ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

ইংরেজি সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে এলিজাবেথান পিরিয়ড। সে যুগ নাট্য সাহিত্যের জয়জয়কার হলেও ওগুলো আসলে কবিতাই। শেকসপিয়রের সব লেখাই আসলে কবিতা। প্রত্যেকটি লাইন কবিতা। মারলো, বেন জনসের নাটকও সেরকম। থমাস মুরের ইউটোপিয়া মোটেই ইউটোপীয় নয়, বরং অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। রাজনীতি এবং জীবন-দর্শন নির্ভর উপন্যাস ইউটোপিয়া এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে মার্কসবাদের পাশাপাশি বা ভিন্নভাবে ‘মুরবাদ’ চর্চা করা দরকার।

জন ডান এবং এডমান্ট স্পেন্সারের মত কবিরা তো ও যুগে আছেনই। যদিও ডান প্রথম প্রথম বাহারী কবি ছিলেন, নারী ভুলানো কবি ছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত ‘বৈপরিত্যে’ তাঁর কবিতা কালোত্তীর্ণ হয়েছে। মেটাফিজিক্স আবিষ্কৃত হয়েছে। এলিজাবেথান পিরিয়ডের আরেকজন দ্বান্দ্বিক কবি ছিলেন রবার্ট হেরিক। তিনি ‘আপন জুলিয়াস ক্লথ’ ‘র দেহতত্ত্বের মত কবিতা লিখেছেন, আবার লিখেছেন ‘ড্যাফোডিলস্’ ’র মত আধ্যাত্মিক কবিতাও।

তবে এলিজাবেথান পিরিয়ড যুক্তির ক্ষেত্র প্রস্তুত করলেও সেটি এসে পূর্ণতা পেয়েছে এনলাইটেন পিরিয়ডে। সাহিত্য-দর্শন এই যুগেরই অবদান। একপ্রান্তে ভিক্টর হুগো, ডেভিড হিউম, ইমানুয়েল কান্ট, ভলতেয়ার এবং জিন জ্যাক রুঁশোর মত দার্শনিক এবং দর্শন-শাস্ত্র, আরেক প্রান্তে জনাথন সুইফট্ এবং উইলিয়াম কনগ্রিভির মত সাহিত্যিক। আইজ্যাক নিউটনও আছেন এখানে। যুগটিকে দর্শন এবং বিজ্ঞানের যুগ বলা চলে। সে তুলনায় সাহিত্যের ঐশ্বর্য এ যুগে কম। প্রগতির যুগ এটি। ফঁরাসি বিপ্লব এনলাইটেন পিরিয়ডের শ্রেষ্ঠ অবদান, যার উপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের সভ্যতার অনেক কিছু।

রোমান্টিক পিরিয়ডটা শুধু কবিতা দিয়ে সাজানো বলা চলে, যুগটা এলিজাবেথান পিরিয়ডের কাঠিন্য এবং এনলাইটেন পিরিয়ডের সংগ্রামের উপর ভর করে দাঁড়ানো। অনেক ক্লান্তিকর পথ পেরিয়ে একটু বিশ্রাম নেবার আকাঙ্ক্ষা। কিটস্, শেলি, ব্লেক, বায়রন সবাই একইরকম গা ভাসানো, ঝর্ণার মত ছলছল। নিজেকে প্রশ্ন করার সুযোগ, ঈশ্বরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো …

ওয়ার্ডওয়ার্থ আখ্যানে প্রকৃতিপ্রেমী শুধু, কিন্তু ধরণ ঐ একই। রোমান্টিক পিরিয়ডে ধারার বাইরে ছিলেন আমাদের সুকান্তের মত ক্ষণজন্মা দুই বোন- চার্লটি ব্রন্টি এবং এমিলি ব্রন্টি। যদিও তাঁরা ভিক্টোরিয়ান পিরিয়ডের ঠিক প্রাক্কালের। অনেক সাহিত্য সমালোচক তাঁদের ভিক্টোরিয়ান পিরিয়ডেই রেখেছেন। ‘জেন আয়ার’ এবং ‘ওয়েদারিং হাইটস্’ নামে দুটো সেরা উপন্যাস তাঁরা পৃথিবীকে উপহার দিয়ে গেছেন। হারমেন মেলভেলি, ওয়াল্টার স্কট প্রমূখের নামও একইসাথে উল্লেখযোগ্য।

ভিক্টোরিয়ান পিরিয়ডে এসে ইংরেজি সাহিত্য আবার রূপ বদলায়। নাট্য সাহিত্য এবং শুধু কবিতা থেকে বেরিয়ে সেরা সেরা উপন্যাসের দেখা মেলে এই যুগে। বলতে গেলে এই যুগটায় একাধিপত্য করেছেন চার্লস ডিকেন্স। এই যুগে সাহিত্যের চমৎকার সমন্বয় রয়েছে। একদিকে রয়েছেন টেনিসন এবং হুইটম্যানের মত কবিরা, অন্যপাশে ডেভিড কপারফিল্ড, টেল অব টু সিটিস খ্যাত চার্রলস ডিকেন্স। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর শুরুও মূলত এই যুগে। এইজ জি ওয়েলসের টাইম মেশিন দিয়েই সাহিত্য এবং বিজ্ঞান মিশে যায় সফলভাবে।

আধুনিক যুগে ডব্লিউ. বি. ইয়েটসের নাম বেশি উচ্চারিত হলেও ‘দ্যা লাভ সং অব জে আলফ্রেড প্রফ্রক’ খ্যাত টি. এস. এলিয়টই মনে হয় এ যুগের সেরা কবি। রবার্ট ফ্রস্ট কবিতায় নতুন ধারা এনেছেন বলা চলে। প্রকৃতি, দর্শন এবং জীবন তিনি এক করে দিয়েছেন, এক সূত্রে গেঁথে ফেলেছেন। এ যুগে আছেন আত্মদ্বন্দ্বের কবি সিলভিয়া প্লাথ এবং ডাইলান থমাস। আধুনিক যুগের শুরুটা করে দিয়েছেন মূলত ফ্রেডেরিক নিটশে এবং সিগমন্ড ফ্রয়েড।

ভার্জিনিয়া উলফ এবং জেমস জয়সে নিঃসন্দেহে আধুনিক যুগের সেরা সাহিত্যিক। বিশ্বের যৌক্তিক নারীবাদের মডেল করা দরকার ছিল ভার্জিনিয়া উলফকে, পঠিত হওয়া দরকার ছিল, কোটেড হতে পারত তাঁর উপন্যাসের প্রতিটি লাইন, কিন্তু সে অনুপাতে কিছুই হয়নি। আমাদের পশ্চাতেই রয়েছেন মূলত আমাদের অগ্রজরা। শুধু পিছনে তাকাতে হবে।

১৯৬০ সালের পর থেকে যদি সময়টাকে উত্তর আধুনিকতাবাদ বলে গণ্য করা হয়, তাহলে এ যুগে ইংরেজি সাহিত্যের অবদান এখনো খুব বেশি নয়, তুলনায় রুশ এবং ফরাশি সাহিত্য উল্লেখযোগ্য। ভ্লাদিমির নভোকভ এবং গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের নাম বলতেই হয়। মেক্সিকান সাহিত্যিক অক্টাভিও পাজের লেখা ‘দ্যা ল্যাবিরিন্থ অব দ্যা সলিচিউড’ অবশ্য পাঠ্য হওয়া উচিৎ। আমেরিকান সাহিত্যিক কুট ভনেগার্টের ‘স্লটার হাউজ-ফাইভ’ কালজয়ের দাবীদার। নাইজেরিয়ান সাহিত্যিক হোলে সোয়িনকা আফ্রিকান ইংরেজি সাহিত্যের পথিকৃত। ভারতবর্ষে ইংরেজি সাহিত্য শুরু হয় আর. কে. নারায়ানের হাত ধরে। হালে আছেন অরবিন্দ আদিগা। আমাদের দেশ থেকে এখনো ইংরেজি সাহিত্যের কোনো সফল ধারা কারো হাতে তৈরি হয়নি, শুধু তাহমিমা আনামের ‘এ গোল্ডেন এইজ’ উপন্যাসটির কথা বাদ দিলে, যদিও অনেক সমালোচক এটিকে মানোত্তীর্ণ বলতে নারাজ।

ইংরেজি সাহিত্য তথা বিশ্ব সাহিত্য মিশে আছে সভ্যতার অগ্রগতির ধারক হয়ে, সভ্যতার ইতিহাসের পরিক্রমা বুঝতে গেলে ডুব দিতে হয় উত্তর থেকে দক্ষিণে, পূর্ব থেকে পশ্চিমেও।