে অাছে, মাতা-পিতা এবং চারপাশের অন্যরা তার সাথে এবং তার সামনে কেমন আচরণ করছে তার প্রভাব শিশুর উপর পড়বেই। এই সময়টা শিশু পরিবারেই থাকে, তাই পরিবার সচেতন এবং শিক্ষিত না হলে শিশুর সুন্দর শৈশব নিশ্চিত হয় না, ফলে ভবিষ্যতে সুন্দর একটি মানুষ পাওয়া সম্ভাবনাও প্রতিদিন একটু একটু করে কমতে থাকে।

উন্নত দেশ গুলোতে একটি শিশুও পরিকল্পনার বাইরে থাকে না। বাংলাদেশে বসবাসরত কয়েকজন জাপানির সাথে পরিচয় সূত্রে কথা বলে জেনেছি, ওরা সহজে বাচ্চা নিতে চায় না, কারণ, বিষয়টিকে তারা অত্যন্ত কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ ভাবে।

একটা বাচ্চা নিয়ে আমি রীতিমত হিমশিম খাই। একেবারে ছা-পোষা তো আমি নই, তাতেই আমার এই অব্স্থা! যারা আনাড়ি? যারা অশিক্ষিত, দুঃস্থ, পীড়িত?
চারপাশে এত নিঃস্ব মানুষ বলেই রাষ্ট্রকে আমাদের বলতে হয়, রাষ্ট্র তুমি মানবিক হও, ওদের দেখ। কিন্তু রাষ্ট্র মানে তো রাষ্ট্রের মানুষ, আমরাই, তাই না? দেশের দুই তৃতীয়াংশ জনসংখ্যাই যদি অপরিকল্পিত হয়, একেবারে সুযোগ সুবিধাহীন অবস্থায় থাকে, তাহলে কে কাকে দেখবে? বরং সুযোগে সবিধাজনক অবস্থায় থাকা এক ভাগ বাকী দুই ভাগকে দাস বানিয়ে ফেলবে।

সভ্যতার দাবী করতে হলে একটা মানুষকেও রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক পরিকল্পনার বাইরে রাখা চলে না। একটা শিশুও হু্জুগে এবং মাতা-পিতার স্বেচ্ছাচারিতা, ইচ্ছা বা শখে জন্ম নিতে পারে না।জন্মদান কখনো শখ বা খেলার বিষয় হতে পারে না। বর্ধিত জনসংখ্যা আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা, একথা নতুন নয়। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বড় সমস্যাটির প্রতি রাষ্ট্রের আর নজর নেই।

এক সময় একটা প্রচার শুনতাম- “দুটোর বেশি সন্তান নয়, একটা হলে ভালো হয়” এখন সেই প্রচারটুকুও নেই। আইন করে এদেশে এক সন্তান বা দুই সন্তান নীতি করা যাবে বলে মনে হয় না, কিন্তু সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় প্রণোদনামূলক প্রচারটুকুও যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে তো বিপদ।

নব্বয়ের দশকে দেখেছি স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি যেত, সরকারি প্রণোদনা ছিল। বাড়ি বাড়ি এসে স্বাস্থ্যকর্মীরা জন্মনিরোধক সামগ্রী দিয়ে যেত। কিছু বুঝিয়েও যেত। বিষটিয় এখনো গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয়।

সোজা কথায় জন্ম নিরোধক সামগ্রী এবং পরামর্শ বিনামূল্যে বিলি করা জরুরী, এবং তা করতে হবে ‘দরিদ্র-অজ্ঞ-অশিক্ষিত’ লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে। টাকার কারণে জন্মনিরোধক (কনডম) কিনতে চায় না অনেকে, অনেকে দোকান থেকে এই জিনিস কিনতে লজ্জাবোধ করে। ফলে জন্ম বিরতীকরণ পিলের উপর মহিলারা নির্ভর করে, যা ক্ষতিকর, আবার ভুলও হয় পিল নিয়ম করে খেতে।

স্বামী রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে এমন বিশটি পরিবারের উপর পপুলেশন সায়েন্সে পড়াকালিন ছোট্ট একটা জরিপ করেছিলাম। এর মধ্যে নয় দম্পতির অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের বিষয় রয়েছে। তার মানে বিষয়টি বিপদ্জ্জনক হারে ঘটে থাকে একটি শ্রেণিতে। এই জায়গাটিতে রাষ্ট্রের মনোযোগ খুব জরুরী। না হলে জন্ম নেবে মানুষ কিন্তু সে বেড়ে উঠবে ভিক্ষুক, সন্ত্রাসী, ইভ-টিজার, দাস অথবা জঙ্গী হিসেবে, যেটি আধুনিক সভ্যতার সাথে একেবারেই বেমানান।