ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ


ছবিসূত্র: রয়টার্স

এ বছরই, জানুয়ারি মাসের ২৯ তারিখে, কোলকাতার মুর্শিদাবাদের দৌলতাবাদে একটি ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনা ঘটে। ব্রিজের রেলিং ভেঙে পড়ে গেলে অন্তত ৪২ যাত্রীর সলিল সমাধি ঘটে। খবরটি নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে কোনো তোলপাড়ও হয়নি। কারণ, খুবই স্বাভাবিক- এরকমটি হয়েই থাকে এবং গাড়িতে কোনো ‘ব্লাক বক্স’ থাকে না।

মাত্র কিছুদিন আগেই (২৩ ফেব্রুয়ারি) পেরুতে একটি ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনা ঘটে। মারা যায় ৪৪ জন যাত্রী। পাহাড়ি এলাকা দিয়ে চলার সময় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ১০০ মিটার নিচে নদীতটে পড়ে গেলে নিহত হয় বাসের সকল যাত্রী। এ বছরে জানুয়ারি মাসে একইরকম আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটে দেশটিতে। বাস-ট্রাকের সংঘর্ষে মারা যায় বাসের ৪৮ জন যাত্রী। সংঘর্ষের কারণে গিরিপথ দিয়ে যাওয়ার সময় বাসটি ৩৩০ ফুট নিচে খাদে পড়ে যায়।

গত বছরের মাঝামাঝি জার্মানিতে একটি ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনা ঘটেছিল। মুখোমুখি সংঘর্ষে বাসটিতে আগুন লেগে গেলে অন্তত ২৫ জন যাত্রী মারা যায় ঘটনাস্থলে এবং হাসপাতালে।

কিছুদিন আগে মিয়ানমারের মংডু থেকে নাফ পেরিয়ে আসার পথে ট্রলার ডুবে মারা যায় নারী-শিশুসহ দশ-বারো জন যাত্রী।

২০১৪ সালে মাওয়া ঘাটে পিনাক-৬ নামের একটি লঞ্চ ডুবে মারা গিয়েছিল শতাধিক যাত্রী। ২০১৫ সালে পদ্মায় এমভি মোস্তফা নামে একটি লঞ্চ ডুবে মারা যায় অন্তত ৫০ জন যাত্রী। ২০১৬ সালের শেষের দিকে বরিশালের বানারীপাড়ায় একটি লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটে, সেখানে মারা যায় অন্তত ২৫ জন মানুষ।

বাংলাদেশে বাস খাদে পড়ে, অথবা মুখোমুখি সংঘর্ষে পাঁচ, দশ, বিশ-পঁচিশ জন নিহতের ঘটনা অহরহ ঘটে। তবে এসব ঘটনা মানুষের গা-সওয়া হয়ে গেছে। এসব ঘটনা মেনে নেওয়া হয় এমনিতে, মেনে নিতে বাধ্য হয়।

তবে বিমান দুর্ঘটনার বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বিমান দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি হয় বিশাল, মারা যায় অনেক ‘গুরুত্বপূর্ণ’ মানুষ। ধনী মানুষ, সফল মানুষ, মূল্যবান মানুষ থাকে বিমানে -একথা সত্য, তবে ঢালাউভাবে বিমানকে এখন আর এরিসটোক্রাট বাহন বলার সুযোগ নেই। কারণ, শ্রমিক শ্রেণির প্রচুর মানুষ বিদেশে কাজ করতে যাচ্ছে বা বিদেশ থেকে ফিরছে বিমানে। তাই কোনোভাবেই ‘কান্নার রং’ খোঁজার সুযোগ নেই।

সকল দুর্ঘটনাই হৃদয়বিদারক, তাতে অপ্রত্যাশিতভাবে মারা যায় কিছু মানুষ—যাদের বাড়িতে রয়েছে আপনজন, যারা জানত না তাঁরা তখন ওভাবে মারা যাবে, বেঁচে থাকা মানুষের জন্যও এ ধরনের আকস্মিক মৃত্যু অপূরণীয় ক্ষতি, কারণ, প্রত্যেকেই রেখে যায় অসমাপ্ত কাজ এবং স্বপ্নগুলো—যা আর কোনোদিন সমাপ্ত হয় না।

পৃথিবীর ইতিহাসে ভয়াবহ সব বিমান দুর্ঘটনা রয়েছে, কারণ, বিমান চালানা এখনকার মতো এতটা সুরক্ষিত ছিল না আগে। আর বিমান দুর্ঘটনা ঘটা মানেই সবাই নিমিষে মারা যাওয়া। অনেক ক্ষেত্রে, দেখা গেছে দুই তিনশো মানুষ নিয়ে সমুদ্রে তলিয়ে গেছে বিশাল একটি উড়োজাহাজ। তাছাড়া বিমান নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতুহলও তো অনেক, তাই দুর্ঘটনা নিয়েও তো কৌতুহল থাকবে স্বাভাবিকভাবেই। এখনো অনেক মানুষ ‘হা করে’ অাকাশে বিমান ওড়া দেখে, ‘কারা ওতে চলে’ সেটি ভেবেও বিস্মিত হয়!

ইতিহাসে অনেক কীর্তিমান মানুষ বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। রাষ্ট্রনায়ক জনএফ কেনেডি, সঙ্গিত শিল্পী জন ডেনভার এবং এরকম আরো অনেকে। পুরো একটি ফুটবল টিম বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার ঘটনা আছে।

স্থল এবং নৌপথের সতর্কতা তুলনামূলক সহজ এবং কম ব্যয়বহুল, তারপরেও এ দুই পথেই সবচে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। তবে আকাশপথের দুর্ঘটনাগুলো খুব ভয়াবহ হয়। যদিও তুলনামূলক অনেক কম দুর্ঘটনা হয় এখন আকাশপথে। আধুনিক প্রযুক্তি আকাশপথের দুর্ঘটনা অনেক কমিয়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে।

উন্নত দেশগুলোতে নৌপথেও কোনো দুর্ঘটনা ঘটে না বললেই চলে। তবে বালাদেশ ঘটে, প্রায়ই লঞ্চ বা ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। অথচ একটু সতর্ক হলেই এ দুর্ঘটনাগুলো এড়ানো যায়। স্থল এবং আকাশপথের মতো অনিবার্য কারণবশত কোনো দুর্ঘটনা নৌপথে সাধারণত ঘটার কথা নয়। তবু অবহেলা এবং অসতর্কতার কারণে বাংলাদেশে প্রতিদিনই দুর্ঘটনায় মানুষ মরছে।

রফিক জামান ও বিপাশা দম্পতি তাঁদের ছেলে অনিরুদ্ধসহ মারা গিয়েছে নেপালে ইউএস-বাংলা বিমান দুর্ঘটনায়।

নেপালে এই বিমান দুর্ঘটনাটি অনেকগুলো বিষয় সামনে আনবে, বিশেষ করে নেপালের ত্রিভূবন বিমানবন্দরের উড্ডয়ন এবং অবতরণে জটিলতার বিষয়টি সামনে আসবে—আসা উচিৎ। পর্বতঘেরা হওয়ার কারণে বিমান অবতরণ এবং উড্ডয়ন সেখানে খুব সরল নয় বলে জানা যায়। এটি পৃথিবীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর, কারণ, প্রচুর পর্যটক প্রতিবছর নেপালগামী হয়, কিন্তু সে তুলনায় বিমানবন্দরের দুর্বল মান এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে, ইউএস বাংলার বিমানটিও ছিল ১৬ বছরের পুরাতন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং ব্যবস্থার সবটুকু থাকলে হয়ত ছিটকে গিয়েও বিমানটিতে আগুন ধরে যেত না। এত বেশি হতাহত হতো না।

বৈমানিকদের দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণের বিষয়টিও নিশ্চয়ই ধর্তব্যের বিষয়, কারণ, আগের থেকে অনেক বেশি বিমান এখন বাংলাদেশ থেকে ছেড়ে যায় এবং বাংলাদেশে অবতরণ করে—সে তুলনায় সুদক্ষ পাইলটদের সংখ্যা কতটা বেড়েছে সে প্রশ্নটি আসবেই।

দুর্ঘটনা দুর্ঘটনাই, কোনোটিই কাম্য নয়—স্থল, নৌ এবং আকাশ তিনপথেই এখন মানুষ প্রচুর পরিমাণে চলাচল করে, তাই নিরাপদ ভ্রমণেই দাবি এখন সমগ্র বিশ্বজুড়ে—বিশেষ করে অনুন্নত দেশগুলোতে এ দাবি খুবই প্রাসঙ্গিক। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিমান দুর্ঘটনাটির প্রেক্ষিতে তাঁর সিঙ্গাপুর সফর সংক্ষিপ্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। এটাই বিমান দুর্ঘটনার বিশেষ মাহাত্ম। ইউএস বাংলা বিমানটি দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে যে রেসপন্স মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে—এটা ইতিবাচকভাবে দেখতে হবে। একটা দাবি করার সুযোগ এসেছে আমাদের সামনে—আমরা যেকোনো দুর্ঘটনা প্রায় শূন্যতে নামিয়ে আনতে চাই এবং সেটি সকল পথে এবং সব ধরনের যানবাহনে।

নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতের পরিবারের শোকসন্তত্ত সবাইকে সমবেদনা জানাই।
(ছবিগুলো বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যম থেকে নেয়া।)