ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বাংলাদেশ পুলিশ এক অতি উজ্জ্বল নাম।তাদের উজ্জ্বলতা সত্যি বিরল।তারা সবসময় গ্ল্যামারাস থাকতে পছন্দ করেন।এজন্য অবশ্য গ্ল্যামারাস গ্ল্যামারাস অসংখ্য কাজও তারা করেন।কালিহাতির ঘটনাটাও তাদের গ্ল্যামারাসের-ই অংশবিশেষ। তারা গ্ল্যামারাসটা ছড়ান বন্দুকের নল দিয়ে।সেখান হতে যে ধোঁয়া বের হয়,ঈষৎ আগুনের ফুলকি বের হয়;সেটাই তাদের গ্ল্যামারাসের উৎস।এ রকম অসংখ্য গ্ল্যামারাস কাজ তারা করেছেন। বিরোধীজোটের আন্দোলনে গুলিবর্ষণ করে,হেফাজতের আন্দোলনে বুলেটবর্ষণ করে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনে শেল বর্ষণ করে। এরূপ আরো অগুনতি মিছিল-মিটিং, আন্দোলন-সংগ্রামে গুলি-বুলেট-শেল বর্ষণ করে তাদের গ্ল্যামারাস ছড়ানোর পজিশনটা পোক্ত করেছেন যথেষ্ট ধৈর্যের সাথেই। তাদের এই গ্ল্যামারাস ছড়ানোর কায়দাটাও বেশ ইতিহাসসিদ্ধ।আসলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, তার মন্ত্রীসভা, আর পুলিশের ঊর্ব্ধতন কর্মকর্তারাই যখন এই গ্ল্যামারাসে আপ্লুত হন,কানে তুলো গোঁজে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলেন,তখন আর গ্ল্যামারাস ছড়ানোটা দোষের কী?তবে এই যে পুলিশের গ্ল্যামারাস ছড়ানোটা, এটা কিন্তু ভাই নতুন নয়।এটার সূত্রপাত অনেক আগে থেকেই।ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন,পাকিস্তান পিরিয়ড সম্ভবত এরও আগে থেকে।ইতিহাস পড়ে জেনেছি,’৫২ এর ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গ্ল্যামারাস ছড়ানোর কাহিনি।সেখানে তাদের গ্ল্যামারাসে কীভাবে ঝলসে যায় রফিক,সালাম,জব্বার,বরকতসহ আরো কতো নাম না জানা লোক।আরো জেনেছি, ‘৬৯,’৭১-এ গ্ল্যামারাসের দৃপ্ত ঝলকানির বীরত্বগাঁথা।

কিন্তু ভাই,এতো গেলো স্বাধীনতার পূর্বেকার গ্ল্যামারাসের ঝনঝনানি।স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরও কী সেই ঝনঝনানি থামাতে পেরেছি?পাকিস্তান সরকারের সেই পুলিশি তান্ডব কী এখন থেমে গেছে?পাকিস্তান সরকারের কথায় কথায় বুলেটনীতি কী আজ স্তব্ধ হয়ে গেছে?সে নীতি কী এদেশে বর্জিত হয়েছে না কি চর্চিত হয়েছে?

আমরা কথায় কথায় বলি—পাকিস্তান ঘৃণা করি,তাদের সংস্কৃতি ঘৃণা করি,তাদের নীতি ঘৃণা করি।কিন্তু আসলেই কী তাই?আমরা কী পাকিস্তান সরকারের বহুল চর্চিত গুলিতন্ত্রকে বাংলার মাটিতে পোক্ত করিনি?আমরা কী পাকিস্তান সরকারের ন্যায্য আন্দোলন দমনের কৌশলকে রপ্ত করিনি? তারাতো ‘৫২,’৬৯সহ অসংখ্য ন্যায্য আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে জোর প্রয়োগ করেছে,বাধা দিয়েছে,গুলিবর্ষণ করেছে।আমরা কী আমাদের স্বাধীন দেশে যেকোনো আন্দোলন -সংগ্রাম,মিছিল-মিটিং,বিক্ষোভে জোর প্রয়োগ করি না?গুলিবর্ষণ করি না?তবে পাকিস্তান সরকার আর স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে পার্থক্য কী,বলতে পারেন?

আমরা মূলত পাকিস্তান সরকারের সেই পুলিশি রাষ্ট্র আর গুলিতন্ত্রকে বাংলার জমিনে প্রোথিত করেছি,লালন করেছি,পোক্ত করেছি,চর্চা করে চলেছি।এই কী তবে স্বাধীনদেশ?এই কী তবে সোনার বাংলা?বলতে পারেন কেউ?

গত রোববার সকাল ১১টায় আয়োজিত মতবিনিময় সভায় ঢাকারেঞ্জের ডিআইজি এসএম মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান বলেন,”জনগণের টাকায় আপনাদের বেতন হয়। তাদের টাকায় আপনাদের অস্ত্র কেনা হয়। তাদের জানমালের নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব আপনাদের। তবে একটি কথা মনে রাখতে হবে- যারা জনগণের জানমাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলে কিংবা সরকারি সম্পদ ধ্বংস করার চেষ্টা করে, তাদের প্রতিহত করতে যা যা করা দরকার সবই করবেন। প্রয়োজন হলে সরাসরি গুলি করুন। দায় দায়িত্ব সব আমি নেব।”

তার দেয়া এ বক্তব্যটাও কিন্তু গ্ল্যামারাস! কারণ গ্ল্যামারাস ছড়ানোর কৌশলটা কিন্তু তিনি বাতলে দিয়েছেন বেশ আন্তরিকতার সাথেই।তার এরূপ বক্তব্যে বেশি না হলেও, অন্তত অল্পকিছু ধন্যবাদ তাকে দেয়া যেতেই পারে।কেননা গুলিতন্ত্রের ধারক ও বাহক হিসেবে তার এ ধরনের বক্তব্য দেয়াটাই বরং শোভনীয়;না দিলেই বরং দোষের!তাছাড়া তিনি আরেকটি সত্যকে নির্দ্বিধায় তুলে ধরেছেন।সেটা হলো–সরকারের মনোভাব আর পুলিশের মূলনীতি।তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—জনগণের টাকায় তাদের বেতন হয়,অস্ত্র কেনা হয়।সুতরাং তাদের জান-মাল রক্ষা করাই তাদের মূল দায়িত্ব।এজন্য প্রয়োজনে গুলি করুন। দায়-দায়িত্ব সব উনার।বেশ সুন্দর কথা বলেছেন!

কিন্তু ডিআইজি মহোদয়ের কাছে আমার জানতে বড়ো ইচ্ছে হয়— ডিআইজি মহোদয়, জনগণ বলতে আপনি কাকে বুঝিয়েছেন, দয়া করে বলবেন কী?জনগণের সংজ্ঞাটাই বা কী?ডিআইজি মহোদয়, আপনি জনগণের জানমাল রক্ষায় গুলি চালাতে বললেন;তবে কালিহাতিতে নিহত ৪ জন কি জনগণের কাতারে পড়ে না?তারা কি জনগণ ছিল না?তারা কি মঙ্গলগ্রহে বসবাস করতেন না কি এদেশে?তাদের জান-মালের নিরাপত্তার দায়িত্বটা কাদের ছিল?তাদের জানটাই বা কাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে, কারা কেড়ে নিল?হেফাজতের আন্দোলনে যারা মারা গেলেন,তাদের জান-মালের নিরাপত্তা দেবার দায়িত্বটাই বা কাদের ছিল?তারা এদেশের নাগরিক ছিলেন না কি অন্য গ্রহের?

তবে জনগণ বলতে যদি আপনি শুধু সরকার সমর্থিত লোকগুলোকে বুঝাতে চান,তবে তো ভিন্ন কথা।তবে আমি-ই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি মহোদয় ।যদি আপনি মনে করেন,যারা সরকার সমর্থক –তারাই একমাত্র জনগণ,বাকিসব ভিনদেশি, মঙ্গলগ্রহনিবাসী;তবে তো ঠিকই বলেছেন মহোদয়।ডিআইজি মহোদয়,আপনি কাদের গুলি করে, কাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করছেন?কাদের জান কেড়ে,কাদের জানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন দয়া করে বলবেন কী?

নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন ডিআইজি মহোদয়, আপনি কি গরু মেরে জুতো দান করছেন না কি নিজেকে নিজেই অপমান করছেন?