ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

ভারতবর্ষ থেকে বেরিয়ে আসা দেশগুলো কতটা অসাম্প্রদায়িক আচরণ করবে তা অনেকখানি নির্ভর করে ভারত কেমন আচরণ করছে তার ওপর। ভারতের আচরণ পরিমাপ করতে হবে দুইভাবে− জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। অর্থাৎ সে তার নিজ দেশের অপেক্ষাকৃত দুর্বল জনগণের সাথে কেমন আচরণ করছে এবং দেশ হিসেবে যারা ছোট তাদের সাথে বড় দেশ হিসেবে ভারতের আচরণ কী এবং কেমন।

দেশের জনগণের সাথে ‘আচার-বিচার’ করে রাষ্ট্র এবং ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠরা। স্বভাবতই এখানে প্রশ্ন আসে- ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠী সংখ্যালঘু মুসলিমদের সাথে কেমন আচরণ করছে? সাংবিধানিকভাবে ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলেও সামাজিকভাবে ভারত একটি ধর্মরাষ্ট্র। সম্প্রতি বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে যে খবরগুলো পাওয়া যাচ্ছে তাতে এ প্রশ্ন করা যায়- ধীরে ধীরে ভারত কি একটি সাম্প্রদায়িক জঙ্গী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে? প্রশ্নের প্রাসঙ্গিকতা পরিমাপ করতে হবে তথ্যের আলোকে। বেশি পেছনে যাব না, মে-জুন, এই দুই মাসের কিছু তথ্য বোঝার চেষ্টা করি−

১। গরু চুরি সন্দেহে দুই মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যা;

খবরটি মে মাসের ১ তারিখের। ঘটনাটি আসামের। সূত্র: বিবিসি বাংলা।

২। Muslim man tied to tree, beaten to death;

এটি মে মাসের ৩০ তারিখের ঘটনা। খরব: টাইমস অব ইন্ডিয়ার।

৩। ভারতে গোরক্ষা: ঈদে বাড়ি ফেরা হলো না জুনাইদের

ঘটনাটি জুন মাসের ২৪ তারিখের। শিরোনাম: বিডিনিউজ।

সর্বশেষ খবরটির সূত্র ধরেই বিশ্লেষণ করা যাক। খবরে প্রকাশ- সহদোর শাকির হাশেমের সঙ্গে ঈদের কেনাকাটা শেষে দিল্লি থেকে ট্রেনে বাড়ি ফিরছিল ১৬ বছরের কিশোর জুনাইদ খানগরুর মাংস বহন করছেঅভিযোগ তুলে ট্রেনে একদল লোকতাদের উপর হামলা চালায় ছুরিকাঘাতে নিহত হয় জুনাইদ

Junaid+Khan

.

এই খবরটি আমি বিশ্বাস করতে চাই না। পৃথিবীর কোথাও এটি ঘটেছে ভাবতে চাই না। কিন্তু সত্য হল- এটি ঘটেছে এবং ঘটেছে আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে, যারা নিজেদেরকে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে দাবী করে। সংবিধান তাদের ধর্ম নিরপেক্ষ, অহিংস মতবাদের রাজনীতির জনক গান্ধী যাদের জাতির পিতা, মাদার তেরেসা যে দেশের নাগিরক। সংবিধানে ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র (Secular State) হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে এভাবে-

কোনো বিশেষ ধর্মকে ভারতের রাষ্ট্রীয়ধর্ম (State Religion) হিসেবে স্বীকার করা হয়নি ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী জাতি, ধর্ম ভাষার পার্থক্যের জন্য রাষ্ট্র কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ করবে না প্রত্যেক নাগরিকই স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম আচরণ করতে পারবে 

অর্থাৎ মানবিক বোধের কথা বাদ দিলেও ভারতে যা ঘটছে তা সুস্পষ্টভাবে সংবিধান লঙ্ঘন। প্রশ্ন হচ্ছে, এরকম কতটি ঘটনার এখন পর্যন্ত বিচার হয়েছে? সাজা হয়েছে? একথা সত্য যে ঘটনার প্রেক্ষিতে বেশকিছু গণমাধ্যমে অনেকের বিক্ষুব্ধ মতামত পড়েছি, কিন্তু ভারতের সাধারণ জনগণ তাতে কতটুকু বদলাচ্ছে আসলে, নাকি প্রতিদিন তারা আরেকটু বেশি করে সাম্প্রদায়িক হচ্ছে?

বাংলাদেশে কোনো উগ্রবাদী ধর্মীয় দল ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রের যে রূপ হতে পারে বলে আমরা ধারণা করি ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় থাকাতে কি তাই হয়েছে? সেক্ষেত্রে ভারতে প্রগতিশীল শক্তির সক্রিয়তা নিশ্চয়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ ধরনের নৃশংসতা যদি রাজনৈতিক প্রশ্নয় পায় তাহলে দিনকে দিন তা বাড়তেই থাকবে, বাড়ছেও। কিন্তু ভারতের আলোকিত সামাজিক শক্তি এমন কোনো বার্তা তৈরি করতে পারছে না যাতে মানুষের নৈতিক এবং মানবিক বোধ জাগ্রত হয়।

ভূপেন হাজারিকার আসাম, রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের কোলকাতা, গান্ধীর গুজরাট ভারতের সবখানে আজ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, অসহিঞ্চুতা। আমরা বিষ্মিত, বিরক্ত, বিক্ষুদ্ধ।