ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিও ঘোষণা করা উচিৎ। না হলে কোনোভাবেই ওদের সাথে তাল মেলানো যাবে না। এগিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ধরুন, ইংল্যান্ডের কেউ ইংরেজি ভাষায় (মাতৃভাষায়) একটি বই লিখল, আমি লিখলাম বাংলায় (মাতৃভাষায়)। বই আমারটা ভালো হল, কিন্তু আমার সামনে বাজার হচ্ছে মাত্র পাঁচিশ কোটি মানুষের। এর মধ্যে শিক্ষিত মানুষ সাত থেকে আট কোটির বেশি হবে না। আর প্রথম ও দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি জানে এবং ইংরেজিতে বই পড়তে সক্ষম মানুষ পৃথিবীতে একশো কোটির কম না।

প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এ হিসেবটি খাটে। অর্থাৎ ইংরেজি যার মাতৃভাষা তার বাজার বিশ্বব্যাপী, কিন্তু আমার বাজার শুধু বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে, তাও আবার সংকুচিত হয় হিন্দু মুসলিম সমস্যার কারণে। পারা যাবে তাহলে?

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেয়ে ইংরেজি ভাষার অনেক দুর্বল সাহিত্যিকের সাহিত্যকর্ম সারাবিশ্বব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হয়, কারণ, ভাষা অথবা সাহিত্য হিসেবে ইংরেজি পড়ানো হয় বিশ্বের প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে, আর বাংলা পড়ানো হয় কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে? এ পার্থক্য আবেগ দিয়ে ঘুচানো সম্ভব?

আদি থেকে আধুনিক, ইংরেজি ভাষার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিকের সাহিতকর্ম সম্পর্কে আমার অল্পবিস্তর ধারণা আছে। মনে হয়েছে শুধুমাত্র ভাষার কারণে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তারা অনেকে। না হলে সেসব সাহিত্যমান বাংলাভাষার অনেক সাহিত্যিকের চেয়ে নিম্ন।

বঙ্কিমচন্দ্র কট্টোর হিন্দু ছিলেন বলে অভিযোগ আছে, কিন্তু সাহিত্যিককে শুধু সাহিত্যমান দিয়ে বিবেচনা করলে বঙ্কিমচন্দ্র পৃথিবীর প্রথম সারির সাহিত্যিক, কিন্তু তার চেয়ে বিশ্বব্যাপি বেশি পঠিত হয় এডওয়ার্ড মর্গান ফস্টার বা হেনরি মিলারের মত সাহিত্যিকের সাহিত্যকর্ম, যাদের মাত্র একটি বা দুটি ভালো কাজ রয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদের চেয়েও নিম্নমানের ইংরেজি ভাষার অনেক সাহিত্যিক বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত মার্কেটিংএর কারণে শুধু। শওকত ওসমান, জসিমউদ্দীন, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নিঃসন্দেহে জর্জ অরওয়েল বা ম্যাথিউ আর্নল্ড-এর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক নন, অথচ অরওয়েল পৃথিবীর সকল দেশের কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়, কিন্তু শওকত ওসমান বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্যকর্ম পড়ানো হয় না বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও।

রবীন্দ্রনাথই বা কয়টি দেশে পড়ানো হয়? অন্যদের কথা নাইবা বললাম। শুধু ভাষার কারণে এটি হবেও না। শুধু মাত্রই ভাষার পার্থকের কারণে পিছিয়ে থাকা মানা কঠিন। অনুবাদ করে এ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। আবার মাতৃভাষা বাংলা হলে ইংরেজি শিখে সাহিত্য চর্চা করে সর্বোচ্চ মানে পৌঁছানোও সম্ভব নয়। তাই ইংরেজি ভাষাটাও আমাদের মাতৃভাষা হওয়া প্রয়োজন বাংলার পাশাপাশি।

পৃথিবীর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয় হিসেবে ভাষাভিত্তিক সাহিত্য থাকা উচিত নয়। যেমন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য বা ইংরেজি সাহিত্য হিসেবে আলাদা সাবজেক্ট থাকতে পারে না। বিষয়ের নাম হবে `সাহিত্য’, সেখানে ইংরেজি সাহিত্য, বাংলা সাহিত্য এবং পৃথিবীর সকল উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পড়াতে হবে।

ইংরেজি আলাদা সাবজেক্ট থাকতে পারে শুধু ভাষা হিসেবে, সাহিত্য হিসেবে নয়। সাহিত্য হিসেবে থাকলে ফ্রেঞ্চ সাহিত্য কেন নয়, রুশ সাহিত্য কেন নয়, অন্যান্য ভাষার সাহিত্য সাবজেক্ট হিসেবে কেন নেয়? আজকে ইাউরোপ-আমেরিকার যে উন্নতি সেটি ভাষার আধিপত্যের কারণে এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সাহিত্যকর্ম পড়ে দেখা হচ্ছে তা ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হবার পর, তাহলে নিরপেক্ষতা থাকে কী করে?

ইংরেজি ভাষায় যারা এ পর্যন্ত নোবেল পেয়েছে সে হিসেবে বাংলা সাহিত্য থেকে এ পর্যস্ত নোবেল পাওয়া উচিৎ ছিল কমপক্ষে দশজনের কিন্তু পেয়েছে মাত্র একজন! এ বৈষিম্যের বিচার হবে কী করে? ইংরেজি ভাষাটাও সকল দেশের মাতৃভাষা হবে, এটা বাস্তবসম্মত এবং প্রয়োজনীয় হলেও সম্মানজনক হয় না; দাবিটা এই মুহূর্তে হওয়া দরকার বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং কলেজে সাহিত্য হিসেবে পঠিত বিষয়ের নাম হবে ‌‍বিশ্ব সাহিত্য, অবশ্যই তা ইংরেজি সাহিত্য নয়। পৃথিবীর সকল দেশে একযোগে এটা হওয়া দরকার।