ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

নোবেল শান্তি পুরস্কার একটা রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। আমেরিকা তথা পশ্চিমা বিশ্বের আনুগত্য রক্ষা করে চলে শুধু এমন বিখ্যাত মানুষরাই এখন নোবেল শান্তি পুরস্কার পায়। একথা অনেকেই বলে থাকেন যে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্ব বিভিন্ন দেশে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে থাকে। কথা পুরোপুরি হয়ত সত্য না, কিন্তু অনেকাংশে যে সত্য তার প্রমাণ আমরা বিজয়ীদের কর্ম এবং ব্যক্তিজীবন পর্যালোচনা করলে বুঝতে পারি।

সেসকল মানবাধিকারকর্মীই বিগত কয়েক বছর ধরে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন যাদের সংগ্রাম এবং কর্ম পশ্চিমা নীতি-আদর্শ বিরোধিতাকারী সরকারের বিরুদ্ধে যায়। মিয়ানমারের অং সান সুকি, ইরানের শিরিন এবাদি, চীনের লিউ জিয়াওবের নোবেল বিজয় আমাদের সেই সাক্ষই দেয়। যে সকল রাষ্ট্র প্রধান নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন তারাও পুরোপুরি পশ্চিমাদের অনুগত থেকে কাজ করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট কিম দায়ে জং এবং ফিনল্যান্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট মারটি আহতিসাআরির নাম এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে।

অন্যদিকে আমেরিকা থেকে শান্তির নোবেল পান স্বয়ং প্রেসিডেন্ট অথবা সরকারের সাথে থেকে কাজ করেন এমন কেউ। আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, বিগত কয়েক বছরে যারা নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন তারা প্রায় সকলেই শিক্ষাজীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে আমেরিকাতে পড়াশুনা করেছেন। শান্তিতে নোবেল বিজয়ীদের ব্যক্তিগত জীবনের দিকে নজর দিলে বোঝা যায় শান্তির নোবেল এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন মুদ্রার এপিট আর ওপিট।

২০০০ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, গণতন্ত্রপন্থী মানবধিকারকর্মী কিম দ্যায়ে জং কে। ২০০০ সালে জং উত্তর কোরিয়ার সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদক্ষেপ নেন। দুই কোরিয়ার মধ্যে শান্তি আলোচনা তখন এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে তখন এ আলোচনার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘হিস্টোরিক হ্যান্ডশেক’। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট দ্যায়ে জং তখন অনেক উদারতার পরিচয় দিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। তার সময়ে দুই কোরিয়ার সম্পর্কে অনেক অগ্রগতি হয়েছিল। ঐ বছরের জুন মাসে দুই কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট দেখা করেন এবং এটি ছিল দক্ষিণ এবং উত্তর কোরিয়ার কোন প্রেসিডেন্টের মধ্যে প্রথম সাক্ষাৎ। একই মাসে আমেরিকা উত্তর কোরিয়ার উপর থেকে বাণিজ্য বাধা উঠিয়ে নিয়েছিল। দক্ষিণ কোরিয়া বিপুল সংখ্যক বন্দিকে মুক্তি দিয়েছিল, উত্তর কোরিয়া অস্ত্র বিরতিতে সম্মত হয়েছিল, এরকম অনেক খুঁটিনাটি অগ্রগতি তখন হয়েছিল। তবে সবকিছুর পিছন থেকে কলকাটি নেড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র নামক শক্তিশালী দেশটি। পুরো শান্তি প্রক্রিয়াটির সাথে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। তাই একথা জোর দিয়ে বলা যায়, ২০০০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের শান্তিতে নোবেল প্রাপ্তি ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

২০০১ সালে শান্তি নোবেল পেয়েছিলেন কফি আনান এবং জাতিসংঘ। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পরে যে মুহূর্তে আফগানিস্তানে হামলার প্রস্তুতি চলছে এমন একটা সময়ে জাতিসংঘ এবং তার মহাসচিবকে পুরোপুরি পক্ষে রাখা ছিল এক জরুরী সিদ্ধান্ত। ঘানায় জন্ম নেওয়া আন্তর্জাতিক এ কূটনীতিকের শিক্ষাজীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ কেটেছে দেশের বাইরে। মি. কফি আনান আমেরিকা থেকে জেনেভা হয়ে আবার আমেরিকাতেই পড়াশুনা করেছেন। শুধু স্কুল এবং কলেজ পর্যায় পর্যন্ত তিনি ঘানাতে পড়াশুনা করেছেন।

২০০২ সালে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিরসনের জন্য আমেরিকার ৩৯তম প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। মিশর-ইসরাইল শান্তি চুক্তি বা ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির সমন্বয় করেছিলেন জিমি কার্টার। পশ্চিমা বিশ্বের কাছে এটা ছিল জিমি কার্টারের বিশাল এক কূটনৈতিক সাফল্য। এই চুক্তির ফলে ইসরাইলের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মেনাছেম বেগিন এবং মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সা’দাত নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন। মধ্যপ্রাচ্য বা আরব বিশ্ব ঐ চুক্তির পক্ষে ছিল না, ফলে আনোয়ার সা’দাত আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। তখনই হয়ত আমেরিকার ইচ্ছা ছিল জিমি কার্টারকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া, কিন্তু কূটনৈতিক কারণে তাকে তখন নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে ২০০২ সালে এ পুরস্কার তিনি পান।

২০০৩ সালে শান্তিতে নোবেল পান ইরানের শিরিন এবাদি। যুক্তরাষ্ট্রপন্থী একজন মানবাধিকারকর্মী হচ্ছেন শিরিন এবাদি। শিরিন এবাদি সংগ্রাম করেছেন একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, তবে তাঁর সংগ্রামের সাথে তাঁর পেশার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। এবাদি তেহরান সিটি আদালতের প্রধান বিচারক হয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর নারীদের উপর নানান ধরনের নিষেধাজ্ঞা আনা হয়। তারই অংশ হিসেবে এবাদিকে অপসারণ করা হয়। বিচারকের আসন থেকে সরিয়ে ক্লারিকাল কাজ দেওয়া হয়েছিল তাকে। তিনি খুব্ধ হন এবং সরকারবিরোধী আন্দলনে লিপ্ত হন। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আস্থাভাজন হন। মিসেস এবাদি সংগ্রাম করেছেন ঠিকই, তবে সে সংগ্রামের সাথে ব্যক্তিগত লক্ষ্যের বিষয়টি অস্পষ্ট হলেও ইঙ্গিতবহ।

২০০৪ সালে পুরস্কারটি পান কেনিয়ার মানবাধিকারকর্মী ওয়াঙ্গারি মাথাই। এটিকে অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ নোবেল শান্তি পুরস্কার মনে হলেও তা আসলে নিরপেক্ষ ছিল না। মাথাই যোগ্য ছিলেন একথা বলতেই হবে, কিন্তু বলয়ের বাইরে গিয়ে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাননি। মাথাই পড়াশুনা করেছেন আমেরিকার পিটার্সবুরগ বিশ্ববিদ্যালয়ে। মিসেস মাথাই হচ্ছেন মধ্য এবং পূর্ব আফ্রিকার প্রথম মহিলা যিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি কেনিয়ায় স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, নারী অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন, বনায়ানের কাজে হাত দিয়েছেন। সার্বিক বিবেচনায় আফ্রিকা অঞ্চল থেকে নোবেল শান্তি বিজয়ী তিনি হতেই পারেন, তবে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে আবিরাম যোগাযোগ না রেখে তিনি তা প্রাপ্ত হননি। তাছাড়া সমস্যা জর্জরিত পূর্ব আফ্রিকা থেকে কাউকে শান্তিতে নোবেল প্রাইজ দেওয়ার প্রয়োজনীয় কাজটি মিসের মাথাইকে দিয়ে সেরে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হয়েছে।

২০০৫ সালে পুরস্কারটা দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক আনবিক শান্তি সংস্থা এবং তার প্রধান জনাব এল বারাদিকে যৌথভাবে। এটি ছিল পুরোপুরিই একটা রাজনৈতিক পুরস্কার। নতুন করে কোনো দেশ যাতে আনবিক শক্তিতে শক্তিশালী হতে না পারে তা দেখার দায়িত্ব জাতিসংঘের এই অঙ্গ সংগঠনটির উপর, তো তারা যাতে সে কাজটি জনগণকে পক্ষে নিয়ে করতে পারে তার সার্টিফিকেসন ছিল পুরস্কারটি। মি. এল বারাদি পুরস্কারটা পেয়েছিলেন সামরিক বাহিনীতে যাতে আনবিক অস্ত্র ব্যবহার না হয় সে বিষয়ে কাজ করে। মনে রাখতে হবে, এল বারাদিও তাঁর শেষ ডিগ্রিটা নিয়েছেন নিউইয়র্কের এক আইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তাঁর পুরস্কারটিকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভাবা যেত যদি শুধু আনবিক শক্তি অর্জনের বিরুদ্ধে কাজ না করে আনবিক শক্তি বর্জনের জন্যও কাজ করে তিনি তা পেতেন।

২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন বাংলাদেশের ড. মো: ইউনুস এবং গ্রামীণ ব্যাংক। ইউনূস সম্পর্কে অনেক জল ঘোলা হয়েছে, তাই এ সম্পর্কে বেশি কিছু না বলে এটুকু বলাই যথেষ্ট যে তিনি আমেরিকার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করেই পুরস্কারটি পেয়েছেন। এক্ষেত্রে কৌশলতগত কারণে বাংলাদেশের প্রতি আমেরিকার আগ্রহকে ড. ইউনূস বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজে লাগিয়েছেন। প্রসঙ্গত, জনাব ইউনুস পড়াশুনা করেছেন আমেরিকা ভান্দেরবিলত বিশ্ববিদ্যালয়ে।

২০০৭ সালে পুরস্কারটি পায় আইপিসিসি এবং আর্নল্ড আলবার্ট আলগর যৌথভাবে। এটিও কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক নোবেল। আমেরিকা চাইছে জলবায়ু সমস্যাটি তাদের মতো করে প্রচার করতে। এক্ষেত্রে আইপিসিসি এবং আর্নল্ড আলবার্ট অনেক বড় অস্ত্র। তাদের জাতীয় অস্ত্র আরও শক্তিশালী করার জন্য নোবেল প্রাইজ দেওয়ার মাধ্যমে সেটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে। জলবায়ু বিষয়ে ক্রমাগতভাবে উন্নয়নশীল বিশ্বকে আতঙ্কিত করে চলেছে, কিন্তু দেশটি নিজেরা মোটেই সতর্ক হচ্ছে না।

২০০৮ সালে পুরস্কারটি দেওয়া হয় দরকষাকষিতে ওস্তাদ মারটি আহতিসাআরি কে। আহতিসাআরি জন্মলাভ করেছিলেন ফিনল্যান্ড এর ভিবুরগে, যেটি বর্তমানে রাশিয়ার মধ্যে পড়েছে। তিনি ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আহতিসাআরি যখন ছোট ছিলেন তখন ভিরবুগ স্থানটি রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়, এবং সেখানকার অধিবাসীরা তখন ফিনল্যান্ডের অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। অর্থাৎ, ছোটবেলা থেকেই রাশিয়ার প্রতি আহতিসাআরির এক ধরনের ঘৃণা ছিল। এই সুযোগটিই আমেরিকা কাজে লাগিয়েছে। তবে একথা সত্য যে তিনি অনেক শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতা করেছেন, কিন্তু সেগুলো অবশ্যই শান্তিতে নোবেল প্রাইজ পাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। আর তিনি মূলত শান্তির জন্য কাজ করেছেন জাতিসংঘের একজন প্রতিনিধি হিসেবে, ব্যক্তিগত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নয়। তাই শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজের ত্যাগ-তিতীক্ষা বলতে যা বুঝায় তা তিনি করেছেন এমনটি জানা যায় না। পাশাপাশি যে কথাটি সবচে’ বেশি করে মনে রাখতে হবে, তিনি জাতিসংঘের হয়ে কসভোতে মধ্যস্থতা করতে গিয়েছিলেন, এবং তাঁর মধ্যস্থতার পরেই কনভো সার্বিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। যেটি ছিল আমেরিকার অন্যতম একটি চাহিদা। নামিবিয়া, ইন্দোনেশিয়ার আছেহ প্রদেশ এবং ইরাকে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তিনি কাজ করেছেন। বলা যায়, তার পুরো পেশাজীবনে তিনি আমেরিকার প্রতিনিধিত্বই করেছেন। এর আগে ১৯৬০ সালে Young Men’s Christian Association (YMCA) নিয়ে তিনি পাকিস্তান গিয়েছিলেন এবং মোটামুটি সফলতার সাথে পাকিস্তানের মতো একটি দেশে YMCA-র ভিত্তি এনে দিয়েছিলেন।

২০০৯ সালে পুরস্কারটি দিয়ে দেওয়া হয় আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, মুসলিম বিশ্বে গত কয়েক বছরে আমেরিকা যে ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে তা থেকে উত্তরণ হতেই ওবামা গায়ে নোবেল শান্তি পুরস্কারের সীল মেরে দেওয়া হয়েছে। আসলে মি. ওবামাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে তিনি শান্তির জন্য কাজ করেছেন এজন্য নয়, দেওয়া  হয়েছিল তিনি শান্তির জন্য কাজ করবেন এই সম্ভাবনা মাথায় রেখে। সময় অতিবাহিত হয়েছে, ওবামা শান্তির জন্য কতটা কাজ করতে পেরেছেন সেটি নিশ্চয় দীর্ঘ আলোচনার বিষয়।

২০১০ সালে পুরস্কারটি দেওয়া হল চীন সরকারের বিরধিতাকারী মানবাধিকারকর্মী লিউ জিয়াওবোকে। জিয়াওবা চীনের একদলীয় শাসন ব্যবস্থার একজন কট্টর সমালোচক। ১৯৮৯ সালে তিএনআনমেন স্কয়ারে আন্দোলন করেছেন। সে সময় দুই বছর জেলও খেটেছেন। যেহেতু তিনি চীন সরকারের বিরোধিতা করছেন এবং পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের জন্য লড়ছেন, তাই একথা বলতে দ্বিধা নেই যে জিয়াওবো আমেরিকার প্রতিনিধিত্বই করছেন। প্রসঙ্গত, তিনি আমেরিকা থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন এবং আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতাও করেছেন।

২০১১ সালটি ছিল আরব বসন্তের বছর। আন্দোলন খুব সফল হয়য়ে বলা যায় না। তবে ঐ আন্দোলনের সূত্র ধরে নোবেল শান্তি পুরস্কারের অংশীদার হতে পেরেছেন ইয়েমেনের নারী অধিকারকর্মী তায়াক্কুল কারমান। মাত্র ৩২ বছর বয়সে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১১ সালের আরব বসন্ত সংঘটিত হওয়ার আগে আন্তর্জাতিকভাবে তেমন পরিচিতি ছিল না কারমানের, তবে ইয়েমেনে তিনি শক্তিশালী একজন কর্মী। নোবেল পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে তাঁর কাজের আন্তর্জাতিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছে আরবে ‘গণতান্ত্রিক’ আন্দোলনের স্বার্থে। কারমান পেশায় সাংবাদিক এবং একজন মানবাধিকারকর্মী, যিনি মূলত নারী অধিকার নিয়ে তাঁর দেশে কাজ করেন। হঠাৎ করে তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়াতে অবশ্যই তাঁর দেশের মানুষ চমকে যায়, যেমন ২০০৬ সালে চমকে গিয়ে খুশি হয়েছিল বাংলাদেশের মানুষ। উল্লেখ্য, আমেরিকার ড্রোন হামলায় ইয়েমেন এবং পাকিস্তানে সবচে বেশি মানুষ মারা যায়। ২০১১ সালে একই সাথে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন লাইবেরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট এলেন জনসন সারলিফ এবং লেয়মাহ গবওই। লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট এলেন জনসন সারলিফ সবসময় আমেরিকার অনুগত হয়ে সরকার পরিচালনা করেন। আমেরিকার আদলে এবং পরামর্শেই লাইবেরিয়ায় সরকার পরিচালিত হয়। তবে সারলিফ একজন সফল নারী অধিকারকর্মীও। সারলিফের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় গোট শিক্ষাজীবন কেটেছে আমেরিকায়। লেয়মাহ গবওইও লাইবেরিয়ার একজন নারী অধিকারকর্মী। লেয়মাহ গবওই উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন আমেরিকার ভার্জিনিয়ার এস্তারন মেন্ননিতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়েনের শক্তিমত্তা আঁচ করতে পেরে ২০১২ সালের পুরস্কারটা তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ২০১৩ সালে পুরস্কারটা দেওয়ার প্রয়োজন পড়ল রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান Organisation for the Prohibition of Chemical Weapons (OPCW) কে। সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে অপারগ হয়ে আমেরিকা বাধ্য হয়েছে জাতিসংঘ এবং উক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সিরিয়া সমস্যার সমাধানে তৎপর হতে। তবে তাতে অবশ্য কোনো লাভ হয়নি। সিরিয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতির আগুনে ঠিকই পুড়েছে, পুড়ছে।

২০১৪ পাকিস্তানের আলোচিত স্কুল ছাত্রী মালালা ইউসুফজাই কে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হল। মালালাই সবচে’ কম বয়সী নোবেল বিজয়ী। বিষয়টি অনেকটা অনুমিত ছিল। তবে ভারসাম্য আনার জন্য এবং সম্ভবত পুরস্কারের ভার বজায় রাখার জন্যও সাথে জুড়ে দেওয়া হল ভারতের মধ্য প্রদেশের কৈলাশ সত্যর্থীর নাম। তাঁর সংগঠন ‘বাচপান বাঁচাও আন্দোলন’ শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে কাজ করে থাকে। ভারতে কৈলাশের কাজ যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।

২০১১ সালে সংগঠিত আরব বসন্ত থেকে যদি কিছু অর্জন হয়ে থাকে তা তিউনিশিয়াতেই হয়েছে। পশ্চিমা মডেলের বহুদলীয় গণতন্ত্র সুসংহত করার জন্য ২০১৫ সালে শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয়েছে দেশটির ‘ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেট’ নামের একটি জোটকে। জোটটি তিউনিশিয়ার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদান রেখেছে বলে মনে করা হয়।

গত এক দশক ধরে যারা নোবেল শান্তি পুরস্কার পাচ্ছেন তাঁরা পুরস্কারটি পাওয়ার যোগ্য কিনা সেটি ভিন্ন আলোচনা, তবে উপরিউক্ত যারা নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে যে মিলগুলো চোখে পড়ে তাতে একথা অনস্বীকার্য যে বিগত এক দশকে পুরস্কারটি যারা পেয়েছেন তাঁরা পশ্চিমা বিশ্বের বলয়ের মধ্যে থেকেই পেয়েছেন, এবং তাদের মধ্যে অনেকে আমেরিকার প্রতি ভীষণ অনুগত থেকেছেন এবং আছেন। অবশ্য শুধু বিগত দশকে নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই নোবেল শান্তি পুরস্কারটি আর নিরপেক্ষ থাকেনি এবং দেখা যায় সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যই ছিল সবচে’ বেশি। খুব বাধ্য না হলে নেলসন মান্দেলার মতো আমেরিকার নীতি বিরোধী কাউকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়নি, বরং সবসময় তাদের পুরস্কারটি দেওয়া হয়েছে, যাদের কাজ রাশিয়া এবং চীনা নীতির বিরুদ্ধে গিয়েছে, বা মুসলিম বিশ্বে ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসান এবং আমেরিকার আধিপত্য পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর থেকে নোবেল শান্তি পুরস্কার আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে বলেও অনেকে বিশেষজ্ঞ মনে করেন। বর্তমান বিজয়ীরা আন্তর্জাতিক ঘুড়ি হয়ে পূর্ব-দক্ষিণে উড়লেও নাটাইটা সবসময় উত্তর-পশ্চিমেই থাকছে।

দেখা যাক, এবার পুরষ্কারটা কে বা কোন সংগঠন পায় …