ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

ডাঃ হরে কৃষ্ণ বিশ্বাস। আমার পাশের ফ্ল্যাটেই থাকতেন এক সময়। শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। কাজ করেন ঢাকার শিশু হাসপাতালে এবং প্র্যাক্টিস করেন ওয়াপদা রোডের এক ফার্মাসিতে। ফার্মাসি থেকে আমার বাসা খুব একটা দূরে নয়। কুক দিলে শুনা যাবে। এখন অনেক টাকা পয়সা হয়ে গেছে, মহানগরে বড় বাসায় থাকেন, গাড়িও কিনেছেন। সন্ধ্যায় ওষুধের দোকানের সামনে অনেক শিশু রোগীদের ভীড় দেখি। কামাই করে যাচ্ছেন দুই হাতে বুঝা যায়। এই বাসা ছাড়ার পর অনেক দিন আমার সাথে দেখা হয় না। তার সাথে আমার কোন কাজও নেই দেখা হয়েই বা কি হবে! বছর দুয়েক আগে সেই যে তিনি মহানগরে চলে গেছেন আর এই বাড়ীতে এসেছেন বলে আমার মনে পড়ে না। বয়সে আমার চেয়ে পাঁচ সাতেক বড় হলেও কত বেলা, কত দাওয়াত, কত সময় আমি, আমাদের বাড়িওয়ালা ও ডাঃ হরে কৃষ্ণ বিশ্বাস কাটিয়েছি!

পানে আসক্ত থাকলেও তিনি তার ওয়াইফের ভয়ে এই পথে খুব একটা হাঁটতেন না। ডাক্তার হিসাবে তাকে আমার কাছে কখনোই ভাল মনে হত না। (পাশাপাশি থাকা সত্ত্ব্বেও আমার ছেলেকে তার কাছে কখনো দেখাইনি, ছেলেকে ডাক্তার দেখাতে রিক্সা ভাড়া গুনেছি তার পরো কখনো তাকে দেখাইনি।) একটু পেটে পড়লে তিনি নানান কথা বলতেন, তাতে আমার কাছে তাকে অনেক আগে থেকেই একজন অমানবিক লোক/ ডাক্তার মনে হত। পরে তার প্রসঙ্গে অনেক জানতে পারি। মেয়ে মেয়েদের আলাপে তার পরিবারের অনেক কথা পরে জেনেছি। তিনি এক গরীব/গৃহস্থ পরিবার থেকে ডাক্তার হয়েছেন, তার মা এখনও গ্রামে থাকেন (আগামী ব্লগে এই প্রসঙ্গে লিখব) ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি ব্লগে লিখি নানা বিষয় নিয়ে। ডাক্তার সাহেবদের নিয়ে আমি কিছু লিখছি এটা আমি আমার স্ত্রীর কাছ থেকে গোপন করে যাচ্ছি বা কখনো বলি নাই। গত রাতে আমার স্ত্রী এই ডাঃ হরে কৃষ্ণ বিশ্বাস নিয়ে যে ঘটনা শুনালেন তাতে আমি তাজ্জব হয়ে গিয়েছি। ব্লগে না লিখে পারলাম না। তাকে ডাক্তার বলি কি করে!

আমার স্ত্রী ও পাশের বাসার দুই মহিলা আছরের নামাজের কিছু আগে রামপুরা মার্কেটের দিকে যাচ্ছিলেন, ঈদের কেনা কাটার জন্য। ঠিক আমাদের বাসার সামনে গলি দিয়ে বের হতেই ওয়াপদা রোডে ভীড় দেখে এই তিন মহিলা এগিয়ে যান এবং গিয়ে দেখেন একজন গ্রামীন মহিলা রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে, পাশে দুইটা ছোট ফুটফুটে ছেলে ৩ ও ৫ বছরের (হবে হয়ত) কাঁদছে। বাচ্চা দুটো দেখে আমার স্ত্রী মায়ায় পড়ে যান এবং তাকে সাহায্য করার জন্য পথ খুঁজেন। আমার স্ত্রী এই সব পরিস্থিতে পিছপা হন না এবং তার এই ধরনের সাহায্যের মানসিকতা আমি আগেও দেখেছি অনেকবার। আমার স্ত্রী অন্য দুই মহিলা নিয়ে এবং উক্ত মহিলাকে ধরাধরি করে ডাঃ হরে কৃষ্ণ বিশ্বাসে চেম্বারে নিয়ে যান। ডাঃ হরে কৃষ্ণ বিশ্বাস তখন রোগী দেখছিলেন, আমার স্ত্রীর ধারনা ছিল ডাঃ হরে কৃষ্ণ বিশ্বাস যেহেতু তার পরিচিত এবং অবশ্যই তার কথা শুনে উক্ত মহিলাকে অজ্ঞান অবস্থা থেকে ভাল হবার উপায় বাতলে দেবেন।

কিন্তু আমার স্ত্রী ডাঃ হরে কৃষ্ণ বিশ্বাসের কাছে উক্ত মহিলাকে নিয়ে অবাক হয়ে দেখলেন ডাক্তার কাকে বলে! ডাঃ হরে কৃষ্ণ বিশ্বাস প্রথমেই উক্ত রোগী দেখে নাক উঁচিয়ে বলেন, কেন একে নিয়ে আসছেন (রোগী গরীব বলেই হয়ত তার এই তাচ্ছিল্য, হয়ত টাকা পাবেন না বলে তার এই তাচ্ছিল্য)। আমার স্ত্রী বলেন বিশ্বাস দা, ওনার চিকিৎসা করুন যা টাকা, ওষধ পত্র লাগে আমি দেব। এতেও তিনি উক্ত রোগীকে চিকিৎসা করার বিন্দু মাত্র আগ্রহ প্রকাশ করেন নাই। কোন রকমে পালস দেখে বলে দিলেন, নিয়ে যান ভাল হয়ে যাবে। তার পর এই তিন মহিলা সহ আরো অন্যান্যরা মিলে উক্ত মহিলাকে বাইরে নিয়ে এসে মুখে পানি দিয়ে চামচ দিয়ে দাঁত ফাঁকা করে, নিজেরা বুদ্দি দিয়ে খাবার স্যালাইন খাইয়ে প্রায় ঘন্টা খানেক বাদে মহিলাকে সুস্থ করে তুলেন। কিছুটা সুস্থ হতেই বাসা থেকে ডিম ভাজি সহ তরকারী নিয়ে মহিলাকে ভাত খেতে দেন এবং তার ছেলেদের দেখে রাখেন। এর এক পর্যায়ে মহিলা পুরা পুরি সুস্থ হলে সবাই জানতে পারেন, মহিলার করুন ঘটনা।

মহিলা তার স্বামীকে খুজতে বাচ্চা দুটি নিয়ে কুমিল্লা থেকে ঢাকার রামপুরা এসেছেন আজ সকালে। গত দুইদিন ধরে কিছু না খাওয়াতে এখানে এসে অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলেন। স্বামীর পূর্ণ ঠিকানা না জানাতে বাসাও খুঁজে বের করতে পারছিলেন না। স্বামী মাস খানেক আগে বাড়ী থেকে এসেছে, আর যোগাযোগ নাই তাই বাচ্চা দুটো নিয়ে তার খুজতে বের হওয়া। স্বামী নাকি বলেছিলেন, রামপুরায় এসে তার নাম বলেই তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে। এত বড় রামপুরায় এ ভাবে কি কাউকে বের করা যায়! হায় রে, কপাল।

যাই হোক পরে কথা হল মহিলাকে পুরোপুরি খাইয়ে ও কাপড় চোপড় (আমার পাশের বাসায় অন্য একজন মহিলা কাপড় দিয়েছেন) দিয়ে, অনেকের কাছ থেকে টাকা কড়ি তুলে (প্রায় দেড় হাজার টাকা) মহিলাকে আবার কুমিল্লা চলে যেতে তারা সবাই সাহায্য করলেন। (চরম এই বোকা মহিলার কপালে আরো কি কি দুর্গতি আছে/ঘটেছিল আল্লাহ জানেন)। যাক এই মহিলা এখানে বিবেচ্য বিষয় নয়।

বিবেচ্য বিষয় হল একজন মানুষ যখন অসুস্থ্য হয়ে পড়ে তাকে কে বেশী সাহায্য করবেন। কার বেশী কর্তব্য একজন অসুস্থ্য রোগীকে সুস্থ করে তোলার। অবশ্যই যদি পাশে একজন ডাক্তার থাকেন তার। আমার স্ত্রী এই বিষয়টা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। কিছুতেই ডাঃ হরে কৃষ্ণ বিশ্বাসের চোখ, মুখ ও অভিব্যক্তির কথা ভুলতে পারছিলেন না। আমার কাছে তার প্রশ্ন ছিল, একজন ডাক্তার কি করে এতটা অমানুষ হতে পারে। ছোট ছোট বাচ্চা দুটো দেখেও কি করে একজন ডাক্তার চিকিৎসা না করে রোগীকে বের করে দিতে পারে। ডাঃ হরে কৃষ্ণ বিশ্বাসকে চরম ভাবে গালিগালাজ করে যাচ্ছিলেন আমার স্ত্রী, অভিশাপ ও দিচ্ছিলেন।

আমি চুপ করে থাকি। এই রকম অনেক অনেক নিষ্ঠুর ডাক্তার নিয়েই যে আমি প্রতিদিন পথ চলি। পাশাপাশি থেকেও তাকে সেই সব কথা বলা হয়নি! বলতে ইচ্ছাও হয় না!

***
ডাঃ হরে কৃষ্ণ বিশ্বাস নামটা উক্ত ডাক্তারের সঠিক নাম নয়। কিছু মিল রেখে নামটা আমি দিয়েছি। আগামী পর্বে তার আর একটা নিষ্ঠুর দিকের কথা লিখব।