ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

আমার সাধারন কাণ্ডজ্ঞানে যা ধরে তা হচ্ছে, কিছু পেশা আছে যাতে আপনাকে যেতেই হবে জেনে শুনে। আপনি জানবেন, আপনি টাকা পাবেন না, সন্মান পাবেন না, কাজ করতে হবে রাতদিন, মেঘ বদলা মাথায় নিয়ে। আপনি তবু কাজ করবেন সত্যের পথে, মানবতার পক্ষে, মানব সেবার জন্য। ব্যস, এর কোন বিকল্প নেই এবং এই ধরনের পেশার উল্লেখ যোগ্য হচ্ছে ডাক্তারী পেশা, শিক্ষকতা পেশা, সাংবাদিকতা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এই সকল পেশা আমাদের দেশে এখন এতটাই টাকা সর্বস্ব হয়ে গেছে যে আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। ডাক্তারদের নিয়ে কাজ করি বলে হয়ত ডাক্তারদের টাকা নেবার রুপটা আমার চোখে বেশী পড়ে!

হাসপাতাল ও ডায়গনস্টিক পরিচালনায় আমাদের সাথে আছে নানা কিছিমের, নানা শর্তের ডাক্তারগণ। দিনে তিন ঘণ্টার কন্ট্রাক থেকে বার ঘন্টার ডাক্তারও আমাদের আছে! বেতন নাই (এরা শুধু আমাদের জায়গা ব্যবহার করে থাকে) থেকে আবার পাঁচ লক্ষ টাকা বেতনো আছে। কিছু ডাক্তার শুধু চেম্বার করেন, রোগীর বাকী দ্বায়ীত্ব আমাদের। এত নানা কিছিম, এত নানা শর্ত ডাক্তার সাহেবরাই আমাদের দিয়েছেন। ওনাদের ধরে রাখতে আমাদের জান প্রান যায় অবস্থা, আমরা ওনাদের কথা মতই চলি। হাসপাতাল ও ডায়গনস্টিক পরিচালনায় প্রথম ভগবান বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগন, দ্বিতীয় ভগবান ধনী জটিল রোগধারী রোগী ও রোগিণীগন! কথাটা বাজে শুনালেও একশত ভাগ সত্য। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগন দেখে রোগী আসে, আমাদের কাছে টেষ্ট করে, ভর্তি হয়ে হাসপাতালের সেবা গ্রহন করে (রোগী ভাল হন কিংবা মরে যান) – আমরা টাকা পাই।

যাই হোক, হাসপাতাল ও ডায়গনস্টিক নিয়ে আজ নয়। এই সিরিজে শুধু ডাক্তার সাহেবদের কাণ্ডজ্ঞান নিয়েই আলোচনা চলবে। প্রতিদিন দুইবেলা করে আমি নানা ডাক্তারদের চেম্বারের সামনে দিয়ে হেঁটে বেড়াই। এটা আমার কাজের ও দায়িত্বের অংশ। আমি ডাক্তার সাহেবদের সামনে বসা সহকারীদের সাথে কথা বলি, তারা ঠিক সময়ে আসল কিনা, সিরিয়াল রাখল কি না, তিনি কত রোগী দেখেছেন, ডাক্তার সাহেব কেমন আছেন ইত্যাদি ইত্যাদি জানতে চাই। সমস্যা হলে সমাধান করি। মাঝে মাঝে ডাক্তার সাহেবদের সাথেও কথা বলি। সালাম দেই, কেউ কেউ অনেক ভদ্র। সালামের জবার দিয়ে আমার ও আমার প্রতিষ্ঠানের মালিকের খোঁজ নেন আবার কেউ কেউ এমন ভাব মারেন যেন তিনি আমার ও আমার প্রতিষ্ঠানের মালিকে দয়া করছেন! আমি হাসি।

এই সিরিজ চালু করার পর থেকে অনেক দিন ধরে এটা লিখব বলে ভাবছিলাম। আমি প্রায় প্রতি নিয়ত এক জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চেম্বারের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়াই। তিনি সরকারী চাকুরী করেন, আমাদের এখানে সন্ধ্যার পর বসেন। রাত ১/২ টা পর্যন্ত রোগী দেখেন। ঠিক তার কক্ষের দরজার মধ্য খানে বড় করে একটা নোটিশ ঝুলিয়ে দেয়া আছে। আমি কত হাজার বার পড়েছি তার ইয়েতা নেই! আপনি এখানে আসলে, বাংলা পড়া জানলে (!) আপনিও কয়েকবার পড়ে যাবেন। আমি নিশ্চিত। গাট্টা গাট্টা বর্ণে পরিস্কার লেখা কিছু পয়েন্ট।

১। নূতন রোগীদের জন্য ডাক্তার ফী ৬০০/- টাকা
২। পুরাতন রোগীদের জন্য ডাক্তার ফী ৪০০/- টাকা
৩। রিপোর্ট দেখানো প্রতি বার ২০০/- টাকা
৪। দুইমাস পরে পুরাতন রোগীরা নূতন রোগী হয়ে যাবেন।
৫। রোগী দেখানোর জন্য সকাল ৭ টায় সরাসরি এসে সিরিয়াল দিয়ে যেতে হবে।
৬। নূতন রোগীদের হিষ্ট্রি রাত ১০টার পর লিখা হয়।

লেখাটা আমার প্রায় মুখস্ত। দিনে তিনি ৭০/৮০ জন রোগী দেখেন, নূতন পুরাতন মিলিয়ে। ফাঁকে ফাঁকে চলে রিপোর্ট দেখা। সম্প্রতি তিনি ভাবছেন, আর এভাবে চলছে না , আবার ফী বাড়াতে হবে! এত কষ্টে এত কম টাকায় হয়ত আর চলছে না!