ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

সভ্যতা যখন আপন চাকায় দৃপ্ত সুষমায় অনবরত সুসজ্জীকৃত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে, ঠিক সেই সময়টাতেই ঘটে যাচ্ছে বিরামহীন প্রেতাত্মার প্রেতসুলভ কর্মকান্ডের নির্লজ্জ মহড়া।আমাদের সমাজটাকে কাঁপিয়ে দিয়ে মঞ্চস্থ হচ্ছে বেহায়াপনার উন্মত্ত নৃত্যলীলা। অথচ আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে দৃপ্ত বাক্যবাণে ভাসিয়ে ক্রমাগত দাবি করছি,সভ্যতার শিখরে আমরা না কি যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত। আদৌ কী তাই?

এসব কথাগুলো অনুধাবনে বেশি পেছনে যেতে হবে না,মাত্র কয়েকদিন পূর্বের গারো তরুণীর গণধর্ষিত হবার ঘৃণ্য ঘটনাটির দিকে চোখ তুললেই স্পষ্ট হয়ে যায় সব।এ রকম ঘটনা একটি নয়,প্রায় প্রতিদিন-ই ঘটছে।আমাদের সভ্যতা, নীতি-নৈতিকতা,মানবিক মূল্যবোধ কতোটা তলানিতে এ সমস্ত ঘটনাবলির পুনরাবৃত্তিতে সহজেই অনুমেয়।গত নববর্ষের উদযাপনের দিনটি তো ইতোমধ্যেই জাতীয় কালো দিবস হিসেবে স্ব-আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত।দিনটিতে সংঘবদ্ধ পিশাচের দল যা করেছিল,বন্য হিস্র জানোয়ারেরাও এহেন কাজ করতে বোধ হয় লজ্জাবোধ করে ।অথচ এমন ঘৃণ্য ঘটনার কতোখানি বিচার হয়েছে এ দেশে, সকলেই জানে।মিছিল-মিটিং,আলোচনা-সমালোচনা,মানববন্ধন কতো কিছুই তো হলো,কিন্তু আমরা কতোখানি পেয়েছি সেই বিচার? কথাগুলো ভাবলে নিজে নিজেই লজ্জিত হতে হয়।

সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে,যারা নারীদের শ্লীলতাহানি ঘটিয়ে নিজেদেরকে সুপুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়,তাদের স্পষ্ট আঙ্গিকে জানা উচিত—“পৌরুষ আর পশুত্ব কখনোই এক নয়;পুরুষত্ব আর অনৈতিক নির্লজ্জতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।’
রাস্তাঘাটে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা,উড়না ধরে টান দেয়া, নোংরা অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন,শ্লীলতাহানি,অশ্লীল বাক্য নিক্ষেপণের সাথে পৌরুষের কোনো যোগসাজশ নেই।বরং এসবের সাথে কাপুরুষতার পূর্ণমাত্রার সৌসাদৃশ্যতা রয়েছে। এসব ঘৃণ্য কর্মে যারা নিয়োজিত তাদের সব রইলেও অন্তত পৌরুষ নেই।কেননা কোনো সুপুরুষ কখনোই নারীর শ্লীলতাহানি,ইভটিজিং কিংবা অশ্লীল বাক্য নিক্ষেপণে নিজেকে সম্পৃক্ত করবে না,করতে পারে না।আর যারা এসব কুকর্ম করে বেড়ায়,তাদের জন্মের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

আজকাল দেখছি,বখাটেদের উৎপাত-উপদ্রব ক্রমেই যেনো বৃদ্ধি পাচ্ছে।নৈতিকতা,মূল্যবোধ,সুস্থ মানসিকতা, রুচিবোধ, নারীর প্রতি সম্মানবোধ প্রতিনিয়ত যেনো হারিয়ে ফেলছি আমরা।নৈতিক অবক্ষয় পূর্ণমাত্রায় যুবসমাজকে গ্রাস করে ফেলেছে।ফলশ্রুতিতে ধর্ষণ,ইভটিজিং,শ্লীলতাহানির মতো জঘন্যতম ঘটনার পুনরাবৃত্তি বারবার হচ্ছে।যার সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য ভয়াবহ সংস্করণ হলো গারো তরুণীর গণধর্ষিত হবার মতো ঘটনা।মানুষ কতোটা পিশাচ হতে পারে,বেজন্মা হতে পারে;তার ঝলঝলে দৃষ্টান্ত এটি।সবচেয়ে আশ্চর্য হই,যখন স্বচক্ষে দেখি, পিশাচের দলেরা একের পর এক ধর্ষণ,ইভটিজিং,শ্লীলতাহানি মতো জঘন্য ঘটনা ঘটিয়েও সম্পূর্ণ অধরা থেকে যাচ্ছে।যদি কখনো চিৎকার-চেঁচামেচি,মিডিয়ার অত্যধিক উৎপাত-উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে দু এক বেচারাকে ধরেও,তা নিশ্চয় সুবিচার পর্যন্ত গড়ানোর পূর্বেই জামিনে মুক্ত হয়ে মুক্ত বাতাসে স্ব স্ব কর্মে নিয়োজিত হবার সুচিন্তিত বন্দোবস্ত বেচারাদের পাকাপোক্ত করেই দেয়া হয়।এটা গোটা প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার দেউলিয়াত্বেরই প্রমাণ বহন করে।
হাজার হাজার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেও সুষুপ্ত পুলিশের নিদ্রাভঙ্গ এখনো হয় নি।বখাটেদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্রও উপযুক্ত উৎসাহ-উদ্যোগ এদের নেই।এতে করে কার্যত অপরাধীদের পক্ষেই সাফাই গাচ্ছে পুলিশ।কিন্তু এভাবে আর কতোদিন?

এভাবে ক্রমাগত চলতে থাকলে,হয়তো কোনো এক সময় দেখবো–আমাদের নিজেদের পরিচিত কোনো প্রিয় মানুষ,মা-বোন,স্ত্রী-স্বজন কিংবা প্রেমিকা এরুপ পরিস্থিতির নোংরা কালিমায় কালিমালিপ্ত হচ্ছে।সেদিন কী আমরা পারবো,আমাদের মা-বোন-স্বজনদের এরুপ অপমান সইতে?আমরা কী সেদিন পারবো, চোখ বুজে চুপ করে থাকতে?যদি না পারি,তবে সমাজটাকে পাল্টে ফেলতে হবে।যতো আগাছা,নোংরা-বর্জ্যের টুকরো সমাজে ঘাপটি মেরে আছে,স্ব হস্তে উপরে ফেলার সময় এখনি।আসুন,আমাদের পরিচিতজনদের যাতে এরুপ পরিস্থিতির শিকার না হতে হয়,সেজন্য এক্ষুনি সোচ্চার হই।

“আমরা জাগলে,বখাটেরা ভাগবে।”

নৈতিকতা,মূল্যবোধ,নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ হৃদয়ে অঙ্কন করি।সমাজটাকে নতুন করে গড়ে তুলি।যেখানে আমাদের মা-বোন-স্বজন,প্রিয় মানুষেরা থাকবে ভয়হীন,নিরাপদ,নিশ্চিন্তে।আমরা পুরুষেরাও পারবো,পাপমোচনের নির্মল স্বচ্ছ ধারায় সিক্ত হতে।